যাদের মস্তিষ্ক উর্বর তারা তো সঙ্গে সঙ্গে বহুবিধ চিন্তাসূত্রের সম্মুখে দিশেহারা হয়ে যাবেন, কোনওটারই খেই ধরতে পারবেন না। আমার সে ভয় নেই। আমি ভাবছি মি. ভুট্টো কি বাংলাদেশ জয় করে ঢাকা-চাটগাঁয়ে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন, না দুই দেশে রাতারাতি এমনই দহরম-মহরম হয়ে যাবে যে আমরা হরদম পিকনিক উইক-এন্ড করার জন্য ক্ষণে লাহোর ক্ষণে পিণ্ডি যাব, কনসেশন রেটে গিয়ে হব স্টেট গেস্ট! অবশ্য এটা লক্ষণীয়, মি. ভুট্টো কুয়েটা বা পেশাওয়ারে মোলাকাত হবে এ কথাটা বলেননি। বাংলাদেশ হাতছাড়া হওয়ার পর বেলুচ এবং পাঠান মুলুক এখন লাহোরের পাঞ্জাবিদের এবং করাচির খোঁজা-বোরা-সিন্ধিদের কলোনি হয়ে গিয়েছে- দুষ্ট লোকে এমন কথাও কয়। বাঙালিকে ওসব দেখানো দুলহাভাইকে তালই সাহেবের বাড়ি দেখানোরই শামিল।
.
ছি ছি এত্তা জঞ্জাল
(১) সকলেই জানেন ওয়াটারগেটের জল যখন ডেনজার লেভেলে চড়েছিল তখন নিক্সন বলতে গেলে একরকম পর্দানশিন হারেমবাসী হয়ে গিয়েছিলেন। তার পর তিনি হঠাৎ বেরিয়ে এসে এমনই কর্মকীর্তি আরম্ভ করলেন যে, আমেরিকার যেসব তালেবর পত্রিকা গণ্ডায় গণ্ডায় নামে রিপোর্টার কাম ডিটেকটিভ মোটা মোটা তখমা দিয়ে পোষে তারা পর্যন্ত হদিস পায়নি, এখনও পাচ্ছে না।
(২) এমন সময় আরও একটা মারাত্মক কেলেঙ্কারির কেচ্ছা বেরিয়ে পড়ল। স্বয়ং নিক্সন কর্তৃক মনোনীত তার ভাইস প্রেসিডেন্ট (সংক্ষেপে ভিপ) অ্যাগনো সরকারি উকিলের নোটিশ পেলেন, তার বিরুদ্ধে ঘুষ মেহেরবানি করে দেওয়া কন্ট্রাকটের কমিশন গ্রহণ, খাদ্য-মদ্যাদির নিয়মিত ভেট গ্রহণ- এককথায় দুর্নীতির জন্য মোকদ্দমা দায়ের করা হবে। নিক্সন তিপকে এক ঘণ্টা ধরে ধস্তাধস্তি করলেন, তিনি যেন রিজাইন দেন। নিন্দুক বলে, ভিপকে কাবু করার জন্য নিক্সনের খাস-দফতরের নাকি কারসাজি আছে এবং আসলে তিনি নাকি অ্যাগনোকে দেখিয়ে একজন বড় মানুষকে ভিপ বানিয়ে আনতে চান, যে তার হয়ে ওয়াটারগেট মামলা যদি নিতান্তই খারাপের দিকে বেয়াড়া গুডিডর মতো মুণ্ড খেতে থাকে তবে–জব্বর লড়াই দেবে। সেই লোভে ইতোমধ্যেই নিক্সনের প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এক আঁদরেল চাই শিঙ ভেঙে রিপাবলিকান দলে ভিড়ে যত্রতত্র চেল্লাচেল্পি আরম্ভ করেছেন, টেপ দেওয়া না দেওয়ার পুরো এখতেয়ার একমাত্র প্রেসিডেন্টের।
(৩) এতদিন কিসিংগার থাকতেন নেপথ্যে। কিন্তু একদিন কংগ্রেসের সামনে নিক্সনের ফরেন মিনিস্টারকে দিতে হয় সাফাই। অতএব তাঁকে দাঁড় করানো হল কাঠগড়ায়। ওদিকে তিনি যে তার বন্ধু।
.
