.
আকস্মিক না প্ল্যান-মাফিক
এইবার কিসিংগার নেমেছেন মল্লভূমিতে। তার অন্তরঙ্গ সখা পররাষ্ট্র সচিব রজার্স, যার সাহায্য তিনি নিয়েছেন রাজনীতিতে ছায়ারূপে পদার্পণ-কালে, অকৃপণভাবে, তাকে সরিয়ে তিনি সম্পূর্ণ আত্মপ্রকাশ করেছেন প্রখর দিবালোকে। ভিয়েনা কংগ্রেসের শক্তিসাম্য নির্মাণকালে তার মানস-গুরু মেটারনিষও ছিলেন প্রচণ্ড শক্তিমান অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রণাঙ্গনে নেমে কিসিংগার কোন ইন্দ্রিয়াতীত শঙ্খধ্বনি বাজিয়েছেন, জানিনে, কোন অদৃশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন বুঝিনি কিন্তু ফলস্বরূপ এ ক দিনে কী কী ঘটল লক্ষ করুন। সব কটাই কিসিংগার-নীতি অনুযায়ী।
১। ইজরায়েল অকস্মাৎ আক্রমণ দ্বারা সিরিয়ার বিমানবাহিনীর এক বৃহৎ অংশ পঙ্গু করেছে পরশুদিন। সিরিয়া রীতিমতো ধরাশায়ী।
২। জনাব আজিজ আহমদ অকুণ্ঠ তর্কাতীত ভাষায় বলেছেন, সর্বশেষ যুদ্ধবন্দিকে পাকিস্তানে পাঠাও। তাদের বিরুদ্ধে কোনও মোকদ্দমা চালাতে পারবে না। ইউনাইটেড নেশনে ঢোকার প্রস্তাব তার পর। চীন আছে সেখানে পুরো মদত দিতে– আমাকে। কোথায় গেল উভয়পক্ষের সমাসনে বসে আলোচনা-সমঝোতাটা? এই সুর-পরিবর্তন বিশ্বরাজনীতিতে ভয়ঙ্কর কিছু নয়, কিন্তু বাংলাদেশ এবং পরোক্ষভাবে আফগানিস্তানের পক্ষে জব্বর গুরুত্ব ধরে।
৩। সদর দাউদ মার্কিনের চেলা না হয়েও কিসিংগারের অদৃশ্য ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছেন। তাড়াতাড়ি পাঠিয়েছেন আগা মুহম্মদ নঈমকে কমরেড ব্রেজনেভের কাছে। বৃত্তান্ত কিছুই জানা যায়নি। দাউদ যে আজিজের কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন লক্ষ করেছেন তাই নয়, কিসিংগার যে পাকিস্তানকে সাহায্য করবেন (দাউদ জানেন, সে সাহায্য গোপনে সেরা সেরা অস্ত্রশস্ত্রের রূপ নেবে) সেটা কিসিংগার সিনেটের সামনে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন। নিক্সনাদির দৃঢ় বিশ্বাস রুশের সাহায্য নিয়ে দাউদ ক্যু, সমাপন করেছেন, ব্রিটিশ বলে অসম্ভব নয়, তবে রুশ যে আগের থেকেই কু-র খবর জানত সেটা সন্দেহাতীত।
৪। সবচেয়ে মারাত্মক চিলি রাষ্ট্রের কু্য। নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, চিলির ক্যু-র আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনাটির খবর জানত। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিনেটের সামনে এই সাক্ষ্যই দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ঝটপট তার দেমাতি (প্রতিবাদ) প্রকাশ করেছেন ও মৃতের স্মরণে সরকারি ব্লটিং পেপার দিয়ে আড়াই ফোঁটা কুম্ভীরাশ্রু শুষিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্বয়ংক্রিয় গোপন টেপ-রেকর্ডের জন্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে থাকলে সে টেপ মহাফিজখানায় সযত্নে রাখা হয়েছে কি না, সুপ্রিম কোর্ট গোঁ ধরে সেটা চেয়ে বসলে সদর নিক্সন সেটা দেবেন কি না, তা এখনও প্রকাশ পায়নি।
এতগুলো দিগ্বিজয় কি দৈবযোগে, গ্রহ-নক্ষত্রের কেরামতিতে ঘটল? এর সঙ্গে বিজড়িত আছে আরও তিনটি ঘটনা। (১) যে আদালতে ওয়াটার-গেট কমিটির পক্ষ থেকে নিক্সনের ওপর হুকুমজারি চাইছে, তিনি যেন তদন্ত সম্পর্কিত টেপগুলো কমিটিকে দিয়ে দেন, সে আদালত সরাসরি রায় না দিয়ে একটি সুলেহ প্রস্তাব করেছেন। অনেকে মনে করেন, নিক্সন-বৈরী ভাব যেভাবে দ্রুত কমে যাচ্ছে তাতে করে আদালত দেশের বিরাটতর স্বার্থের খাতিরে এটা করেছেন। কিন্তু নিক্সন গরম। পূর্বেই একাধিকবার শুধিয়েছি, কী কেরামতির বদৌলত এসব ঘটছে? এখন শুধধাই হুজুরের আকস্মিক এ গরমাইয়ের অর্থটা কী? তিনি আদালতকে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু এতে করে আমার প্রশাসনিক স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধিকার-খুদ-মুখতারি–ক্ষুণ্ণ হবে না তো? অর্থাৎ ভবিষ্যতে ফের অন্য কিছু চেয়ে বসলে আমাকে বিনা ওজর-আপত্যে সুড় সুড় করে কুল্লে চিজ ঢেলে দিতে হবে না তো? আদালত সঙ্গে সঙ্গে অভয় দিয়ে বলেছেন, আরে না, না, না। এসব প্রশ্ন, হঠাৎ এই মধুর মধুর মোলায়েমিটা আদালতের খাসলতে এল কোত্থেকে। আদালতের এহেন গুঞ্জাইশ প্রচেষ্টা যে বড়ই অভিনব ঠেকছে। আমরাও সুলেহ চাই, কিন্তু এতখানি আক্ৰা দরে।
