তাই প্রথম প্রশ্ন, সত্যই আফগান জঙ্গি বিমানবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল আবদুর রাজ্জাক, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মেইওয়ান্দওয়ালা, গবর্নর খান মুহম্মদ একটা বিপ্লব ঘটাবার তালে ছিলেন, না দাউদ তার নবপ্রবর্তিত মোল্লা-বিরোধী আইন প্রবর্তন করার ফলে নিজেই বুঝতে পারলেন যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুতগতিতে কমে যাচ্ছে, এবং এই তিন ব্যক্তি নিষ্ক্রিয় থাকা সত্ত্বেও জনসাধারণ/মোল্লাগণ/ ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তান-প্রেমীগণ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অতএব বেলা থাকতেই এদের জেলে পুরে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে কিংবা অল্প খর্চায় গোটা কয়েক বুলেট দিয়ে।
.
আসলের চেয়ে ভালো কিসিংগারি ভেজাল
পাঠক, আমার পাক্কা ইরাদা ছিল, কাবুলি ক্যু– মনগড়া হোক আর জলজ্যান্তই হোক তার পিছনে কল-কাঠি নাড়াবার তরে পাকিস্তান, রাশা, শাহের মারফত আমেরিকা, কে কতখানি উৎসুক সেই নিয়ে এ লেখাটি শেষ করব। উপরের অনুচ্ছেদ সম্প্রসারিত করতে যাওয়ার এক ফাঁকে বেতারটির কর্ণমর্দন করতেই শুনি, মার্কিন কণ্ঠ মার্কিনি উচ্চারণে বলছেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্রীযুক্ত হেনরি কিসিংজারের বক্তৃতা শুনতে পাবেন। ফরেন মিনিস্টার হওয়ার পর এই তার প্রথম বক্তৃতা। আমি আশা করেছিলুম, আজ সোমবার, আমাদের সময়ানুযায়ী রাত দশটায় ওয়াটারগেটের মুলতুবি যে মোকদ্দমাটা ফের শুরু হওয়ার কথা, শুনব সেটা। এ মোকদ্দমাটা যে কেন ছ সপ্তাহের ছুটি না-মঞ্জুর করে তিন সপ্তাহ এগিয়ে আনা হচ্ছে তার অল্প-বিস্তর আলোচনা আমি পূর্ববর্তী সংখ্যায় করেছিলাম। আমার আশা ছিল, সেই মোকদ্দমাটা হয়তো-বা মার্কিন কণ্ঠ সরাসরি আদালত থেকে বেতারিত করবে, নইলে নিদেন একটা ধারাকাহিনী তো বটেই। পাঠক, বিবেচনা করুন, কোনটা বেশি রগরগে হত!
তবু মন্দের ভালো। আমি এ তাবৎ কিসিংগারি বক্তিমে কখনও শুনিনি। আমার প্রধান কৌতূহল : কিসিংগার জীবনের প্রথম পনেরো বছর কাটিয়েছে জর্মনির ক্ষুদে ফুর্ট শহরে। মাতৃভাষা তার জর্মন এবং ওই ক্ষুদে শহরে নিত্যি নিত্যি ইংরেজি বলার সুযোগ-সুবিধে নিতান্তই নগণ্য– বস্তুত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তার ডক্টরেট থিসিস লেখেন জর্মনে।
