একেই বলি যথার্থ ইহুদি। তিনি আল্লার স্বহস্তে নির্বাচিত মহাত্মা- জেহোভা তাকে নির্বাচন করুন আর না-ই করুন। কোথায় লাগেন স্বয়ং মেটারনিষ তাঁর পাশে মেটারনিষের পরোক্ষ ভাবার্থে শিষ্য কিসিংগার, তিনি তারও কত অতল তলে! অবশ্য এটাও তর্কাতীত নয়, সাক্ষাৎ মোলাকাৎ হলে মেটারনিষ তাকে গ্রহণ করতেন কি না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, প্রথম যৌবনে, কাব্যলোকে যখন তিনি প্রথম ভীরু মৃদু পদক্ষেপে অবতরণ করছেন তখন হাইনে পড়ে তার চারটি কবিতা বাংলাতে অনুবাদ করেন। সেই রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভূমিতে গোরা রায়দের তাণ্ডবনৃত্যের খবর পেয়ে একদা লিখেছিলেন,
টুটলো কত বিজয়তেরণ
লুটোলো প্রাসাদ চূড়ো
কত রাজার কত গারদ
ধুলোয় হল গুঁড়ো।
আলিপুরের জেলখানাও
মিলিয়ে যাবে যবে
ভাবিস তোরা কিসিংগারী
ধাপ্পা তবু রবে!
দু কান ছুঁয়ে অপরাধ স্বীকার করছি কিসিংগারি অংশটুকুতে ইহুদি-বৈরী হিটলারের ভূত আমার হাত দিয়ে তামাক খেয়ে গিয়েছে।
কিন্তু এই সুবাদে একটি সত্য স্পষ্টভাষায় না বললে আমার মতো বাঙালি মুসলমানদের প্রতি অবিচার করা হবে। আমি ইহুদি-বৈরী নই। ইহুদিদের নবী মুসা, নূহ আমারও নবী। নবী দাউদের বংশে জন্ম হজরত ঈসা মসীহকে আমি রূহুল্লা বলে স্বীকার করি। ব্যক্তিগত জীবনে আমি একাধিক সুপণ্ডিত সহৃদয় ইহুদির কাছে তওরিত– হিব্রুতে তোওরা অধ্যয়ন করেছি, যদিও আমি সম্পূর্ণ সচেতন যে, প্রচুর প্রক্ষিপ্তাংশের দরুন তওরিৎ পরবর্তী যুগের কসুল উল আম্বিয়ারই মতো প্রামাণিক গ্রন্থ। খ্রিস্টানদের মতো আমি ইহুদিকুলকে বংশানুক্রমে চিরতরে ইল্লা বিল কিয়ামা কিয়ামত অবধি শয়তাগ্রস্ত অভিশপ্ত বলে মোটেই স্বীকার করিনি। পক্ষান্তরে আমার দৃঢ়তম বিশ্বাস ইজরায়েল রাষ্ট্র অভিশপ্ত। গৃহহারা আরবদের তারা কস্মিনকালেও স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে দেবে না বলে তারা চিরতরে অভিশপ্ত। বৈজ্ঞানিক হিসেবে আলবার্ট আইনস্টাইন ধন্য, কিন্তু মাতৃভূমি থেকে আরব বিতাড়নকারী, ইজরায়েল রাষ্ট্রের সমর্থকরূপে শেষবিচারের দিনে আল্লার সামনে তাকে দাঁড়াতে হবে।
নিক্সনরূপী বিরাট রসাল কিংবা ওক অবলম্বন করে অতি অল্পকালের মধ্যেই কিসিংগাররূপী লতা– স্বর্ণলতার স্বর্ণটা উপস্থিত বাদ দিলুম, মগডাল অবধি চড়েছেন। লা ফতেনের লতার মতো তার আচরণে বড়-ফাটাই ধরা পড়বে কি না, এখনও বলা যায় না। ইতোমধ্যে যদিও, যে কোনও কারণেই হোক (আমার বিশ্বাস, কারণ সন্ধানে বেশি দূর যেতে হবে না; ইহুদি কিসিংগার অভূতপূর্ব পদ্ধতিতে যে বৃক্ষটি জড়িয়ে ধরতে পেরেছেন, সেটা যেন লতাসুদ্ধ মড়মড়িয়ে খুঁড়িয়ে না যায়, তার জন্য কুল্লে দুনিয়ার সাকুল্যে ইহুদি ব্যাঙ্কার প্রতিপক্ষকে খানিকটে মোলায়েম