ভিন দেশে আশ্রয় নেওয়ার পর কট্টর আত্মাভিমানী জন তার ঐতিহ্যগত আচার-ব্যবহার জোরসে পাকড়ে ধরে থাকে, সাধারণ জন সে দেশের জনস্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়, আর ভাগ্যান্বেষী সুবিধাবাদী জন সর্ব ঐতিহ্য, সর্ব বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দেয় সুদুমাত্র সাফল্য লাভের তরে। পিতা কিসিংগার কোন পন্থি ছিলেন, বলা কঠিন। পুত্র ওসব পুরনো কাসুন্দি ঘটতে চান না, তিনি যে নিজকে একেবারে আগাপাশতলা খাঁটির খাঁটি বনেদি খান্দানি মার্কিন রূপে পরিচিত করতে চান সে বিষয়ে মার্কিন-অমার্কিন সবাই নিঃসন্দেহ।
নামটা নিয়েই শুরু করি। প্রথম নাম, হেনরি। জর্মনে বলে হাইনরিষ, ফরাসিতে বলে, আঁরি। ছেলেবেলায় নিশ্চয়ই তাঁকে সব্বাই হাইনরিষ নামে ডেকেছে, তিনিও তাই লিখেছেন। ইহুদি কবি হাইনরিষ হাইনে অধিকাংশ জীবন কাটান প্যারিসে নির্বাসনে। কিন্তু তার ছিল গভীর দেশপ্রীতি তথা আত্মাভিমান। তিনি হাইনরিষকে পাল্টে তার ফরাসিরূপ আঁরি লেখার প্রয়োজন কখনও বোধ করেননি। রোজোভেল্ট পরিবার গোড়ার থেকেই সব্বাইকে উত্তমরূপে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তারা জাতে ডাচ এবং ইংরেজি কায়দায় রুজভেল্ট উচ্চারণ তাঁরা পছন্দ করেন না। কিসিংগার উচ্চারণের বেলাও তাই। প্রাক্তন জর্মন প্রধানমন্ত্রী কিসিংগারের শেষাংশের উচ্চারণ যে –গার, এবং জার নয় সে তথ্য সবাই জানে। বক্ষ্যমাণ হাইনরিষ কিসিংগার ইচ্ছে করলেই পাঁচজনের দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট করে নির্দেশ দিতে পারেন, জার না করে যেন গার উচ্চারণ করা যায়। কিন্তু তিনি আমাদের পাড়ার হরিশচন্দ্র সান্ন্যালের লিখিত হরস সি স্যান্ডল এবং কালিপদ মিত্রের পরিবর্তে ব্ল্যাক ফুটেড ফ্রেন্ডই পছন্দ করেছেন। এনারা খাস সায়েব হতে চেয়েছিলেন, উনি চেয়েছিলেন নির্ভেজাল মার্কিন হতে
হেনরি আর কিসিংগারের মাঝখানে একটা ইংরেজি অক্ষর এ আছে। অক্ষরটা কোন নামের আদ্যক্ষর সেটা আবিষ্কার করতে সক্ষম হইনি। বিবেচনা করি, খুনিয়া লোকটা বদবোওয়ালা টিপিকাল ইহুদি নামই হবে, যার অম্লত, অধৌত ইহুদি খুসবাইটি দূর-দূরাজতক ভরপুর ম ম করে। অতএব ও নামটা চেপে যাও বিচক্ষণ ঘড়িয়ালের মতো, শুদ্ধমাত্র এ দিয়ে বাকিটা রাখো।
এতখানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে কেবলমাত্র কিসিংগারের নামটি নিয়ে লোফালুফি করার মাধ্যমে আমি শুধু মাফ চেয়ে বলতে চাই, তুমি যে ইহুদি, তুমি যে জাত-মার্কিন নও, সেটা চেপে গিয়ে মার্কিনদের হনুকরণ করা কেন? (টু ইমিটেট-এর অনুবাদ অনুকরণ; টু এপ-এর অনুবাদ হনুকরণ)। ইহুদিদের ভিতর বেশুমার সজ্জন আছেন, মার্কিনদের চেয়ে অমার্কিনদের ভিতর ভদ্রজন বে-এন্তেহা বেশি।
