ইনি হতে চলেছেন, কিংবা ইতোমধ্যে হয়ে গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এবারে লাগবে ভানুমতির খেল অবশ্য ওয়াটারগেট-ফাঁড়াটা কাটাতে পারলে। পাঠক সেদিকে নজর রাখবেন। নইলে আমি এতখানি লিখতে যাব কেন, অথচ তার পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন সম্বন্ধে এখনও কিছু বলা হয়নি। হবে। ধীরে রজনী, ধীরে।
.
সাধু সাবধান!
প্রথম লেখাতেই যদি লেখক লম্বা-চৌড়া আত্মপরিচয় দিতে আরম্ভ করেন, তবে পাঠকমাত্রই বিরক্ত হয়। সে-পরিচয় দিতে হয় ধীরে ধীরে, টাপেটোপে, মোকামাফিক। এই বেলা তারই একটি ক্ষুদ্র অংশ নিতান্তই বাধ্য হয়ে দিতে হচ্ছে।
অস্বীকার করব না, একদা টুকলি করেই হোক, এগজামিনারকে প্রলোভন দেখিয়েই হোক, দু একটা আজেবাজে পরীক্ষা পাস করেছিলুম। তার পর মাঝে-মধ্যে দু একখানা বই, পত্র-পত্রিকাও পড়েছি। কিন্তু স্বরাজ পাওয়ার বছর দশেক পর থেকে দেখতে পেলুম, কি ভারত, কি (মরহুম) পূর্ব-পাক সরকার উঠেপড়ে লেগে গেছেন, অশিক্ষিতকে শিক্ষিত করতে এবং যেটা আপনাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, শিক্ষিতকে অশিক্ষিত করতে। খবর এল, সরকার হার্ড-কারেসি বাঁচাতে চান। ইংরেজ আমলে এবং স্বাধীনতার গোড়ার দিকে থ্যাকার দাশগুপ্ত কোম্পানিকে নেটিভ-টাকা মেড়ে দিলেই তারা ইংরেজি, ফরাসি, জর্মন যে-ভাষার যে-বই চান, আনিয়ে দিত। এখন আর সেটি চলবে না। সরকার বাছাই বাছাই কোম্পানিকে বিদেশি মুদ্রার কোটা দেবেন। আপনি কী বই চান, তাদের জানাবেন। তারা ব্যবস্থা করবেন। সরল পাঠক, উল্লাসে নৃত্য জুড়েছেন তো আমারও চিত্ত জুড়ালো! উল্লাসভরে বইয়ের অর্ডার দিই। নো রিপ্লাই। কেন? খবর নিয়ে জানলুম, পুস্তক বিক্রেতারা যে কোটা পান তাই দিয়ে জাহাজ জাহাজ টিকটিকি নভেল আর খাবসুরৎ সেকসের বই আনান ৪০ থেকে ৬০ পার্সেন্ট কমিশন! আর আমি চেয়েছি, হের ডক্টর কিসিংগারের জর্মন ভাষায় লেখা কেতাব,- এটম বমের ভয় দেখিয়ে কী প্রকারে বিশ্বশান্তি স্থাপন করা যায়, মোটামুটি কেতাবের নাম ওই। সে-বই একখানা আনালে পুস্তকবিক্রেতা কোনও কমিশনই পাবেন না, কিংবা পাঁচ পার্সেন্ট! আমার এক ক্যাপিটালিস্টি পয়সাদার কষ্যনিস্টি ইয়ার অনেক ঝুলোকুলি করার পর পুস্তকবিক্রেতা, সত্য সত্যই মোটা কমিশনের লোভ কাটিয়ে তাঁকে বললেন, আমি যদি একই কেতাবের– আবার বলছি একই কেতাব, পাঁচখানা ভিন্ন ভিন্ন বই নয়– একই কেতাবের পাঁচ কপি এক অর্ডারেই কিনি, তবে তারা বিষয়টি মেহেরবানিসহ বিবেচনা করে দেখবেন। শুনুন পাঠক, একই বইয়ের পাঁচ কপি! আচ্ছা বলুন তো, খুদ দ্রৌপদীকে যদি একই রঙ-চঙের, হুবহু একই ধরনের, পাঁচখানা কার্বন-কপির মতো পাঁচটা স্বামী দেওয়া হত তা হলে তিনি কি চা-পানা মুখ করে পাঁচ দফে কবুল পড়তেন?