এবারে মতলব দুটো : যুদ্ধবন্দিদের বিচার করে কী হবে? এই তো বাঙালিরা ফিরে যাচ্ছে দেশে। বউ-বাচ্চার সঙ্গে মিলিত হবে। ওই বন্দিদেরই-বা আটকে রেখেছ কেন, তাদের কি বউ-বাচ্চা নেই? দ্বিতীয়, ভুট্টো সাব চান, বাংলাদেশের সঙ্গে দোস্তি করতে। পুরনো কথা ভুলে যাওয়াই ভালো। দুই দেশে দোস্তি হলে উপকার উভয়ত : গয়রহ গয়রহ।
তোলা হল না একটি কথা : কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্বন্ধে স্পিকটি নট, নট কিচ্ছ। ভারি মজার প্রপাগান্ডা। রসে টইটম্বুর। বারান্তরে হবে।
.
লন্ডনি স্বীকৃত বাংলাদেশ?
রাত পৌনে তিনটে থেকে সোয়া তিনটে অবধি সিলেটি ভাষায় পাক বেতার বিলেতবাসী সিলেটিদের জন্য প্রোগ্রাম দেয়। দুটি ছেলে ও একটি মেয়ে। নিজেদের নামও বলেছে তারা, আমার মনে নেই। আমি বাড়িয়ে বলছিনে, কিন্তু মনে হল, তাদের কণ্ঠস্বর বড়ই প্রাণহীন। ১৯৭১-এর নভেম্বর-ডিসেম্বরে যারা এই প্রোগ্রামটি আঞ্জাম করত তাদের বেশ দু তিনজন গাঁক গাঁক করে হুঙ্কার ছাড়ত, কণ্ঠস্বরে আত্মবিশ্বাসের স্পষ্ট আভাস থাকত। বেচারিরা জানত না, তাদের দিন ঘনিয়ে এসেছে। ঠিক মনে নেই, ষোল-সতেরো ডিসেম্বরে সে প্রোগ্রাম উঠে গেল। ওদের সম্বন্ধে একটা কথা কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়। ওরা প্রতিদিন নিজেদের সিলেটি সম্বন্ধে সচেতন হচ্ছিল এবং খাঁটি সিলেটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। যেমন, প্রথম দিন প্রোগ্রাম পরিচিতির সময় শেষ দফায় বললে, সর্বশেষ সিলেট থেকে যারা আপন আপন আত্মীয়-স্বজনকে খবর পাঠাবেন, সেগুলো আপনারা শুনতে পাবেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন সমাসটি আমরা বড়ই শাজবাজ ব্যবহার করি। পরের দিন ঘোষক আত্মীয়-স্বজনের পরিবর্তে বললে ভাই-বরাদর। আমি মনে মনে বললাম, লেড়কার তরক্তি অইছে। মাশাআল্লা। পরের দিন ছোকরা একেবারে বন্দর-বাজারের চৌকে পৌঁছে গেল। বললে, খেশ-কুটুমর লগে মাতিবা। আমি ফাল দিয়ে উঠে বললুম, সাবাশ! ঔতত বেটার চাকু মারি দিচ্ছে। পাঠক হয়তো তপ্ত-গরম হয়ে খাট্টা গেরাবি দেবেন, তুমি তো বড় বইতল মশায়! বাংলাদেশের খেলাফে আজেবাজে বকছে, আর তুমি বলছ, সাবাশ! আহা আমি ভাষাটার কথা বলছি, তার বক্তব্যের কিতাবের টেকনিক্যাল পরিভাষায় যাকে বলি মন, সেটার তারিফ করতে যাব কেন? সেটা তো গাছে আর মাছে ভূমা বন্দর-বাজারি গফ। তা সে যাকগে, এর পরের প্রস্তাব পাড়ার পূর্বে, ইতোমধ্যে পূর্বোক্ত গেরাবি শব্দটি খাস সিলেট-নাগরিক ভিন্ন অন্য সিলেটি এবং আর পাঁচজন আঞ্চলিক ভাষানুসন্ধানীজনকে বুঝিয়ে দিই। টিপ্পনী কাটা, গহার বা বাগার দেওয়া, ঘটিদের ফোড়ন দেওয়া আর গেরাবি দেওয়া এই ইডিয়ম। সিলেট শহরের আশেপাশে যখন ইংরেজ ম্যানেজারদের চা-বাগিচা বসল তখন বাবুর্চি-খানসামারা মেমসায়েবদের কাছে মাছ-গোস্তর মাখো মাখো ঝোল-এর পরিভাষা ঘেভি শব্দটা শিখল। তার থেকে গেরাবি। আমার জানামতে এরকম আরও গোটা ছয় ইংরেজি শব্দ সোজাসুজি সিলেটিতে