.
বিশালতর ইজরায়েল?
এদের বের করে আনতে পারলে আরব-ইজরায়েল ব্যাপারে নিরঙ্কুশ নিরপেক্ষ ইহুদিকুলগৌরব কিসিংগার এদের জমিজমা ঘরবাড়ি দেবেন কোথায়? নিশ্চয়ই মারাত্মক রকমের ওভার-পপুলেটে আমেরিকায় নয়। সে কী করে হয়, পাগল নাকি?
ভাবছি, ক হাজার আরব মুসলমানকে খেদিয়ে এদের জন্যে স্থান করবেন নিরপেক্ষ কিসিংগার কোথায়?– ফলস্তিনে, সিরিয়া-লেবানন জয় করে?
গোড়াতেই তাই নিবেদন করেছিলুম, নিকট-প্রাচ্যের গোটা চারেক ঘুড়ি, বিশ্বের গোটা চারেক শক্তির ঘুড়ি, কোথায় রুশের ইহুদি ঘুড়ি আর কোথায় মার্কিন ইহুদি ঘুড়ি, তার কাপ্তেন কিসিংগারের রাম-মাঞ্জাওলা অতগুলো ঘুড়ি ঝেটিয়ে, একজোট করে, বাদাম পাচে সবকটাকে কাটব, হেন এলেম আল্লা দেননি।
.
‘দূরকে করিলে নিকট বৈরী’
আমাদের বিখ্যাত সাধক কবি লালন ফকির গেয়েছেন,
হাতের কাছে পাইনে খবর
খুঁজতে গেলাম দিল্লি শহর
জার্মান কবি গ্যোটেও বলেছেন,
দূরে দূরে তুমি কেন খুঁজে মরো
সুখ সে তো সদা হেথায় আছে
শিখে নাও শুধু তারে ধরিবারে
সুখ সে রয়েছে হাতের কাছে।
সুখের বেলা হবেও-বা। কিন্তু দুঃখটা খুব সম্ভব আসে দূরের থেকে। দুঃখটার উৎপত্তি যদি হাতের কাছেই হত তবে তাকে ধরবার কায়দাটা রপ্ত করে নিয়ে টুটিটা চেপে ধরে তাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করতুম না?
নিকট প্রাচ্যের সর্বনাশ তো তৈরি হয় দূর বিদেশে, আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বাংলাদেশ ভারত আফগানিস্তানের দম বন্ধ করার জন্য দড়ি পাকানো হয় দূরে বহু দূরে উজ্জয়িনীপুরে, থুড়ি, দজ্জালিনীপুরে। তদুপরি আমার ব্যক্তিগত অতি গভীর বিশ্বাস সে দুঃখ নিবারণার্থে ভিন দেশের দিকে তাকিয়ে থাকাটার মতো আকাট আহামুকি আর কিছুই হতে পারে না। আপনার-আমার আপন দেশের লোক আপন ধর্মের ভাই যেভাবে দুশমনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আপনাকে-আমাকে দুঃখ-বেদনা দিল, তার পরও ভরসা রাখব বিদেশির ওপর? কার্ল মার্কসের ওপর আমার অসীম শ্রদ্ধা। তিনি বিশৃপ্রলেতারিয়ার প্রতি ঐক্যবদ্ধ হতে যে আদেশ দিয়েছেন সেটা বাংলাদেশের সর্বজনের ওপর খাটে। এ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি যে শোচনীয় জীবন ধারণ করে তার চেয়ে বিলেতের তথাকথিত প্রলেতারিয়ার জীবন শতগুণে শ্রেয়ঃ। আর এদেশে সত্যকার ধনী যারা, ফুলে উঠেছেন যারা, তাদের প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানাবার রত্তির প্রয়োজন নেই। তারা বাস্তুঘুঘুর পাল। সময় থাকতেই এক লক্ষে আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে গোলে হরিবোল দেবেন। আমার শুধু আশঙ্কা আখেরে নেতৃত্বটা না তাদের হাতেই চলে যায়। যা হয়েছে শত বার হয়েছে, এদেশে, ভিন দেশে, সর্ব দেশে অতীতে। তাই থাক এ প্রসঙ্গ উপস্থিত ধামাচাপা।
.