… এবং ভুলবেন না, তাঁকে রোক্কা টাকা ঢালতে হয়নি। তা সে যাক গে। কিন্তু এস্থলে বলে রাখি, আমি সরকারের সমালোচনা কস্মিনকালেও করিনে। বরঞ্চ না খেয়ে মরব, তবু হাঙ্গার-স্ট্রাইক করতে আমি রাজি নই। সরকার বইয়ের বদলে গোবর কিনে যদি দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে নিরন্নকে অন্ন দিতে পারেন, তবে আপত্তি করার মতো অত বড় পাষণ্ড আমি নই। আর ব্যক্তিগতভাবে আমার কীই-বা লাভ-লোকন? আমি ছিলুম অশিক্ষিত, থাকব অশিক্ষিত। পূর্বোক্ত জর্মন বই পেলে আমি কি রাতারাতি শহীদুল্লাহ হয়ে যেতুম? লাইব্রেরির চাপরাসি দিন-র হাজার হাজার বইয়ের মধ্যিখানে বাস করে শেষটায় কি শিক্ষামন্ত্রীর পদে প্রমোশন পায়? তবে প্রসঙ্গটা তুললুম কেন? বলেই ফেলি। আজ আবার শব-ই-বরাৎ! মাঝে মাঝে এই-বই সে-বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে সরল পাঠককে তাক লাগাবার কুমতলব আমার হয়। তখন যেন আমার কথা বিশ্বাস করে ফাঁদে পা দেবেন না।
.
শক্তির ভারসাম্য
হের ডক্টর ফিল হাইনরিষ কিসিংগারের চিত্তজগতের শুরু প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, তঙ্কালীন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ফরেন মিনিস্টার (১৮০৯-১৮২১) ক্লেমেনসে মেটারনিষ। নেপোলিয়নের পতনের পর লণ্ডভণ্ড ইয়োররাপে যখন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সুবো-শ্যাম কামড়াকামড়ি চলছে, তখন মেটারনিষ প্রধান রাষ্ট্রগুলোকে ভিয়েনাতে নিমন্ত্রণ করে একত্র করতে সক্ষম হন। শুধু তাই নয়, তারই যুক্তিতর্ক অসাধারণ মেলামেশা করার ক্ষমতা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমা-নির্ধারণ করতে সমর্থ হয়। আজকের দিনে যারা ইউনাইটেড নেশনসের কার্যকলাপ চোখ মেলে দেখেন তারা এ কর্মটি সম্পূর্ণ অবিশাস্য বলে মনে করবেন। মেটারনিষ ভাগ-বাটোয়ারা করার সময় যে নীতি অবলম্বন করেন সেটা আজও মেটারনিষ সিসটেম নামে প্রখ্যাত। এ নীতির মূলে ছিল ভারসাম্য। অর্থাৎ ইউরোপকে এমনভাবে বিভক্ত করতে হবে, যাতে করে কোনও রাষ্ট্রই যেন বড় বেশি বলবান না হতে পারে, এবং শেষটায় গুণ্ডার মতো দুবলা রাষ্ট্রের কানপাকড়ে আপন স্বার্থ গুছিয়ে না নিতে পারে। অপকর্মের ভিতর ওই ভিয়েনা কংগ্রেসে সিংহলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই পাঠক, ঠিক ধরেছ–ইংরেজই সক্কলের পয়লা কংগ্রেসের পরবর্তী অধিবেশনের ডাঙ্গা ত্যাগ করে আপন চর-এ ঘাপটি মেরে বসে রইল। নীতিটার কিস্যুৎ কিন্তু ইংরেজই মালুম করতে পেরেছিল সবচেয়ে বেশি। এসব দলাদলির একশো বছর পরও প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন ইউরোপের ভারসাম্য রাখবার জন্য হিটলারকে খাইয়ে-দাইয়ে পোস্টাই করেছিলেন স্তালিনের সঙ্গে আখেরে লড়বে বলে।