খলিফে ছেলে মশাই, খলিফে ব্যক্তি। যা ইংরেজি ছাড়ল– কার সাধ্যি বলে তাঁর মাতৃভাষা ইংরেজি নয়। শুধু কি তাই, যদিও এই চৌকস ঘড়িয়ালটি মার্কিনত্বে খাস জাত-মার্কিনকেও ঢিট দিতে চান ঝালে-ঝোলে-অম্বলে, তবু ইংরেজি উচ্চারণের বেলা নাকি-সুরে, র অক্ষরকে ড় করে চিবিয়ে চিবিয়ে, টেনে টেনে বেটাড অ্যান্ড বিগাড় মার্কিনি ইংরেজি বললেন না। রপ্ত করেছেন মার্কিন আর খাস ইংরেজির মধ্যিখানের এমন একটি উচ্চারণ যেটা দুই দেশেই কদর পাবে। শুধু লক্ষ করলুম তাঁর চ উচ্চারণে কিঞ্চিৎ জর্মন আড় রয়ে গেছে। কারণ জর্মন ভাষায় চ ধ্বনিটি আদৌ নেই। কিন্তু আমার এই মিহিন নুখতাচুনিতে পাঠক কান দেবেন না। মোদ্দা কথা : আমি অন্য কোনও জর্মনকে এ হেন উৎকৃষ্ট ইংরেজি বলতে শুনিনি।
আর বক্তৃতার বিষয়বস্তু? সেটা বারান্তরে হবে। উপস্থিত তার একটি আজব বাৎ শোনাই। তিনি বললেন, ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নতির দিকে। খাস ঢাকায় যদি এই বচনামৃতটি ঝাড়া হত তা হলে ডাইনে বাঁয়ে চটসে তাকিয়ে নিয়ে বলতুম, আস্তে কয়েন কত্তা, ঘোড়ায় হাসবো।
.
পরলোকগত বাদাম প্যাঁচ
বহুকাল গেছে কেটে। প্যাঁচটাও গেছে উঠে। অতএব সে প্যাঁচের টেকনিক্যাল নামটাও যে ঘুড়িয়ালারা ভুলে যাবে তাতে আর তাজ্জব মানার কী আছে? সে আমলে কলকাতায় বসন্তের আকাশ ছেয়ে যেত কত না চিত্র-বিচিত্র ঘুড়িতে। কিন্তু বাচ্চাদের মাঞ্জাহীন গুড্ডির সঙ্গে প্যাঁচ লাগানোটা আমরা রীতিমতো ইতরতা বলে মনে করতুম। উপরের আকাশে চলত এ-পাড়া ও-পাড়ার ঝানুদের ভিতর উপর-প্যাঁচ, নিচের প্যাঁচ, ঢিলের প্যাঁচ, সুতো ফুরিয়ে গেল টানের প্যাঁচ, এ প্যাঁচটা কিন্তু অনেকেই ফাউল বলে বিবেচনা করতেন চলত অনেক রকমের বিমান-যুদ্ধ। এমন সময় অতিশয় কালে-কস্মিনে ঝানুদের গুরুকুলের কোনও এক ঝাণ্ডু চড়চড় করে চড়াতেন, এপাড়া ও-পাড়ার কুল্লে ঘুড়ির উপরের স্তরে, তার অতি গরিবি চেহারার সাদামাটা ঘুড়িখানা। সেখানে খাওয়াতেন ঘুড়িটাকে একটা গুত্তা বা মুণ্ডা। সমুচা দখিনা আসমান ঝেটিয়ে তাঁর ঘুড়িটা প্যাঁচে জোড়া ডবল ঘুড়ি, সিঙ্গিল ঘুড়ি সব কটার সুতো জড়িয়ে নিয়ে, দোতলার ছাত ছুঁই ছুঁই করে সোঁ সোঁ করে উঠত ফের স্বর্গপানে হাগর দিকে। ওঠার সময় একটা একটা করে কুল্লে ঘুড়ি যেত কেটে যেসব ঘুড়ি আপসে প্যাঁচ খেলছিল তারাও জোড়ায় জোড়ায় হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খেতে খেতে হয়ে যেত হাওয়া। যদুর মনে পড়ে, এটাকে বলত বাদাম প্যাঁচ- নৌকোর বাদাম পালের সঙ্গে হয়তো কোনও মিল আছে।
আজ কোথায় সে গুনিন, যিনি ভিন্ন বাদাম-এর খেল দেখাবেন? আকাশ বাগে তাকিয়ে দেখুন, বেশুমার কত না চিড়িয়া।
.