বিশ্ব ইহুদি
বলছিলুম, আসমানে বিস্তর চিড়িয়া বাদাম প্যাঁচের করকরে মাঞ্জা লাটাইয়ে তো নেই-ই, তার ওপর একটা বিরাট বাজপাখি আসমানি রঙের সঙ্গে তার আগাপাশতলা এমনই মিলিয়ে দিয়ে আচানক ছোঁ মারে যে তার কোনওকিছুই ধরা-ছোঁওয়ার ভিতরে আসে না। নেই নেই করে তবু দু পাঁচজন মার্কিন আছেন যারা বাজটাকে চেনেন কিন্তু ওর সম্বন্ধে মুখটি খুলেছেন কি তাদের রাজনৈতিক জীবনের ইন্না লিল্লাহি
বিশ্ব ইহুদি, ইহুদিতন্ত্র জায়োনিজমের কেন্দ্রভূমি এখন আমেরিকায়। একদা ছিল অস্ট্রিয়া ও জর্মনিতে। মেটারনিষের যে ভিয়েনা-কংগ্রেসের কথা কিসিংগার সুবাদে উল্লেখ করেছিলুম সে কংগ্রেসে সর্ব নেশনের উদ্দেশ্যে যেসব অনুরোধ-আদেশ জানানো হয়, তারই একটা ইহুদিদের ব্যাপকতর রাষ্ট্রাধিকার দেবার জন্য, বিশেষ করে জর্মনিতে। সাধে কি আর জর্মন ইহুদি কিসিংগার মেটারনিষকে গুরু বলে মেনে নিয়েছিলেন! সম্পূর্ণ অবান্তর নয় বলে মনে প্রশ্ন জাগে, শিষ্য কিসিংগার কি একদিন শুরুর মতো ইতিহাসে তার নাম রেখে যেতে পারবেন? সে আলোচনা ক্রমশ আলোচ্য ও প্রকাশ্য; উপস্থিত একটি তথ্য পাঠকের স্মরণে এনে দিই– জর্মনির মহাকবি হাইনরিখ হাইনের বয়স আঠারো–ভিয়েনা কংগ্রেসের সময়। সে কংগ্রেসের সুপারিশ অনুযায়ী অধিকার লাভের ফলে কয়েক বৎসরের মধ্যেই বার্লিনে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ইহুদিরা আপন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন ও যুবা হাইনে সেটিতে সোৎসাহে যোগদান করেন। সদস্যরা আনন্দে আটখানা হয়ে হাইনেকে কোলে তুলে নেন, কারণ তখন হাইনের খ্যাতি জর্মনির ভিতরে-বাইরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শতাধিক বৎসর ধরে যে হাইনের খ্যাতি অদ্যাবধি ক্রমবর্ধমান, নবজাতকসম অম্লান পদদলিত প্রণয় নিবেদনের মর্মদাহ সরলতম ভাষায় প্রকাশ করতে আজও যার সমকক্ষ কেউ নেই, অনুভূতির ভুবনে তাঁকে প্রবঞ্চিত করতে পারবে কোন কৃত্রিম আত্মম্ভরিত্বের প্রতিষ্ঠান! ইহুদিদের এসব প্রতিষ্ঠানের মূলনীতি ছিল, তারা জেহোভার নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ মানবসন্তান, তাদের প্রাচীন কীর্তির কাছে কি মিশর কি ব্যাবিলন বিশেষ করে গইম (অ-ইহুদি তুচ্ছার্থে, যে রকম আমাদের ভাষায় অনার্য-কাফের প্রভৃতি শব্দ আছে) গ্রিক-রোমান-ভারতীয় আর্য সভ্যতা দুগ্ধপোষ্য শিশুবৎ এবং সবচেয়ে মোক্ষমতম তত্ত্ব তাদের মসিয়া (আরবিতে মসিহ মাহদি অর্থে) একদিন ধরাতলে অবতীর্ণ হয়ে জেহোভার এই নির্বাচিত সন্তানদের চিরকালের তরে ত্রিভুবনেশ্বর করে দেবেন–গইমদের আর কোনও ভরসা থাকবে না। বলা বাহুল্য, এ ধরনের মিথ্যার সাবান দিয়ে তৈরি ভাবালু ভাপে-ভরা বুদ্বুদ হাইনেকে বিরক্ত, হয়তো-বা ক্রুদ্ধ অতিষ্ঠ করে তোলে। কয়েক মাস যেতে না যেতেই তিনি এদের সংস্রব চিরতরে বর্জন করেন। এই হাইনের আশীর্বাদ লাভের জন্য তার চেয়ে একুশ বছরের ছোট কার্ল মার্কস বিলেত থেকে প্যারিসে তীর্থযাত্রা করেন, এ হাইনের নামে স্বয়ং কাইজার পর্যন্ত শঙ্কিত হতেন। প্রতি নববর্ষে এ হাইনের নির্বাসনদণ্ড মোহককম করতেন স্বহস্তে। গরিব-দুঃখীর জন্য তার লড়াই কাইজারের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে তার আজীবন আমৃত্যু সগ্রাম– প্রথম যৌবন থেকে এ হাইনেকে, অতিশয় মাতৃভক্ত এই পুত্রকে, মাকে ছেড়ে দূর বিদেশের নির্বাসনে সমস্ত জীবন কাটাতে হয়, মৃত্যুবরণ করতে হয় প্যারিসে।
