ফলস্তিন কাঠ-খোটা দেশ বটে কিন্তু সে দেশের নায়েবরা গরিব চাষা-তুষোদের লহু ফোঁটায় ফোঁটায় শুষে নেবার তরে যে কায়দাকেতা জানে তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে শাইলকের চেয়েও ধড়িবাজ ইহুদি সম্প্রদায়। ওদিকে নায়েবদের হাতে সবকিছু সঁপে দিয়ে জমিদাররা ফুর্তি করতেন মধ্যপ্রাচ্যের মন্তে-কালো, বিলাস-ব্যসনের হুরীস্তান বেইরুতে। মদ্য মৈথুনের ব্যবস্থা সেখানে অত্যুত্তম এবং জুয়োর কাসিনোতে এক রাতে যুধিষ্ঠিরের চেয়েও বেশি সব হারানো যায়। কাইরো ইন্দরিয়াও এসব বাবদে সে আমলে খুব একটা কম যেতেন না। এসব বিলাসের কেন্দ্রে লেগে গেল জমিদারি বেচার হরিনট। ইহুদিরা ধীরে ধীরে কিনে নিল কখনও সোজাসুজি, কখনও বেনামিতে ফলস্তিনের বিস্তর জমিজমা।
সে দেশের একাধিক যুবক আমাকে পই পই করে বোঝালেন, না, প্রজাস্বত্ব আইন-ফাইন ওসব দেশে কস্মিনকালেও ছিল না। থাক আর না-ই থাক, প্রচুর জমি-জমা চলে গেল ইহুদিদের হাতে বিস্তর আরবদের করা হল উচ্ছেদ। সেই পরিমাণে বয়তুল মকুদ্দসে (সংক্ষেপে কুদস, চালু উচ্চারণে উদস), অর্থাৎ জেরুজালেমে বাড়তে লাগল ভিখিরির সংখ্যা।
.
আরবদের অনৈক্য ইহুদির প্রধান অস্ত্র
কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে একদিন অবস্থা এমন চরমে গিয়ে দাঁড়াল যে ফলস্তিনকে দু ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগে ইহুদি ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হল, সেটা সবিস্তর বলার কণামাত্র প্রয়োজন এ স্থলে নেই। ইহুদির হাতে আছে কড়ি, তদুপরি আছে দুর্নীতিতে পাজির পা-ঝাড়া ফলস্তিনের ভিতরে-বাইরে আরব নেতারা।
এক নিগ্রো বলেছিল, গোরারায়রা যখন আমাদের দেশে এল, তখন তাদের হাতে ছিল বাইবেল, আমাদের ছিল জমি। আজ জমি ওদের, বাইবেল আমাদের হাতে।
ফলস্তিনের মুসলিম চাষা ইহুদিদের কাছ থেকে তৌরিত তালুমুদ চায়নি, পায়নি। চাইলেও পেত না। কারণ বহুযুগ হল, ইহুদিরা দীক্ষা দিয়ে বিধর্মীকে আর আপন ধর্মে গ্রহণ করে না। আরবদের দীক্ষা দিলে আরেক বিপদ। স্বধর্মে নবদীক্ষিত জনকে তো চট করে তার বাস্তুভিটে থেকে তাড়ানো যায় না। আফ্রিকায় গোরারায়রা ধর্মের বদলে লব্ধ জমির খাজনা নিয়েই ছিল সন্তুষ্ট; নিগ্রোদের উচ্ছেদ করে সেখানে বিলিতি চাষা বসাতে চায়নি। ইহুদিরা কিন্তু চায় জমিটার দখল। ১৯৭১-এ পাঞ্জাবিরাও এ দেশে বলত, জমিন চাইয়ে। আদমি মর যায় তো ক্যা!
