(২) রাষ্ট্রকে গয়-মুক্ত করার জন্য সর্ব আচরণ বৈধ। জনৈক ইহুদি সজ্জনই একখানি প্রামাণিক পুস্তিকা লিখে ইহুদি তথা বিশ্বজনের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখান, হিটলার যে জর্মনিকে ইহুদিমুক্ত করতে চেয়েছিলেন সে শিক্ষা তিনি পান ইহুদিদের কেতাব থেকে। গ্যাস-চেম্বার তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
একথা আমি অতি অবশ্যই বলব না, সে আমলে বা এখনও সব ইহুদিই এসব বিধানে বিশ্বাস করেন। বস্তুত আমার বিস্তর ইহুদি বন্ধু ছিলেন, এখনও আছেন। যাদের প্রতিবেশীরূপে পেলে যে কোনও মুসলিম নিজকে সৌভাগ্যবান মনে করবে। কিন্তু মানুষের বদ-কিস্মাৎ, রাষ্ট্র-নির্মাণ-কর্মে এঁদের ডাক তো পড়েই না, বরং এসব অন্যায় গোঁড়ামি, বিশ্বমানবের প্রতি অশ্রদ্ধাসূচক বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে আপত্তি তুললে তারা হন লাঞ্ছিত-বিড়ম্বিত। সভাস্থল থেকে এঁরা বহিষ্কৃত হন নানাবিধ অশ্রাব্য গালাগাল শুনতে শুনতে। এ পরিস্থিতি এমন কোনও সৃষ্টিছাড়া অভিনব ঘটনা নয়। প্রভু খ্রিস্টের আমলেও ইহুদিরা চরমপন্থার অনুরক্ত ভক্ত ছিল। প্রতিপক্ষের সঙ্গে আপস করতে কিছুতেই সম্মত হত না। তাই প্রভু খ্রিস্ট তাঁর সর্বপ্রথম ধর্মোপদেশ দানকালে মুখ খুলিয়াই বলেন, ধন্য যাহারা আত্মাতে দীনহীন (অর্থাৎ আপন রূহ-এর গরিবি সম্বন্ধে সবিনয় সচেতন) কারণ তাদেরই নসিবে আছে বেহশত্।
এর পর তার সপ্তম উপদেশেই প্রভু বলছেন তারাই ধন্য, যারা (দুই বৈরী পক্ষের মাঝখানে) শান্তি-সুলেহ নির্মাণ করেন। খ্রিস্টের এ উপদেশে গোটা ইহুদি জাত তাদের মৃত সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়ে তাঁকে ক্রুশে চড়িয়ে মারে। রোমান গবর্নর তাঁকে বাঁচাবার জন্য কী প্রকারের চেষ্টা দিয়েছিলেন, একটার পর আরেকটা সুলেহ পেশ করছিলেন, মথি-মার্ক ইত্যাদিতে আছে কিন্তু ইহুদি জনতা শুধু চিল্কারের পর চিৎকার করেই চলেছে ক্রুশে মারো। ক্রুশে চড়িয়ে মারো ওকে। সুলেহ মাত্রই তাদের কাছে দুর্বলতার লক্ষণ। সমস্ত ঘটনাটি এমনই নাটকীয় যে এর পুনরাবৃত্তি পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবে না।
শেষটায় গবর্নর পিলাতে যখন দেখলেন তিনি তার প্রচেষ্টাতে এক কদমও এগুতে পারছেন না। (হি ওয়াজ নট গেটিং এনিহোয়ার) তিনি একটা ডাবরভর্তি পানি আনিয়ে জনতার সামনে দু হাত ধুয়ে বললেন, এই নির্দোষ সাধু ব্যক্তির রক্তপাতে আমার কোনও কসুর রইল না। উন্মত্ত জনতা চেঁচিয়ে উত্তর দিল, এর লহুর দায় আমাদের ওপর পড়ুক, আমাদের বংশধরদের ওপর পড়ক।
যুগ যুগ ধরে ধর্মোন্মাদ খ্রিস্টান জনতা যখনই ইহুদিদের ওপর নির্মমভাবে খুনখারাবি চালিয়েছে তখনই ব্যঙ্গ করেছে, তোদর পূর্বপুরুষরা কসম খেয়েছিল না, প্রভুর খুনের দায় তোদর ওপর অর্সাবে? এখন আমরা বেকসুর, আমরা মানুষ বলে চাঁচাচ্ছিস কেন?
অথচ আইনত, ঈসা মসিহের শিক্ষার কসম খেয়ে অবশ্যই বলতে হবে, পিতার পাপ পুত্রে অর্সায় না। এরা বেকসুর।
.