অভিশপ্ত ফলস্তিন
চল্লিশ বত্সর পূর্বে মিশরের আলআজহারে ছাত্রাবস্থায় থাকাকালীন ফলস্তিন দেখতে যাই। তাই বলে নয়, এমনিতেই ভবঘুরে বলে আমার একটা বদনাম আছে। শতাধিকবার আমি এই অবিচারের বিরুদ্ধে যতবার দেমাতি প্রকাশ করেছি পাঠক-সাধারণ ততই মুচকি হেসে, দ্বিগুণ উৎসাহে, আমাকে ভবঘুরেমি থেকে বাউণ্ডুলে পদে প্রমোশন দিয়েছেন। তবু শেষবারের মতো, আবার বলে নিই, যে-কোনও প্রকারের স্থান পরিবর্তন শারীরিক নড়নচড়ন আমার দু চোখের দুশমন। কট্টর মরণ-বাচন সমস্যা দেখা না দিলে আমি বারান্দা থেকে রক-এ পর্যন্ত রোলস-এ চড়েও যেতে রাজি হই না। বিছানা থেকে গোসলখানায় যাবার তরে জনকল্যাণ সরকারকে একটা বাস সার্ভিস খুলতে সকরুণ দরখাস্ত পাঠিয়েছি।
অপিচ, মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করব, ফলস্তিন গিয়েছিলাম সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় সোৎসাহে। অবশ্যই, লাঞ্ছিত পদদলিত আরবদের দুরবস্থা দেখবার জন্য নয়। তখনও সে দুর্দিনের ঝড়-তুফান আরম্ভ হয়নি। কিন্তু তার ইতিহাস আমি পাঠকের ওপর এখন চাপাতে চাইনে। ওপার বাংলায় একবার চেষ্টা দিয়েছিলুম আমি আর প্রুফরিডার ছাড়া সে সিরিজ কেউ পড়েনি।
ফলস্তিনের দুর্দশার জন্য দায়ী কে?
ইহুদিদের চেয়ে আরবদের মুসলমানদের আমি দোষ দি বেশি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ইংরেজও ইহুদিদের পালৈ পালে ফলস্তিনে আসতে দেয়নি। বস্তুত হজরত ওমরের আমল থেকে শেষ তুর্কি খলিফার রাজত্ব অবধি সবসময়ই কিছু কিছু ইহুদি, এমনকি জার-আমলে রুশ ইহুদিও পুণ্যভূমিতে এসে বাসা বেঁধেছে। তারা ছিল গরিব বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির লোক। আরবদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে, তাদেরই মতো দু পয়সা কামিয়ে দুঃখে-সুখে দিন কাটিয়েছে। কালক্রমে তাদের মাতৃভাষাও হয়ে গেল আরবি। সঙ্কীর্ণ হলেও আরবি সাহিত্যে তাদের স্থান আছে।
.
চাষার সর্বনাশ
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যারা এল তারা সঙ্গে নিয়ে এল অফুরন্ত অর্থভাণ্ডার। যুদ্ধের সময় সারা বিশ্বজুড়ে ইহুদি সম্প্রদায় জেনে গিয়েছিল মিত্রশক্তি পুণ্যভূমি ফলস্তিন তাদের হাতে সঁপে দেবেন, তারা সেখানে, পাক্কা দু হাজার বছর নানাদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর আবার জেহোভার জায়নের নবীন রাষ্ট্র নির্মাণ করবে। প্রকৃতপক্ষে মিত্রশক্তি কিন্তু আদপেই ইহুদি রাষ্ট্র নির্মাণের কোনও ওয়াদা কাউকে দেয়নি। তারা বলেছিল ইহুদিরা গড়ে তুলবে জুয়িশ ন্যাশনাল হোম- এবং এই হোম কথাটার ওপর যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়েছিল বার বার। কিন্তু ইহুদিরা সেটা জেনেশুনেও প্রচার চালাল সেটাকে রাষ্ট্র নাম দিয়ে। সেই রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য যে কী পরিমাণ অর্থ, পরবর্তীকালে অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো হয়েছিল সেটার চিন্তামাত্র করা ডাঙ্গর ডাঙ্গর ব্যাঙ্কার মহাজনদেরও কল্পনার বাইরে।