তখনও ঠেকানো যেত ইহুদিদের। আরব রাষ্ট্রগুলো যদি গৃহ-কলহ ভুলে গিয়ে একজোট হত। তারস্বরে প্রতিবাদ করেছে তারা, কিন্তু তার অধিকাংশই ছিল ফাপা, মিথ্যা, ভণ্ডামি।
আমাকে যদি জিগ্যেস করেন, ওহে ভবঘুরে, এ দুনিয়ার সবচেয়ে তাজ্জব তিলিসমাৎ কি দেখেছ? আমি এক লহমার তরেও চিন্তা না করে বলব, এই আরব জাতটা! ইরাক থেকে আরম্ভ করে ওই বহুদূর সুদূর মরক্কো অবধি বাস করে আরব জাত– অবশ্য সর্বত্রই কিছু না কিছু সংমিশ্রণ হয়েছে (পৃথিবীতে অমিশ্র জাত আছে কোথায়?)। এই আরবদের দেহে আরব রক্ত, এদের ভাষা আরবি, এদের ধর্ম ইসলাম। মিলনের জন্য যে তিনটে সর্বপ্রধান গুরুত্বব্যঞ্জক বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন সে তিনটেই তাদের আছে। অথচ খুদায় মালুম, তারা আজ কটা রাষ্ট্রে বিভক্ত। এবং সেইখানেই কি শেষ? মাশাল্লা, সুবানাল্লা- বালাই দূরে যাক! ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের তাড়নায় তারা এখনও যা প্রাণঘাতী কলহে লিপ্ত হয়, ভবঘুরে আমি কোথাও দেখিনি, পুস্তক-কীট আমি, কোথাও পড়িনি।
আর বাইরের শত্রু-মিত্রের কথা যদি তোলেন তবে সক্কলের পয়লা স্মরণে আসেন ইহুদিশ্রেষ্ঠ হের হাইনরিষ আলফ্রেড কিসিংগার। একদা নবী মুসা নিপীড়িত ইহুদিদের রক্ষা করেছিলেন জালিম মিসরিদের হাত থেকে। ইনিও এ যুগে সেই খ্যাতি অর্জন করবেন–তবে কি না, এবার বাঁচানো হবে জালিমকে মিসরিদের হাত থেকে
.
গয়নীতি
ইংরেজ এই উপমহাদেশের ক্ষয়ক্ষতি করছে বিস্তর, একথা বলা যেমন সত্য ঠিক তেমনি এ কথাটাও সত্য যে তারা আমাদের অল্পবিস্তর উপকারও করেছে। কিন্তু অপকারের দফে দফে বয়ান দেবার সময় একথা কখনও বলা চলবে না, তারা আমাদের চাষাভুষোদের উচ্ছেদ করে সেখানে আপন জাত-ভাই গোরারায়দের বসবার চেষ্টা করছে, কিংবা এ রকম কোনও একটা কুমতলব তাদের ছিল। এ দেশে হিন্দু-মুসলমান জমিদারে ঝগড়া-কাজিয়া হয়েছে প্রচুর, কিন্তু মুসলমান চাষাদের পাইকিরি হিসেবে ঝেটিয়ে হিন্দু জমিদার তার জাত-ভাই হিন্দু চাষাকে পালে পালে পত্তনি দিয়েছে, এমনতরো বার্তা কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ছে না এবং তার উল্টোটাও না। যদিস্যাৎ কালেকস্মিনে হয়ে থাকে তবে সেটা নিতান্তই ব্যত্যয়।
কিন্তু ইহুদিকুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেদিন থেকে ফলস্তিনে আসা আরম্ভ করল সেদিন থেকেই তাদের পুরো পাক্কা প্ল্যান ছিল, এ দেশে তাদের কর্মপদ্ধতিটা হবে কী প্রকারের। একদিনে না, এক বৎসরে না, ধীরে ধীরে কিন্তু মোক্ষম ঘা মেরে মেরে, উঁচ হয়ে ঢুকবে এবং ফাল হয়ে বেরুবে। না, ফাল হয়ে সেখানে আস্তানা গাড়বে। সেই মর্মে স্থির করা ছিল :
(১) হোম-ফোম ওসব বাজে কথা নয়। সম্মুখে রাখতে হবে ধ্রুব উদ্দেশ্য– এ দেশে গড়ে তুলতে হবে একটি সর্বাধিকারসম্পন্ন, সর্বার্থে স্বাধীন পরিপূর্ণ রাষ্ট্র। এবং সে রাষ্ট্র হবে বিশুদ্ধ ইহুদি রাষ্ট্র। সম্পূর্ণ গয়-বর্জিত। পাঠকের উপকারার্থে নিবেদন, ইহুদিদের প্রচলিত ভাষায় ইহুদি ভিন্ন এ দুনিয়ার কুল্লে নরনারীকে গয় শব্দের মারফত পরিচয় দেওয়া হয়। কট্টর ধর্মান্ধ ইহুদির কাছে সব গয় বরাবর। সাধু-পাষণ্ডে, নিষ্ঠুর-সদয়ে, চোর-পুলিশে, ডাকাত-ফাঁসুড়েতে কোনও তফাৎ নেই। আমরাও শাজ-বাজ কাফির শব্দ ব্যবহার করি, কিন্তু অমুসলমান মাত্রই কাফির, এদের ভিতর ভালো-মন্দে কোনও তফাৎ নেই, এ রকম একটা আজগুবি তত্ত্ব কেউ এ যাবত প্রচার করেননি। তদুপরি গয় শব্দের সঙ্গে যে পাশবিক ঘৃণা মেশানো থাকে, কাফির শব্দের চতুর্দশ পুরুষ তার গা ঘেঁষতে পারবে না।