(২) আরভিন তদন্ত কমিটি নিয়েছিলেন দুটি– ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত। হঠাৎ খবর এল, আরভিন মেম্বারদের জানিয়েছেন, ছুটি বাতিল, কমিটি বসবে ২৪ সেপ্টেম্বর। কেন? অনেকেই বলছেন, যেভাবে ঝড়ের বেগে হাওয়া পাল্টাচ্ছে, তার থেকে অনুমান করা সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়, যে মোতাবেক ১৫ অক্টোবরতক আরভিন কমিটি ছুটি উপভোগ করে ওইদিন কমিটি ঘরে এলে হয়তো দেখবেন দরওয়াজা বন্ধ,পাইক-বরকন্দাজ হাওয়া, আসামি-ফরিয়াদি গায়েব।
(৩) অবস্থার অধঃপতন দেখে স্বয়ং কেনেডি আসরে নেমেছেন।
মানতেই হবে, বাবাজীবন কিসিংগারের পেটে এন্তের এলেম গিজগিজ করছে।
কী ভয় দেখালেন তিনি? তার সারাংশ এইমাত্র শুনলুম, বেতারে। অবশ্য তিনি জিভ কেটে বলবেন, তওবা তওবা। খাকসার ইহুদির পোলা দেখাবে ভয়– মহাপরাক্রান্ত আরভিন কমিটি, কংগ্রেস সিনেটকে! তওবা, তওবা!… অতএব বারান্তরে।
.
প্রেমালাপ বনাম বৈদ্য-বিমান
পাড়া-পড়শি কারও কাছ থেকে একখণ্ড মার্কিন সংবিধান লিপি জোগাড় করতে পারব এমনতরো বাতুলাশা আমরা করি না। আর, জোগাড় হলে লাভটাই-বা কী? ওয়াটারগেটের টেপরেকর্ড প্রেসিডেন্ট নিক্সন আদালতের হাতে সমর্পণ করতে বাধ্য কি না, সংবিধান অ সমস্যায় কী নির্দেশ দেয়, এই নিয়েই তো যত মাথা ফাটাফাটি। তদন্ত কমিটি বলছেন, দিতে বাধ্য। নিক্সন বলছেন, না। তুলনামূলক যুক্তি দিয়ে বলছেন, প্রেসিডেন্ট তার ব্যক্তিগত কর্মচারীদের সঙ্গে যে সলা-পরামর্শ করেন সেগুলো পূতপবিত্র মুকস। যেমন মক্কেল এবং উকিলে যেসব অন্তরঙ্গ আলোচনা হয়, স্বামী-স্ত্রীতে নিভৃতে যে গুফতো-গো হয় সেগুলো পবিত্র। অর্থাৎ কোনও আদালতই সেগুলো মোক্ষম হুকুম দ্বারা সংগ্রহ করতে পারেন না, জজ এগুলো একা একা গোপনে পড়তেও পারেন না, প্রকাশ্য আদালতে সর্বজনসমক্ষে ফাঁস করে দেওয়ার তো কথাই ওঠে না। জনৈক টীকাকার উত্তরে বলেন, যে-দুটো উদাহরণ নিক্সন পেশ করলেন সে-দুটো যদি আইনত মেনে নেওয়া হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি উদাহরণ অতি অবশ্যই মানতে হবে, এবং ঘড়িয়াল নিক্সন সে উদাহরণটা চেপে গেলেন কেন?– ডাক্তারে রোগীতে যে গোপন আলাপ হয় সেটাও সেক্রেড। প্লাতোর চেয়ে বয়সে বড়, ইউরোপে যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের জনকরূপে পরিচিত সেই গ্রিক বৈদ্যরাজ হিপপোক্রাতেস তাঁর শিষ্যদের দিয়ে শপথ করিয়ে নিতেন আমি যা কিছু সর্বাপেক্ষা পূত-পবিত্র (সেক্রেড) বলে স্বীকার করি, তাদের নামে শ্রদ্ধাভক্তিসহ (সলেমলি) শপথ করছি, আমি চিকিৎসাকর্ম নিষ্ঠাসহ সমাপন করব, ইত্যাদি ইত্যাদি… এস্থলে একের পর এক ভিন্ন ভিন্ন কর্তব্য সম্বন্ধে শপথ নেওয়ার পর সর্বশেষে শপথ করতে হত– রোগী এবং তার সংশ্লিষ্ট জন সম্বন্ধে আমি যা-কিছু দেখতে পাব, শুনতে পাব, যেগুলো সম্বন্ধে কোনও কিছু বলা অনুচিত সেগুলো আমি অলঙ্ঘ্য গোপনরূপে রক্ষা করব (ইনভায়োলেবলি সিক্রেট)। ত্রিশ-চল্লিশ বৎসর পূর্বে আমাদের উপমহাদেশেও ডাক্তারদের সনদ নেওয়ার সময় এই কসম নিতে হত। এখনও কোনও কোনও বৃদ্ধ চিকিৎসকের চেম্বারে এই শপথলিপি ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায় দেখা যায়। আজকের দিনে… যাক, অপ্রিয় কথা।