বেদরদ প্রাক্তন বাস্তুহারা
১৯৩৪-এ ফলস্তিনে গিয়ে দেখি, বাস্তুহীন, ভিটেহারা, জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত জর্মন ইহুদিরা লেগে গেছে নতুন করে, কিন্তু নীরবে, লক্ষ লক্ষ নয়া ক্রুশ বানাতে। সর্ব প্রকারের আয়োজন চলছে সঙ্গোপনে। উত্তম উত্তম বাস্তু পাওয়ার পরও এরা বিধি-ব্যবস্থা করে যাচ্ছে, লক্ষাধিক বেকসুর আরবদের কী প্রকারে, কত সুলভ পদ্ধতিতে বাস্তুহারা করা যায়।
এইসব মাসুম চাষাভুষোদের সচরাচর আরব বলা হয়, মুসলিম বলা হয়, কিন্তু আসলে বলা উচিত ফলস্তিনি বা ফলস্তিনবাসী। ইহুদিরা মিসরের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে, ফলস্তিনে এসে একে একে যেসব আদিবাসী উপজাতিদের জয় করতে করতে ইহুদি-রাজত্ব বসায়, সেসব আদিম বাসিন্দারা ইহুদিদের ধর্ম গ্রহণ করেনি। এদের মধ্যে অন্যতম প্রধান কওমের নাম ছিল ফিলিস্তাইন, তাদের রাজত্বের নাম ছিল ফিলিস্তিয়া। এ রকম আরও ছোট ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল অনেক। ফিলিস্তিয়া থেকেই পরবর্তীকালে প্যালেস্টাইন নামের উৎপত্তি। ইহুদিদের ছিল দুটি রাষ্ট্র জুদেয়া ও ইজরায়েল। এবং আজ প্যালেস্টাইন বলতে আমরা যে ভূখণ্ড বুঝি এই দুটি রাষ্ট্র মিলে তার দশ ভাগের এক ভাগও হবে না। সিনাই বা সিনিন কস্মিনকালেও ইহুদি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
মোদ্দা কথা এই : ইহুদিরা ফলস্তিনের আদিমতম বাসিন্দা নয়। আদিম বাসিন্দারা পরবর্তীকালে খ্রিস্টান হয়ে যায় এবং জেনারেল খালিদ সিরিয়া ও ফলস্তিন জয় করার পর ইসলাম গ্রহণ করে। আজ যখন ইহুদিরা ফলস্তিনকে আপন আদি বাসভূমি বলে হক্ক বসিয়ে প্রাচীনতম বাসিন্দাদের তাড়াতে চায়, তবে কালো দ্রাবিড়রা উত্তর ভারত দাবি করে আর্যদের খেদিয়ে দেবার হক্ক ধরে। যে কোনও রেড ইন্ডিয়ান ডক্টর কিসিংগারকে দূর দূর করে আপন দেশ থেকে বের করে দিতে পারে। তার আছে সত্যকার হক্ক।
.
ফি রোজ ঈদ ফি রোজ হালুয়া
জেরুজালেমের সর্বত্র কেমন যেন একটা থমথমে ভাব। বড় বড় রাস্তার উপর নবাগত ইহুদিরা বসিয়েছে বার্লিন প্যারিস নাইয়র্কি কায়দায় ফেনসি কাফে-রেস্তোরাঁ। আরব ওগুলোর দিকে ফিরেও তাকায় না, তাকালে সে দৃষ্টিতে থাকে ঘৃণা আর ক্ষোভ। এসব ইহুদি রেস্তোরাঁয় খাদ্য-পানীয়ের দাম যে খুব একটা আক্রা তা নয়। খদ্দের ইহুদি, মালিক ইহুদি। এবং প্রায় সব কটাই চলে লোকসানে। তাতে কার কী? সব ইহুদি সাকুল্যে খর্চা, ফুর্তির কড়ি পাচ্ছে মার্কিন জাত-ভাইদের কাছ থেকে। তারা কিন্তু বাস্তু ঘুঘু। ধনদৌলতে ভরা, নৃত্যগৃহ, কাবারে, জুয়োর আড্ডায়, বেশ্যালয়ে আবজাব করছে যে দেশ, সে দেশ ফেলে তারা আসবে কেন এই কাঠখোট্টা প্রাচীনপন্থী প্যালেস্টাইনে পুণ্যভূমি পিতৃভূমি, আব্রাহামের দেশ বলে মুখে মুখে যতই হাই-জাম্প লং-জাম্প মারুক না কেন।
