.
কাবুলি কায়দা
কাবুল-বাজার যে গপ-এর চিড়িয়া ছাড়ে সেটা পাকড়ানো সহজ কর্ম না। কারণ, সেটা সরকারের কানে পৌঁছলে তার ডিরেক্টর চিড়িয়া ওড়ানেওলার সন্ধানে চর লাগান। অতএব কাবুলের বাজার-গপ শোনাবার তরে শাস্ত্রাধিকার চাই। মার্কিন তো পাত্তাই পাবে না, আর আজকের দিনের ইংরেজ সাংবাদিক অর্থাভাবে ডকে উঠি উঠি করছেন! রুশ পায় সরকারি সংবাদ, খাস প্যারা দোস্তই আউওয়াল হিসেবে সক্কলের পয়লা। তাই বাজার-গপের হিস্যেও সে খানিকটে পায়। তদুপরি তার আরেকটা দোসরা জরিয়াও আছে। সরদার দাউদের যে একটা গোপন মন্ত্রণাসভা থাকবে, সেটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সে সভার সভ্য, ষোল থেকে আঠাশ, ক জন– সে বাবদে কাবুল বাজারও দাড়ি চুলকোয়, পাগড়ির ন্যাজ নিয়ে দড়ি পাকায়, কিন্তু মুখে রা-টি কাড়ে না। তবে কি না, একটা সত্য কেউ বড়-একটা অস্বীকার করে না। দাউদ কু্যটা যে করতে সক্ষম হয়েছেন, তার পিছনে ছিলেন বেশ একপাল মস্কোতে ফৌজি তালিমপ্রাপ্ত আফগান অফিসার।
তাদের যে ক জন মন্ত্রণাসভায় হক্কত আসন পেয়েছেন, তারা যে আফগানিস্তানকে আখেরে কম্যুনিস্ট রাষ্ট্ররূপে তৈরি হবার জন্য সংস্কার বিধিবিধান প্রবর্তন করতে চাইবেন সেটাও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
.
ছাত্র বনাম মোল্লা
প্রাচ্যের অনুন্নত দেশগুলোতে ছাত্র-সমাজ আজ অশেষ শক্তি ধারণ করে। ছুটিতে তারা যখন শহর থেকে গ্রামে ফিরে যায় তখন সেখানে সর্বত্র চালায় পলিটি। মোল্লাদের মল্লভূমি প্রধানত মসজিদের মক্তবে। তাদের সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবন-দর্শন। দাউদ দেশের কুলে মক্তব এবং যে দু-পাঁচটা বে-সরকারি নিতান্তই জুনিয়র মাদ্রাসা আছে সেগুলো সরকারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দিয়েছেন। কাবুল থেকে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাবিদরা বেরিয়েছেন ক্ষুদ্র। শহর এবং গ্রামাঞ্চলে সেসব মক্তব-মাদ্রাসা পরিদর্শন করতে ও তত্ত্ব-তথ্য সংগ্রহ করতে।
দাউদ যদি সত্যসত্যই তাঁর প্ল্যান পুরোদমে শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে চান, তবে যেসব মোল্লা এখনও তার বিরোধিতা করেননি তারাও যে বিগড়ে যাবেন সে বিষয়ে সন্দেহ করবার কোনও কারণ নেই। তথ্যান্বেষী যেসব শিক্ষাবিদ সফরে বেরিয়েছেন তাঁরা সৃষ্টিছাড়া কোনও নয়া তথ্য আবিষ্কার করবেন কি? মক্তব-মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তক নিসাব তো কাবুল শহরে বসে বসেই জোগাড় করা যায়। সেগুলোতে আছে কী? ফারসি ভাষা শেখার কায়দা-কেতা, কুরান শরীফ পাঠ, শেখ সাদির অতুলনীয় কবিতা এবং নামাজ শুদ্ধরূপে পড়ার জন্য দোওয়াদরুদ। আর মাদ্রাসায় এ সবেরই অপেক্ষাকৃত উন্নত পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক এবং সুকঠিন আরবি শেখবার নিষ্ফল প্রচেষ্টা। ইমাম আবু হানিফা সাহেবের ফিকাহ-অতি সংক্ষিপ্তরূপে পড়ানোর ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু প্রাতঃস্মরণীয় ইমামের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম, পরিপূর্ণ বুদ্ধিসম্মত (রেশনাল) যুক্তিতর্ক বোঝবার মতো শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ পেয়েছেন কজন আফগান মোল্লা-মুদররিস? পড়াবার তো কোনও প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু এই বাহ্য। আসলে শিক্ষাবিদরা তন্ন তন্ন করে খুঁজবেন, ওসব কেতাবে রাষ্ট্রদ্রোহ শেখায় এমন আছে কী সব শিক্ষা, আদেশ, ফতওয়া। এবং হবেন ন সিকে নিরাশ। ইমাম সাহেবের আমল ছিল ইসলামের সুবর্ণ যুগ। সে আমলে কোন ফকিহ বেকার মাথা ঘামিয়েছেন রাষ্ট্রদ্রোহের ফতওয়া নির্মাণ করার তরে।
বস্তুত মোল্লারা যখন কোনও কওমকে কাবুলের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে উত্তেজিত করেন তখন তারা আটঘাট বেঁধে আট গজি ফতওয়া লিখে সেইটে তাদের সামনে উচ্চকণ্ঠে পাঠ করে ফজুল ওয়াক্ত খর্চা করেন না। মক্তব-মাদ্রাসায় এমনিতেই খামোখা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা বিদ্রোহ কোনওটাই শেখান না। লুটতরাজের জন্যই হোক বা অন্য যে কোনও কারণেই হোক, মোল্লারা যখন আফগানকে কাবুলের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন তখন তারা নিতান্ত ফাউস্বরূপ মক্তবের বাচ্চাদের সামনে হয়তো-বা গরম গরম দু একটি ওয়াজ ঝাড়েন। সেগুলো সম্পূর্ণ অরিজিনাল, তাদের আপন মস্তিষ্কপ্রসূত; পাঠ্যপুস্তক বা নিসাবের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই আজকের দিনের শহুরে ভাষায় এগুলো কমপ্লিটলি একস্ট্রা-কারিকুলার।
মোল্লাদের ঘরে বন্দুক-কামান কিছুই নেই। তৎসত্ত্বেও প্রায় দেড়শো বছর ধরে তারা ইংরেজের পুরো-পাক্কা ফৌজকে কয়েকবার খেদিয়ে ঝেটিয়ে পেঁদিয়ে বের করে দিয়েছে আফগানিস্তান থেকে। আমানউল্লাহর মতো একাধিক বাদশাহকেও তারা ঘায়েল করেছে অশিক্ষিত পাঠানকে উস্কে দিয়ে।
সরদার দাউদের পক্ষে আছে ছাত্ররা। কিন্তু দাউদের দেশ বাংলাদেশের মতো নয়। কোথায় সন্দ্বীপ, কোথায় বরিশালের অজ পাড়াগা ওসব জায়গা থেকে ছাত্ররা পড়াশুনা করতে আসে সদরে, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকায়। তারাই একদিন ছড়িয়ে দিয়েছিল আপন আপন গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রামের আহ্বান। ধন্য তারা, জয় হোক তাদের।
কিন্তু সদর দাউদের ছাত্রসমাজ তো এখনও কাবুল, জালালাবাদ ইত্যাদি কয়েকটি নগরের খাঁটি বাসিন্দা। জনপদের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র নেই। সেখানে–
আমাদের মনে শংকা জেগেছে। কারণ আমরা গরিব। গরিব আফগানিস্তানের তরে আমাদের দরদ আছে। সরদার দাউদের সংস্কারপ্রচেষ্টা সফল হোক, এই আমাদের কামনা। কিন্তু এই কি তার পন্থা?…. অবশ্য তিনি যদি রাজ্যের রাজ্যির মোল্লাগণকে তনখা দিয়ে সরকারি শিক্ষকরূপে নিযুক্ত করেন তবে অন্য কথা। কিন্তু তার তরে অত কড়ি কই?