ঢুকেছে। এই ধরনের একটি ভারি মজাদার শব্দের সঙ্গে সেদিন পরিচয় হল, চাটগাঁয়ের আঞ্চলিক ভাষাতে অন্তিম্যান শব্দটি প্রথমদর্শনে মনে ভীতির সঞ্চার করে। জীবনের অন্তি অবস্থা অন্তিম মান বুঝি এসে গেল! প্রখ্যাত সাহিত্যিক, আমাদের পথপ্রদর্শক মহবুবুল আলমের ভ্রাতা ওহীদুল আলম সাহেবের উস্কৃষ্ট গ্রন্থ পৃথিবীর পথিক-এর পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে মমাগ্রজ মূর্তজা সাহেব আমাকে অভয় দিয়ে ছাপার হরফে লিখেছেন, অন্তিম্যান হ্যান্ডনোটের অন ডিমান্ড উক্তি থেকে এসেছে।
পাছে বিলাতবাসী সিলেটিদের (এদের সিলেটবাসীরা লন্ডনি নাম দিয়েছেন) পূর্বোক্ত শব্দ-সঙ্কটে ত্রাসের সঞ্চার হয়, তাই করাচির সিলেটি অনুষ্ঠানে ঘোষক, অনুবাদক বিকট বিকট ইংরেজি শব্দ আদৌ অনুবাদ করেননি। যেমন প্রটোকল, এটমিক এনার্জি কমিশন ইত্যাদি। কিন্তু কারখানা অর্থে প্লান্ট (মার্কিনি উচ্চারণে প্ল্যান্ট) কেন যে অনুবাদ করলেন না, বোঝা গেল না। ওদিকে জনগণ (আমরা বলি পাঁচজন, পাজ্জন), কন্যা (বান, ছয়লাব), ফসল ক্ষতিগ্রস্ত অইছে (আমরা বলি ফসলার লুকসান অইছে) এবং সবচেয়ে মজার– সিলেটি মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য সংবাদ-পাঠক বললেন মাদাউকুর ভোজ। মাদাউকুর খানা, দাওৎ বা জিয়াফত আমরা প্রায়ই বলে থাকি, আর এ স্থলে এটা আজিজ আহমদের দেওয়া দাওই ছিল– তাই মাদাউকুর ভোজ-এর মতো বিজাংগা গুরুচণ্ডালী একমাত্র করাচিতেই সুলভ।…পত্র-লেখকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘোষক ঠিকানা দিলেন পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান তো কবে মরে গিয়েছে। মৃতদেহ নিয়ে সহবাস করার একটা গল্প মোপাস লিখেছেন বটে! প্রেতাত্মা নিয়ে লিখে আমি নোবেল প্রাইজ পাব, নির্ঘাৎ।
রেকর্ড সঙ্গীতে কাফিরি কীর্তন-সুরে উদ্গীত বাজানো হল। সে এক অদ্ভুত ভুতুড়ে রসের অবতারণায় কুল্লে ঘরটা যেন ছিমছিম, মাথাটা তাজ্জিম-মাজ্জিম করতে লাগল।
আল্লা জানেন, আমি সিলেটি প্রোগ্রামের এই তিনটি প্রাণীকে নিয়ে মস্করা করছিনে। আমার বার বার মনে হচ্ছিল, এরা যেন অতিশয় অনিচ্ছায় একটা অপ্রিয় কর্ম করে যাচ্ছেন এবং বার বার আমার মনটা বিকল হয়ে যাচ্ছিল। বেচারিরা! এত শত লোক দেশে ফিরে আসছে, এরা চলে আসে না কেন? হয়তো বাধা আছে।
.
ঢাকায় জনাব ভুট্টোর
আসন্ন শুভাগমন
কিন্তু পাঠক, মাত্রাধিক বিষণ্ণ হবেন না। আপনাদের জন্য একটি খুশ-খবর কোনও গতিকে জিইয়ে রেখেছি। যারা রীতিমতো পাক বেতার শুনে থাকেন, তারাও একই খবর শোনার আনন্দ দু বার করে পাবেন, বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একখানা বাকিরখানি খেলে যে রকম দু খানি খাওয়া হয়। পাকিস্তান থেকে যখন একদল বাঙালি দেশে ফেরার জন্য প্লেনে উঠছেন তখন মি. ভুট্টো তাদের উদ্দেশে উর্দুতে একটি ভাষণ দেন। নানাবিধ মূল্যবান তত্ত্বদানের পর মি. ভুট্টো বলেন, আপনাদের সঙ্গে ফের দেখা হবে। করাচিতে, লাহোরে কিংবা ঢাকা বা চাটগাঁয়।
