.
বাংলাদেশ পাকিস্তান
…গুলি খান– খান খান
পাঠক অধৈর্য হবেন না। কারণ এ ছাড়া অন্য গতি নেই। কে বিশ্বাস করবে বলুন, সুদূর মার্কিন মুল্লুকের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সঙ্গে এই গরিব বেচারি বাংলাদেশের–বাংলাদেশ কেন, কুল্পে বিশ্বের বরাৎ বিজড়িত। বাৎ শব্দটি ইচ্ছে করেই বললুম। কারণ শবেবরাতের রাত্রেই বেতারে শুনতে পেলুম, (পরের দিন খবরের কাগজ ছুটিতে ছিলেন বলে সে খবর পাকাপাকিভাবে জানতে পারলুম না, পাঠক আমার তরে আধেক ইঞ্চি মার্জিন বা গুঞ্জাইশ রাখবেন) যে-হের ডক্টর কিসিংগার তার মিত্র, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রজার্সকে ঠেলা মেরে সরিয়ে, আপন ছায়ারূপ পরিত্যাগ করে কায়ারূপ ধারণ করতে যাচ্ছেন, অর্থাৎ তার গদিতে বসবেন, তিনি সিনেট সদস্যদের এক প্রশ্নের উত্তরে বললেন, নাটকীয় তেমন কিছু একটা পরিবর্তন ঘটেনি, তবে গত ছ মাস ধরে ভারত এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উন্নতি লাভ করছে। কাষ্ঠসিক ফোড়ন দেবে, ওয়ার্স থেকে ব্যাড-এ এসেছে, নিকৃষ্টতর থেকে নিকৃষ্টে পৌঁছেছে। এর পরমুহূর্তেই বলবেন, কিন্তু পাকিস্তানের বড় বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, তাকে সাহায্য করতে হবে। আহা, বাছা রে, পুব-পাককে পেঁদিয়ে পেঁদিয়ে তোমার হাতে বড় ব্যথা ধরেছে। এসো, যাদু, একটা গোল্ড ইনজেকশন দিই। পরে, চাই কি, এক খালুই এটম-আণ্ডা পাঠিয়ে দেবখন।
স্মরণে আসছে না, বলেছি কি না, কিসিংগার-নিক্সন গলাডা কাড্যা ফালা-ই-লেও মি. ভুট্টোকে ফৌজি জুন্তার ফি নারি পড়তে দেবেন না। হ্যাঁ, জুন্তার খুঁটি এ-দিক ও-দিক সরাও, দু-চারটেকে রাজসিক পেনশন দাও– কিন্তু হাঁক দিলে যেন পুকুরের ওপার থেকে লাঠি হাতে তড়িঘড়ি অকুস্থলে হাজির হয়। আর ওই বস্তাপচা সিস্টেমে জুতার বেশি লোককে ইলচির পাগড়ি পরিয়ে ভিনদেশ পাঠিয়ো না। কে জানে, কবে লেগে যাবে ভারত, আফগান, রুশ-চীন কার সঙ্গে। এস্তেক বেলুচ পাঠানকে ঠ্যাঙ্গাবার তরে টিক্কা খানের তো কুইনটুপ্লেট ভাই নেই! জুন্তা ভাঙলে ওদের ঠেকাবে কে?
