.
ক্যু দে তার দুসরা জুতা
দুসরা বুট দড়াম করে পড়েনি। বিলকুল ঠাহর করতে পারিনি। আবার গোবলেট করে ফেলেছি। ফিনসে শুরু করি।
জার আমলের খানদানি ঘরের ছেলেরা কলেজ, মিলিটারি আকাঁদেমির ছোকরারা শেষ পাস দিয়ে, কিংবা ফেল মারার পর কন্টিনেন্ট যেত আপন শিক্ষা-অশিক্ষার ওপর পালিশের জেল্লাই লাগাতে। আন্দ্রেই প্যাদ্রোভিচ জমিতফ যথারীতি বার্লিন-ভিয়েনা সমাপনান্তে পৌচেছে ফ্লোরেনসে। সেখানে চতুর্দিকে ফুলে ফুলে ছয়লাপ, কিয়ান্তি প্রভৃতি মদ্যাদি বেজায় সস্তা আর ছুঁড়িগুলোর এ্যাসন মাইরি-মাইরি চেহারা যে জানটা ত-র-র তাজা হয়ে যায়। তোমার সঙ্গে পান করবে, নাচবে, কত গোপন গানে গানে বলবে তোমায় কানে কানে, সিন্নোর, আমি তোমায় ভালোবাসি, চিরকাল তোমার হয়েই থাকব কিন্তু মুশকিল, একমাত্র তোমাকেই না, আরও পাঁচজনকে ওই একই দিব্যি দেয়। ওদের বিপদ, ওরা কাউকে কখনও না বলতে শেখেনি– পাড়াতে কারও কারও প্যারা নাম বিশ্ব-তোষক। আমাদের আন্দ্রেইকে পায় কে? প্রতি রাত্রিই বাসররাত্রি–বিনা পাত্রী। এক রাতে তিনটেয় হোটেলে ফিরে দুমদাম করে নেচে নেচে কাপড় ছাড়তে ছাড়তে দ্রাম করে একখানা বুট ছুঁড়ে মেরেছে কাঠের পার্টিশনের উপর। সঙ্গে সঙ্গে পাশের কামরা থেকে হুঙ্কার, হেই জংলি, অত গোলমাল করিস কেন? ঘুমুতে দিবি না? আন্দ্রেই বড় লজ্জা পেল। চুপসে খাটের উপর বসে, বিলকুল আওয়াজ মাত্র না করে দুসরা বুটটি আস্তে আ-স-তে রেখে দিল খাটেরই উপর। তার পর অঘোরে নিদ্রা। ঘন্টা তিনেক পর তার বেঘোর নিদ্রা ভেঙে গেল, পার্টিশনের উপর জোর খটখটানি শুনে। পাশের কামরার লোকটা চেঁচাচ্ছে, ওরে মাতাল, দুসরা বুটটা ছুঁড়ে মারবি কখন? আমি অপেক্ষা করছি যে। তার পর ঘুমুতে যাব।
আমার হয়েছে তাই। এই, মাত্র গেল রোববার দিন, লিখছিলুম, দাউদ যেসব রিফর্ম শুরু করেছেন তাই নিয়ে আমার ডর-ডর করছে। দুসরা বুটটা যে কখন দড়াম করে পড়বে তারই পিতিক্ষেয় ছিলুম। হঠাৎ কাগজে দেখি, ওমা! দুসরা কু দে-তা কবে ইতোমধ্যে চুপসে হয়ে গেছে, আমি টেরটি পর্যন্ত পাইনি। রোববার দিনভর-রাত দুনিয়ার কুল্লে বেতার ম ম করছিল, কাবুলে দ্বিতীয় কু-র বাচ্চাটিকে প্রসবালয় থেকে সরাসরি গোরস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিংবা বলতে পারেন, কাবুলি বউয়ের গর্ভপাত হয়েছে। কাবুল প্রচার করছে, সরদার দাউদকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কিছু ফৌজি অফিসার এবং কিছু সাধারণ নাগরিক চক্রান্ত করার সময় ধরা পড়ে যান। তাঁদের ফৌজি বিচার হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য করার পূর্বে দুসরা বুটের চুটকিলাটিতে ক্ষণতরে ফিরে যাই। গল্পটি আকছারই কাছে আসে। দোস্ত শুধোলেন, কী হে, চাকরিটা পেলে?
