অসাধারণ মেটারনিষ বিরাট কংগ্রেসে যেরকম আপন ব্যক্তিত্বের ম্যাজিক বাঁশি বাজিয়ে দশটা নেশনকে নাচাতে পারতেন, ঠিক তেমনি বল-রুমে নিজে নাচতে পারতেন অপূর্ব লাস্য-লালিত্যসহ সমস্ত রাত। তার স্মরণে গদগদ কণ্ঠে কিসিংগার বলেছেন, কি কেবিনেটে, কি লেডিজদের অন্তরঙ্গ অভ্যর্থনা কক্ষে সঁলোতে তার চলন-বৈঠন, অনায়াস আচরণ ছিল প্রকৃত রোমান্টিকের মতো। কেবিনেট সঁলোর সম্মেলন করতে পেরেছিলেন তিনিই। অধ্যাপক কিসিংগার আজকের দিনে গুমড়োমুখো পলিটিশিয়ানদের দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবতেন, কত না দূরে অন্তহীন সুদূরে চলে এসেছে এরা, সেই গৌরব এবং মাধুর্যময় যুগ থেকে রাজনীতিকলা আর জীবন-চালনা-কলা দুটোর সমন্বয় করতে জানে না এরা। আজ সবাই বলছে কিসিংগার এ সমন্বয় করতে সম্পূর্ণ সক্ষম হয়েছেন। আবার মেটারনিষের মতোই কিসিংগার বিশ্বাস করেন, রাজনীতি একটা আর্ট কলা-বিশেষ। সে আর্ট জ্ঞানবিজ্ঞানের ওপর নির্মিত হয়েছে অবশ্যই, কিন্তু আদর্শবাদের সঙ্গে তার কানাকড়িরও সম্পর্ক নেই। পৃথিবী দূরে থাক, মানুষের ভিতরও কোনও পরিবর্তন আনার সংকল্প কিসিংগারের পরিকল্পনাতে নেই। তাঁর কাছে ন্যায়-অন্যায় বলেও কিছুই নেই। তিনি চান, উপস্থিত পৃথিবীতে যেসব রাষ্ট্রবল আছে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ দ্বারা এমন একটা সামঞ্জস্যে নিয়ে আসা (সে নিয়ন্ত্রণ করার সময় কোনও আদর্শবাদেরই প্রশ্ন ওঠে না; নিয়ন্ত্রণটা সাধু নেবে, না অসাধু সে নির্বাচনে সম্পূর্ণ সে নিরপেক্ষ) যাতে করে রাষ্ট্রবলগুলো এমনভাবে গ্রুপে গ্রুপে বিভক্ত হয় যে যুদ্ধজনিত অশান্তির সৃষ্টি না হতে পারে।
কে জানে, তবে কিসিংগার কখনও মুখ ফুটে বলেননি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে তিনি হয়তো আখেরি বিশ্বশান্তির প্রতিবন্ধকরূপে ধরে নিয়েছিলেন এবং সেটাকে ইয়েহিয়ার দমনপ্রচেষ্টা বলে তিনি নেকনজরে দেখেছিলেন। ঠিক ওই কারণেই, বিশ্বের ছোট-বড় সব শক্তিকে গ্রুপে গ্রুপে ফেলার জন্য বেলুচ-পাঠানের অটোনমি তিনি পছন্দ করবেন না। তার শখের ভারসাম্যের জন্য তার হাতে মেলা অস্ত্রশস্ত্র আছে।
কিন্তু অস্ত্রশস্ত্রই কি শেষ সত্য?
.