হঠাৎ কিসিংগার এ-হিম্মৎ জোগাড় করলেন কোথা থেকে? এ্যাদ্দিন তো প্রভু-ভৃত্য অথবা ভৃত্যের বেশে প্রভু–দু জনাই তো গোরস্তানি খামুশি এখতেয়ার করেছিলেন। ঝপাঝপ স্টেটমেন্ট, দেমাতি, এস্তেক প্রেস-কনফারেন্স দিতে শুরু করেছেন হুজুর, আর ইয়ার বুক ফুলিয়ে সিনেটের সামনে বলছেন, পাকিস্তানকে মদত দিয়েছিলুম– বেশ করেছিলুম। ফের দেব। ছুঁচো জ্যাক এন্ডারসনকো মারো গুলি– সেটা বলেছেন মনে মনে। আর স্বয়ং নিন ওয়াটারগেট তদন্তের চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান, সিনেটরদের খেতাব দিয়েছেন, কিচিরমিচির করনেওলা সব কথাতেই না-মনজুর! না-মনজুর! চিল্লি মারার নবাব সায়েবের পাল–ইংরেজিতে ন্যাটারিং নবাবস অব নিগেটিভজম। কবি নিক্সনের তা হলে এই ন অক্ষরের অনুপ্রাসের প্রতি বিলক্ষণ দিল-চসপি আছে। আমার বাংলা তর্জমাটা বড় কুশাদা হয়ে গেল, কিন্তু পাঠক লক্ষ করবেন, মুল ইংরেজিতে নবাব শব্দটি আছে। সায়েবি উচ্চারণ নইবব। নিক্সন এখানেই ক্ষান্ত দেননি। স্বয়ং কটুবাক্যের জহবাজ নইবব নিক্সন মেহমান জাপানি প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পান করার সময় বলেছেন, ওরা সব সামলাক তাদের গম-পেরেশানি, ফালতো হাবি-জাবির আক্রোশ–ভাবখানা এই, আমি এগিয়ে যাব ড্যাং ড্যাং করে। ইংরেজ সচরাচর এ ধরনের বিদেশীয় বড়ফাট্টাইয়ে ভর্তি বগল-বাজানোর ওপর নজর দেয় না। কিন্তু এস্থলে তাদেরই এক পয়লা নম্বরি সম্পাদক বলেছেন, উঁহু! এবার থেকে হুজুরকেই ওই গম-পেরেশানি দিয়ে নিত্যি নিত্যি লাঞ্চ ডিনার খেতে হবে। হয়তো হবে, কিন্তু আমার মনে হয়, হাওয়া যেন হঠাৎ করে উল্টো দিকে ভর করেছে।
.
রতি-বল-বর্ধক কিসিংগারি সালসা
মেটারনিষ নীতিতে শক্তির ভারসাম্যে কিসিংগারের অচল বিশ্বাস। কিন্তু এই নীতিটা হালফিল কাজে খাটাতে হবে অন্য পন্থায়। মার্কিনের হাতে আছে এটম বোমের ডাণ্ডা। সেই ডাণ্ডার ভয় দেখিয়ে দুনিয়ার কুল্লে রাষ্ট্রকে বলে দেব, কে কতখানি শক্তিবান হবার অনুমতি পেল। এইটেই ছিল ড. কিসিংগার-থিসিসের মূল বক্তব্য। বইখানা পড়ে নিক্সন তদ্দশ্যেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। ক্ষমতা লাভের পর নিক্সন ডেকে পাঠালেন কিসিংগারকে ওই শক্তির ভারসাম্য কাজে লাগাতে। এখানে দুটি তথ্য বলে নেওয়া ভালো। কিসিংগারের মতে, শক্তির ভারসাম্য তো বটেই, কিন্তু সেটা এখন আসবে এটম বোমের ভীতির ভারসাম্য রূপে, কিন্তু নিজেকে থাকতে হবে শক্তিমান। এবং তার আপন মাতৃভাষা জর্মনে কিসিংগার ঝেড়েছেন একটি লাখ কথার এক কথা : মাখট ইসট ডের গোসটে আফ্রডিসিয়াকুম–অর্থাৎ পলিটিকাল শক্তিই (মাখট ইংরেজি মাইট) সর্বোকৃষ্ট আফ্রডিসিয়াক– যে ওষুধ রতিশক্তি বাড়িয়ে দেয়, পঞ্জিকার যে সব মলম-বড়ির চটকদার বিজ্ঞাপন অন্ধেরও চোখ এড়াতে পারে না, তার ভদ্র নাম আফ্রডিসিয়াক। দ্বিতীয় তথ্য–দুশমন পরাজিত হলেও মজলুমের ওপর তার প্রভাব রেখে যায়– এটা পূর্বেই বলেছি। শক্তির উপাসক হিটলার দেখিয়েছেন, শক্তিতে ভাটার টান লাগার সম্ভাবনা দেখলেই শক্তির ভড়ং দেখাবে মাসল ফুলিয়ে, উরু থাবড়ে। এটা তো ভালো করে রপ্ত করেছেনই কিসিংগার, তদুপরি হিটলারের গুরু শক্তির মূর্তিমান প্রতীক বিসমার্ক (ইনি মেটারনিষের সদুপদেশ নিতেন আখছারই) সম্বন্ধে দীর্ঘ প্রামাণিক প্রবন্ধ লিখে তাঁরই পন্থায় শক্তি সাধনায় নিজেকে বহু পূর্বে চালিত করেছেন।