দুসরা বুটের তরে অপেক্ষা করছি।
বুঝলে না? চাকরিটা কে পাবে তার ডিসিশন হয়ে গিয়েছে কাল সন্ধ্যায়। এনাউন্সমেন্ট হবে আজ সন্ধ্যায়। দুসরা বুট ছোঁড়া হয়ে গিয়েছে কাল সন্ধ্যায় আমি খবরটা পাব আজ সন্ধ্যায়। এ ধরনের কারবার আমাদের জীবনে নিত্যিকার।
.
খাঁটি ক্যু, না জিঞ্জিরা মার্কা?
এ জীবনে একটা তথাকথিত ক্য-কে আমি যেন অকুস্থলে, যেন বকসিঙের রিংসাইডে বসে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলুম। সে কু সত্য না ডাহা জোছুরি এ নিয়ে এখনও তর্কাতর্কির অবসান হয়নি। ২০ জুন ১৯৩৪-এ হিটলারের হুকুমে কয়েকশো লোককে বিনা বিচারে গুলি করে মারা হয়। এদের মধ্যে সর্বপ্রধান ছিলেন র্যোম। হিটলার যে একদিন জনির নিরঙ্কুশ একনায়কত্ব লাভ করে তার জন্যই এই রোমের আপ্রাণ পরিশ্রমকে ক্রেডিট দিতে হয় চৌদ্দ আনা। হিটলারকে যে দু তিনটি লোক তুমি বলে সম্বোধন করতেন, রোম ছিলেন তাঁদেরই একজন। সেই র্যোম এবং তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সহকর্মী সব ক জনাকেই খতম করা হয় ২০ জুন, হিটলার সর্বনায়কত্ব পাওয়ার ঠিক দেড় বছর পর। অজুহাত হিসেবে হিটলার ওজস্বিনী বক্তৃতা দিয়ে দেশের লোককে জানালেন, এসব পিশাচরা কু দ্বারা তাকে ও নাসি পার্টিকে সমূলে বিনাশ করতে চেয়েছিল; তিনি পূর্বাহেই ষড়যন্ত্রের সন্ধান পেয়ে আপন দায়িত্বে তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।
রোম যে কোনও প্রকারের কু-র ষড়যন্ত্র করেছিলেন, সেটা প্রচুর প্রপাগান্ডা সত্ত্বেও সে সময়ে স-প্রমাণ করা যায়নি; আজ দোষটা চৌদ্দ আনা পড়ে হিটলার, গ্যোরিঙ্গ ও হিমলারের ঘাড়ে।
এটাকে বলা হয় পার্জ– জোলাপ। আকস্মিক আগাপাশতলা পালটে দিয়ে যখন স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাসী একদল ক্ষমতা লাভ করে তখন সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মধ্যে স্বার্থে স্বার্থে লাগে সংঘাত এবং কত যে হীনতা নীচতা তখন দলের ভিতরে-বাইরে বেরিয়ে পড়ে সে বাবদে আমার মতো অগা আর নতুন করে বলবে কী? বিশেষত আমার লেখা পড়েন ক জন প্রাণী! এবং একমাত্র আমার মহামূল্যবান তত্ত্বকথা ছাড়া তারা অন্য কারও লেখা– এস্তেক গোপালভাড় তক– পড়েন না, এ হেন মিথ্যা স্বীকৃত হলে আমি এই লহমায় আমার সাদা কলমটি কালোবাজারে বিক্রি করে দেব।
চক্রান্তে চক্রান্তে যখন দলপতিকে বাধ্য হয়ে এক পক্ষ নিতে হয়, তখন বহু ক্ষেত্রেই অপর পক্ষকে খতম করা ভিন্ন ফুরারের গত্যন্তর থাকে না। এ তত্ত্বকথাটা আমার নয়। যারা শক্তির উপাসনা করেন, তাঁদের অনেকেই এ নীতিতে বিশ্বাসী। সর্ব ফুরারকেই তখন স্বভাবতই বলতে হয়, ওরা দেশের দুশমন, ওদের মতলব ছিল নয়া একটা কু করে দেশের সর্বনাশ করা।…এটা বহু বৎসর ধরে একটা প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে। স্তালিন, মুসসোলিনি সব্বাই এটার এস্তেমাল করেছেন। কেউ বেশি কেউ কম।