গুজোরব তথা তুলনাত্মক শব্দতত্ত্ব
গুলজারব প্রতিষ্ঠানটির রাজধানী কোথায়? ওই–যা! বেবাক ভুলে গিয়েছিলুম, বিশাধিক বৎসর ধরে দুই বাংলায় পুস্তক পত্র-পত্রিকার আদান-প্রদান প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে দুই বাংলার লেখার ধরন, বিশেষ করে বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ, বাংলাতে একদা সুপ্রচলিত কিন্তু বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক অব্যবহৃত যাবনিক শব্দের পুনর্জীবন লাভ, নতুন নতুন শব্দনির্মাণ ইত্যাদি দুই বাংলায়, স্বভাবতই, এক পথ ধরে চলেনি। যে গুজোরব শব্দ দিয়ে লেখাটি আরম্ভ করেছি সেটা খুব বেশি দিনের পুরনো নয়। গুজোব-এর গুজো আর জনরবের রব–একুনে গুজোরব।… ইংরেজিতেও এ ধরনের বেশকিছু শব্দ ইদানীং তৈরি হয়েছে। মগ শব্দটি এক্কেবারে চ্যাংড়া না হলেও খানদানিত্ব পেতে অর্থাৎ মোলায়েম প্রেমের কবিতায়, ফুল-ডোরে বাঁধা ঝুলনায়, আসন পেতে এখনও তার সময় লাগবে। লন্ডনের কুয়াশায় পথহারা খাস লন্ডনবাসীই ল্যাম্পপোস্টটাকে পুলিশম্যান ভেবে তার কাছে পথের সন্ধান নেয়, খুদ পুলিশম্যান আপন বিট-এ পথ হারিয়ে কারও বাড়ির ঘন্টা বাজিয়ে গৃহস্থকে শুধোয়, সুমুখের রাস্তাটার নাম কী? কোনওদিন যদি বেলা তিনটে থেকে প্রায় সাতটা-আটটা অবধি কুয়াশা না কাটে তবে ষাট হাজারের কাছাকাছি ডেলি-প্যাসেঞ্জার ইয়ার-দোস্তের (যদি বরাতজোরে তাদের বাড়ি খুঁজে পায়) বাড়িতে রাত কাটায়, বেশিরভাগ হোটেলে আশ্রয় নেয়।…. তদুপরি লক্ষ লক্ষ চিমনি থেকে যে ধুয়ো ওঠে সেটা কুয়াশা ফুটো করে উপরের দিকে উধাও হতে পারে না বলে তার সঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি হয় সুগ। ম্যাকের স্ম আর ফগের গ নিয়ে তৈরি হয় অগ। কলকাতায়ও স্মগ হয়, কিন্তু লন্ডনের তুলনায় একদম রদ্দি-পানসে। ঢাকার ভেজাল বে-আইনি বিয়ারের মতো। নির্জলা জল। তা সে যাকগে। কলকাতার সাগকে বলে ধুয়াশা– ধুয়া প্লাস কুয়াশার শা মতান্তরে ধুয়ার ধু প্লাস কুয়াশার আশা। হরেদরে হাটু পানি। এককালে মডার্ন কবিতায় দারুণ চালু ছিল ধূসর কথাটা–জীবনটা ধূসর, প্রেমটা ধূসর, ডাস্টবিনের পচা ইঁদুরটা ধূসর, রিকশায় চীনা গণিকাটা ধূসর, মডার্ন কবিতার বিক্রিটা ধূসর– গয়রহ। এখন ধূসর শব্দটাই ধূসর হয়ে উবে গিয়েছে। এদানির জোর কাটতি ধুয়াশার। মন্ত্রীর চাকরি দেবার ওয়াদাটা ধুয়াশা, মিলির প্রেম-নিবেদনটা ধুয়াশা, তার জিটিংটাও ধুয়াশা, বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টাও ধুয়াশা- কারণ জিঞ্জিরায় তৈরি বিষটা ছিল ভেজালের ধুঁয়াশায় ভর্তি।
.
পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয় গুজোরব
গুজোরব জিনিসটা ধুয়াশা, তা সে মার্কিন টাইম বা নিউজ উইক পত্রিকায় ধোপদুরুস্ত কেতা-মাফিকই বেরুক, কিংবা কাবুলের বাজারে, চা-খানাতে গপ রূপে দুই পাগড়ি পাশাপাশি এসে ফিসফিসিয়েই বেরুক। এই দেখুন না, নিদেন দিন পাঁচ হবে, সম্ভ্রান্ত মার্কিনি একখানা দৈনিক একটা চিড়িয়া উড়িয়ে দিল, ভাইস-প্রেসিডেন্ট অ্যাগনো হপ্তা খানেকের ভিতর নোকরি ইস্তফা দেবেন; তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ–রিশওয়াদ খাওয়ার মোকদ্দমা উঠবে বলে তিনি খবর পেয়েছেন; সঙ্গে সঙ্গেই লেগে গেল ধুন্দুমার। দক্ষিণ আমেরিকার কুইটো বেতার থেকে শুরু করে দুনিয়ার হেন কেন্দ্র নেই যে সেটা নিয়ে লুফোলুফি করছে না। রাত দু টার সময় স্টকহলম (মাফ করবেন, আমি কিসিংগারি কায়দায় ইংরেজের অনুকরণে স্টকহোম লিখতে পারব না!) খুললাম, তাদের ইলেকশনের শেষ ফলাফল জানবার তরে, তারাও গেণ্ডেরি খেলছে ওই অ্যাগনোকে নিয়ে। বৃন্দাবনে গোপীরা একদা যেরকম বলতেন, কানু বিনে গীত নেই! এদিকে খুদ অ্যাগনো চুপ, নিক্সন খামুশ। যেন পাড়াপড়শির ঘুম নেই, বরের খোঁজ নেই।