এসব স্নবারি অতিশয় সাধারণ। কিন্তু অসাধারণ নাকি কিসিংগারের প্রতিভা এবং মানবিক গুণরাজির সংমিশ্রণ। –এ সত্য মার্কিন মুল্লুকে উত্তম উত্তম রাজনীতিবিদরা স্বীকার করেছেন। রবার্ট মেকনামারার মতামতের মূল্য নিশ্চয়ই বহুগুণ-গ্রাহ্য। তিনি বলেন, কিসিংগারের ভিতর তিনটি অসাধারণ গুণের সমন্বয় হয়েছে; জর্মনদের কর্ম করার সুবিন্যস্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ পদ্ধতি (সিসটেমাটিক রীতিবদ্ধতা), ফরাসিদের স্পর্শকাতরতা এবং মার্কিনদের উদ্যম (কাজকর্মে অফুরন্ত উৎসাহ, অদম্য নিষ্ঠা)। তাঁর ডক্টরেট থিসিস ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়, নাম এটম বোম এবং পররাষ্ট্র নীতি– কেনাফেন উনট আউস-ভেৰ্টিগে অলিটিক। এই পুস্তক ওই বৎসরই পরিবর্ধিত আকারে এ ওয়ার্লড রিস্টোর্ড নামে প্রকাশিত হয়।
ইউনিভার্সিটিতে কিসিংগার অতি সহজেই অধ্যাপক পদ পান। পরবর্তীকালে তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উপদেষ্টারূপে নিযুক্ত হলে এক সুরসিক গুণী তাঁকে প্রফেসর এবং প্রেসিডেন্ট দুই শব্দের সমন্বয় করে সম্বোধন করেন মি. প্রফাঁসিডেন্ট বলে। নানা গুণ থাকা সত্ত্বেও কিসিংগারের কেমন যেন জন-সমাজে নিজের ব্যক্তিত্ব ও উপস্থিতি অযথা দৃঢ়তাসহ প্রকাশ করার একটা সচেতন প্রচেষ্টা লেগে থাকে এবং আপন বুদ্ধিবৃত্তি (ইনটেলেকট) সম্বন্ধে প্রকাশ পায় তার সীমাহীন ঔদ্ধত্য। এ মন্তব্যটা আমার কাছে বড় অদ্ভুত ঠেকে। নাৎসিরা যখন ইহুদিদের ওপর চোটপাট করছে সে সময়টা কিসিংগারের বারো থেকে পনেরো আয়ুষ্কাল আমি ঠিক সেই ক বৎসরেই বন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার সহপাঠী ইহুদিরা যে তখন কতখানি মানসিক দুশ্চিন্তায় পীড়িত এবং ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে শঙ্কাৰিত ছিলেন সে স্মৃতি আমার কখনও ম্লান হবে না। এরা যে হীনমন্যতার (ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেকসের) সহজ শিকার হবেন, সেটা অনায়াসেই বোঝা যায়। তাই মনে আসে আবার সেই নীতিবাক্য : জালিম তার জুলুমের অনেকখানি রেখে যায় তার শিকারের (মজলুমের চরিত্রসত্তায়। এরই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ দেখা যায়, তার চিন্তাধারা কার্যকলাপে অহেতুক দম্ভ, অকারণ অপমানজনক আচরণ।
নিক্সনের কর্ণধার, প্রাইভেট নয় নম্বর ডিটেকটিভ উপন্যাসের হি-ম্যান হিরো ওয়াশিংটন ০০৯; এবং সর্বশেষে প্রত্ন বিবেক স্পন্দন এই হর-ফন-মৌলা কিসিংগার। ইনি নিজের কার্যভার কমাবার তরে কখনও কোনও ডেপুটি রাখেননি বরমানও রাখতেন না– অধঃস্তন কর্মচারীদের কড়া মানা, তারা যেন কখনও সরাসরি নিক্সনের সম্মুখীন না হয়। তদুপরি তিনি কংগ্রেস, ব্যুরোক্রাটি এমনকি গণশক্তির আধার ভোটারদের অতিশয় তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন। তার মতে, সুষ্ঠু পররাষ্ট্রনীতি চালাবার পথে এরা নুইসেনস, বেকার ঝামেলাময় বাধা মাত্র।
