নিক্সনের উত্তরে যে টীকাকার রোগীর গোপন কথার পবিত্রতা সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন তিনি খুব সম্ভব আড়াই হাজার বছরের পুরনো সর্ববিশ-সম্মানিত এ শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার দোহাই দেবার কোনও প্রয়োজন অনুভব করেননি। আসল কথা, নিক্সনের দুশমন জনৈক সিনেটরকে ঘায়েল করার জন্য হোয়াইট হাউস কর্তৃক সেই সিনেটরের চিকিৎসকের দফতর থেকে রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের গোপন আলাপচারীর রেকর্ড চুরি করানো হয়– হুবহু যে-কায়দায় ওয়াটারগেট থেকে দলিল-দস্তাবেজ পেশাদারি চোর মারফত চুরি করানো হয়।
নিক্সনের বিবৃতি যিনি তৈরি করে দেন তিনি নিশ্চয়ই আস্ত একটি গর্দভ। উকিল-মক্কেল, স্বামী-স্ত্রীতে কথাবার্তার পবিত্রতা নিয়ে উদাহরণ দেবার কীই-বা ছিল প্রয়োজন? করলেই যে রোগী-বৈদ্যের পবিত্রতর কথোপকথন উদাহরণ আপনার থেকেই এসে যাবে, সেটা এক লহমার তরেও তার মাথায় খেলেনি? তাজ্জব! এবং সেই পবিত্রতা ভঙ্গ করেছেন নিক্সনের আপন খাস কর্মচারীগণ।
.
স্কুল-বয় কিসিংগারের ভাইভা
আমি কিন্তু ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন সংবিধান-লিপির তালাশ করছিলুম। কয়েকদিন ধরে ড. কিসিংগারকে মার্কিন সিনেটের একটা বিশেষ কমিটির সামনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে মার্কিন ফরেন-পলিসি নিয়ে হরেক রকম প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। যেন ভাইভা পরীক্ষা। ইতোমধ্যে এক মার্কিন বেতারকেন্দ্র বললে, দু জন মেম্বর নাকি বলেছেন, তাঁরা কিসিংগারকে ফরেন মিনিস্টারের নোকরিটা দিতে চান না। ব্যাপারটা তবে কী? আমরা তো জানতুম, গণতন্ত্র-শাসিত রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বা সক্রিয় প্রেসিডেন্ট তার পছন্দসই মন্ত্রী নিয়োগ করেন, খুশিমতো ডিসমিস করেন গণ-পরিষদ, এমনকি আপন মন্ত্রীমণ্ডলী-কেবিনেটের কোনও তোয়াক্কা না করে। তাই ধরে নিচ্ছি, প্রাগুক্ত কমিটি যদি কিসিংগারকে গোল্লা দিয়ে না পাস করে দেন, তবে নিক্সন ভেটো মেরে না-পাসিটা বাতিল করে দিতে পারেন। কিংবা এটাও সম্ভব যে, কিসিংগার যেহেতু জাত-মার্কিন (এমেরিকান সিটিজেন বাই বার্থ) নন, ষোল বছর বয়সে স্টেটসে এসে ডমিসাইল্ড নাগরিকত্ব পান, তাই সুদ্ধমাত্র এ ধরনের উমেদারকেই হয়তো তাদের নির্ভেজাল মার্কিনত্ব প্রমাণ করতে হয়। শুনেছি, জাত-ইতালিয়ান ভিন্ন অন্য কেউ হোলি পোপ হতে পারেন না, তথা ভিন্ন-ধর্ম থেকে দীক্ষিত খ্রিস্টান পাদ্রি সমাজে বিশেষ একটা পদের (যেমন বিশপের) উপরে যেতে পারেন না। আমার এ-খবর যদি ভুল হয়, ক্যাথলিক সমাজ দয়া করে অপরাধ নেবেন না। তা সে যাই হোক, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নির্বাচিত দেশের মুরুব্বিস্থানীয় ফরেন মিনিস্টার একটা স্কুল-বয়ের মতো ভাইভা দিচ্ছেন– এ তসবিরটা আমার কাছে কেমন যেন খাপছাড়া বদখৎ মনে হয়।
.
তাজহীন আগ্রা?