দিশি ঘুড়ি
আমরা নিকট প্রাচ্যের নিরীহ প্রাণী। আমাদের কারবার ইরান, আফগান, পাক-ভারত নিয়ে। (১) রাজা দাউদ আপন দেশের জনগণের মন কতখানি পেয়েছেন সেটা বাতলাবে কে? দুসরা কু আসছে না কি? ওদিকে বিদ্রোহী পাক-বেলুচ-পাঠান তার দিকে তাকিয়ে অছে। (২) ভুট্টো গেলেন, অগম অভিসারে ইয়াংকি সাগর পারে, লাঠি-সড়কি, রামদা-ঝাটার সন্ধানে, (৩) শাহ যেন পস্তাচ্ছেন, ভাবছেন মার্কিন না রুশ, রুশ না মার্কিন শ্রীরাধিকা চন্দ্রাবলী, কারে রাখি কারে ফেলি। (৪) মেঘমল্লারে সারা দিন-মান, শুনি ঝরনার গান, মাফ করবেন, লারকানা-গান– বেচারি গুরুজি (কলকাতা-গামীদের বলে রাখি, হোথায় শিখ মাত্রকেই সরদারজি না বলে গুরুজি সম্বোধন করলে তাদের মেহেরবানি পাবে বেশি) স্বরণ সিং মি. ভুট্টোর লাগাতার ভারতের শিকায়েৎ-জারি-মসিয়ার গান সুবো-শ্যাম শোনেন আর উত্তর প্রতিবাদ দেমাতি লিখতে লিখতে তার জানটা পানি। বস্তুত আমি ২১/১২/৭১-এর ডিসেম্বরেই গুরুগম্ভীর প্রস্তাব করেছিলুম যে, শুধুমাত্র ভারত নিয়ে মি. ভুট্টোর কটু-কাটব্য তেরি-মেরির উত্তর দেবার তরে দিল্লির ফরেন আপিস যেন একটা আলাদা দফতর খোলে। নইলে বেচারি স্বরণ সিং ফুৎ পাবেন কোথায়, তিনি যে ফরেন মিনিস্টার, কটুকাটব্য, মিথ্যা ভাষণের দেমতি প্রদান ভিন্ন দু একটা গঠনমূলক কাজও তিনি করে থাকেন, সেটা হাতে-নাতে দেখিয়ে দেবার? এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুরু স্বরণ সিং ঢাকায় তিনি এসেছেন কবার তার সম্মানিত ধর্মের একটি মহৎ শিখ-তীর্থও তো এখানে। আমার নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিমত, তিনি তার তীর্থদর্শনে ঢাকায় আরও ঘন ঘন এলে উভয় দেশেরই মঙ্গল হত, ভুল বোঝাবুঝি কমত। পাঠক, তাই কিন্তু ঠাউরাবেন না, জনাব হাকসর চেষ্টার কোনও ত্রুটি করছেন। সম্ভ্রান্ত হাকসর গোষ্ঠীকে দিল্লি-ইলাহাবাদে কে না চেনে–আমার মতো নগণ্য ব্যক্তিও সে পরিবারে মোগলাই বদ্বান্ন ভক্ষণকালে বিস্তর ফারসি, উর্দু কাব্যরস উপভোগ করেছে। মাননীয় সম্পাদক, পাঠকমণ্ডলী যদি অপরাধ না নেন, তবে বলি, আমার মনে হয়, জনাব হাকরের মতো সর্বার্থে ভদ্রলোকের পলিটিকস ত্যাগ করাই ভালো। তা সে যাকগে; ভারত, বাংলাদেশ, গুরুজি, জনাব হাকসরকে রিফর্ম করার ভার আল্লাহতায়ালা আমার স্কন্ধে সমর্পণ করেননি– শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।