করে তুলে এনেছেন) নিক্সন দু দণ্ডের তরে দম ফেলার ফুরসত পেয়েই প্রতিপক্ষকে কটুকাটব্য ঝাড়তে আরম্ভ করেছেন, তবু ভবিষ্যত্বাণী করাতে সিদ্ধহস্ত এক মার্কিন কাগজ বলছেন, হোয়াইট হাউসের ভিতর নিক্সন যতই হাইজাম্প লংজাম্প মারুন, বাইরের ভুবনে এখনও বিস্তর মারাত্মক সব মাইন-বাঁধা ফাঁদ পাতা রয়েছে; তার পিঠ পিঠ সুপ্রিম কোর্ট যদি শেষ আদেশ দেয় এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাগনোকেও যদি অসম্মানে বিদায় নিতে হয়, তবে নিক্সনের অবস্থা হবে পূর্ববৎ–সেই ফাটাবাশের মধ্যিখানে এক-ঘরে অবস্থায়। পত্রিকাখানি আখেরি বিভীষিকা দেখিয়ে বলেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত নিক্সনকে করতে হবে শেষ সর্বনাশা (ফেটফুল) পদক্ষেপ। তখন কি ইহুদি-নন্দন কিসিংগার প্রাক্তন লাট মালেকের কায়দায় হনুমানি লক্ষে আরেকটা রসাল জাবড়ে ধরতে পারবেন?
কিন্তু আসল প্রশ্ন, অদূর ভবিষ্যতে যাই হোক, যা-ই থাক, কিসিংগার কোন পথ নেবেন? ইজরায়েল নামক অতল গহ্বরে তার বুদ্ধিতে ভালো করতে গিয়ে ইহুদিকুলকে শেষ ধাক্কা দিয়ে বিনাশ করবেন, না হাইনের সদৃষ্টান্ত অনুসরণ করে শূন্যে আলোকলতার মতো দোদুল্যমান হৃদয়তাপে ভরা ইজরায়েলি রাষ্ট্রের ফানুসটাকে ফাটিয়ে দিয়ে তার স্বজাতি ইহুদি কওমকে বাঁচাতে সক্ষম হবেন? তা যদি না পারেন– বিরাট বসুন্ধরায়, আল্লার কুশাদা দুনিয়ার নিরীহজনকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ না করলেও বিশ্বইহুদির উমদাগুঞ্জাইস হয়– তবে তিনি হাইনের খ্যাতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারবেন। হজরত মুসা যে রকম একটা ইহুদি কওমের ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
***
একটা মজাদার দিলচসপ সার্কাসের ক্লাউন ঢঙের খবর পাঠককে না জানিয়ে লেখাটা শেষ করতে পারছিনে। যারা জানেন তারা অপরাধ নেবেন না। তেসরা রমজানের সেহরির সময় বেতার নাড়াতেই হঠাৎ শুনি সিলেটি বাংলা উচ্চারণ মোটামুটি ভালোই, খবর দিচ্ছে মি. ভুট্টোর দিগ্বিজয় বাবদ। তার পর সালঙ্কার সবিস্তর বয়ান দিলে, যেসব বাঙালি পাকিস্তান থেকে শিগগিরই বাংলাদেশ ফিরে যাবেন তাদের কেনাকাটা সম্বন্ধে তারা খবর পেয়েছেন বাংলাদেশে সব মাল বড্ড আক্রা, ইন্ডিয়ার আমদানি মাল বড্ড নিরেস।
ঠিক এই ধরনের ব্রডকাস্ট করা হয়েছিল ৭১-এর নভেম্বর-ডিসেম্বরে, বিলাতবাসী সিলেটিদের জন্য। উদ্দেশ্যটা চটসে বোঝা যেত যদিও সেটা কামুফ্লাজের চেষ্টা জোরসে করা হয়েছিল, ভাই বিলেতবাসী সিলেটুটিগণ, পূর্ব পাকের সর্বত্র পরিপূর্ণ সালামত। তোমরা আত্মীয়স্বজনকে যে টাকা পাঠাও সেটা বন্ধ কর না। সরকারের জরিয়ায় পাঠিয়ে কিন্তু। এই শেষটাই ছিল আসল মতলব। আমি অবশ্য স্থানাভাববশত অতি সংক্ষেপে সারছি।