এরই সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটা খবর আমাকে আরও বেকুব বানিয়ে দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মি. ভুট্টো স্টেটসে মি. নিক্সনের সঙ্গে দু বার দেখা করবেন, উনোতে বক্তৃতা দেবেন, ন্যাশনাল প্রেসক্লাবেও তাই– এবং অবশ্যই সেখানে নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর দেবেন, এমনকি নিক্সনের বিরুদ্ধবাদী নেতাগণ যথা হামফ্রি, ফুস্প্রাইট এবং কেনেডির সঙ্গে মোলাকাত করবেন।
সিনেটের ফরেন রিলেশন কমিটির মেম্বর এদের দু জন। কিন্তু হবু ফরেন মিনিস্টার, কার্যত সে পদে বহাল- ড. কিসিংগারের নাম কই? মি. ভুট্টো নিশ্চয়ই তাঁর ন মাস ধরে কপচানো বুলি ভুলে গিয়ে ওয়াটারগেটের মতো ঘরোয়া ব্যাপার নিয়ে নিক্সনের সঙ্গে দু দিন ধরে রসালাপ করবেন না। এস্তেক সিনেটের ফরেন কমিটির সঙ্গে দেখা করবেন, কিন্তু খুদে ফরেন মিনিস্টার কিসিংগারের সঙ্গে দেখা করবেন বলে কোনও উল্লেখ নেই, এটা কী করে সম্ভবপর হয়? ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইয়েহিয়াকে মদত দেবার জন্য প্রতিদিন জরুরি মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেছেন যে কিসিংগার! চীনে যে লোমহর্ষক মুলাকাত হল মাও এবং নিক্সনে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান আলোচনার সময় আর দু জন মাত্র লোক চীনের প্রধানমন্ত্রী চু এবং কিসিংগার। মার্কিন ফরেন মিনিস্টার রজার্স নিতান্তই বাহাররূপে দলের সঙ্গে ছিলেন বটে কিন্তু সে সভায় তাঁকে ডাকা হয়নি। মাও যখন নিক্সনকে তার আপন বাড়িতে দাওয়াত করলেন তখন দাওয়াত পেলেন কিসিংগার কোথায় রজার্স? চীনের প্রাচীর দেখবার জন্য নিক্সন গেলেন সদলবলে; পিকিং-এ রয়ে গেলেন কিসিংগার, চুর সঙ্গে ফাইনাল কথাবার্তায় (হয়তো গোপন চুক্তির!) রূপ-রেখা দেবার জন্য! চু বলেছেন, ওই একটা লোক যার সঙ্গে তর্কাতর্কি করা যায়। সর্বপ্রথম মোলাকাতের সময় পাছে কোনও ফজুল প্রটোকলবশত কিসিংগার উপস্থিত না থাকেন, তাই মাও আগে-ভাগেই নিক্সনকে জানিয়ে রেখেছিলেন কিসিংগার অতি অবশ্যই যেন সে মোলাকাতে হাজির থাকেন। বিশ্বজন সে সময়েই একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছে, চীন-মার্কিন আঁতাতের একমাত্র ঘটক শ্রীযুক্ত কিসিংগার। অনেকেরই বিশ্বাস, তার সম্মতি ছাড়া নিক্সন নিশ্চয়ই ভুট্টোকে গদিতে বসাতেন না। এবং একটা তেতো হক বাৎ যদি মেনে নেওয়া হয় যে, ইয়েহিয়াকে ব্যাক করে নিক্সন মার খাননি, কিল হজম করেছেন কিসিংগার, তবে এটাও খুবই স্বাভাবিক যে, কিসিংগার পুরো মদত দেবেন মি. ভুট্টোকে, সে পরাজয়ের কালিমা যতখানি পারেন তাঁকে দিয়ে মোছাবার জন্য। একটু শঙ্কাও যে নেই, বলবে কে?– ইহুদিসন্তান কিসিংগার দাদ নেবার তালে থাকবে না, এ ভরসাই-বা দেবে কে?…. সেই কিসিংগারের নাম নেই, ভুট্টো যাদের দর্শন করতে যাচ্ছেন ওয়াশিংটনে, তার ফিরিস্তিতে তার চেয়ে পাঠক বললেই পারেন, আগ্রা যাব নামজাদা সব এমারত দেখতে–ফিরিস্তিতে? দেখি, তাজমহলের নাম নেই। হল না। বরঞ্চ বলি, সর্ব ফিল বাবদে জউরি গুণীন ঘটি বললে, চললুম ঢাকা, দেখব সরেস সরেস ফিল। তার নোটবুকে তাকিয়ে দেখি, চিত্তহারিণী তারকা কবরী দেবী যেসব ফিল্ম ধন্য করেছেন তার একটারও নাম নেই বেকুবের ফিরিস্তিতে!… ভুট্টো-কিসিংগারে দেখা হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু তার উল্লেখ নেই, কেন? তবে কি কিসিংগারের এখন কোনও ধরনের রাজনৈতিক ইদ্দত পিরিয়ড যাচ্ছে?
