বৈঠকখানায় নিক্সনের পরিত্রাহি চিৎকার অস্ত্র সম্বরণ করো, অস্ত্র সম্বরণ করো।
ধন্য, সেই সিলেটি কবি, যিনি নিচের অমূল্য সুভাষিতটি রচেছিলেন। আমি শুধু হতীন মা-র (সত্য-র) বদলে কিসিংগার ব্যবহার করেছি :
কিসিংগারের কথাগুলিন
মধু-রসর বাণী
তলা দিয়া গুড়ি কাটইন
উপরে ঢালইন পানী ॥
.
ছায়ার কায়ারূপ
বহু দিন ধরে হের হাইনরিষ এ. কিসিংগার কলকাঠি নেড়েছেন। কোনও রকমের সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ না করে মি. নিক্সনের হয়ে ভিয়েতনাম বাবদ আলোচনা সভায় নেতৃত্ব করেছেন, বার বার। কূটনৈতিক অসুস্থতায় তিনি ভুগেছেন অর্থাৎ যেখানে কোনও অসুস্থতা প্রকৃতপক্ষে নেই, অথচ ডিপ্লোমেটকে যে কোনও কারণেই হোক কিছুদিন গা-ঢাকা দিতে হবে, তখন তিনি যে ব্যানোর ভান বা ভণ্ডামি করেন সেটাকে বছর পঞ্চাশ ধরে ডিপ্লোমেটিক ইলনেস বলা হয়। ছেলেবেলায় আমরা অনেকেই ক্লাসিক ইলনেসে ভুগেছি, অর্থাৎ ক্লাসে না যাবার জন্য পেট-কামড়ানো, দাস্ত ইত্যাদির শরণ নিয়েছি এবং দ্বিতীয়টার উভয়ার্থে বাহ্যিক প্রমাণস্বরূপ বদনা-হস্তে ঘন ঘন, কখনও-বা দ্রুতপদে, কখনও কাত্রাতে কাত্রাতে, বিশেষস্থলে গমনাগমন করেছি। হের কিসিংগার কূটনৈতিক অসুস্থতায় অকস্মাৎ ইসলামাবাদে কাতর হয়ে মারী পাহাড়ে যান, এবং তার পর তেমনি অকস্মাৎ উদয় হলেন চীন দেশে, যেন ডুব-সাঁতার কেটে, বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে হুশ করে কোঁকড়ানো চুলসুদ্ধ মাথা তুলে বিশ্বজনের বিস্ময় লাগালেন। দুনিয়ার লোক তাকে চিনে ফেলার পরও তিনি যতদূর সম্ভব পর্দার আড়ালে থাকাটা দানিশমন্দের সর্বোত্তম সিফৎ বলে মনে করেন। এ কর্মে তার গুরু বরমান– হিটলারের ছায়া। ইহুদিজ কিসিংগার নাৎসি-বৈরী জর্মনরূপে জন্ম নিয়েছিলেন ফুর্ট শহরে। কুখ্যাত রনবের্গ শহরের গা-ঘেঁষে এ শহর। নাৎসিবৈরী কিসিংগার পাড় নাৎসি বরমানের ঠিক উল্টোটা করবেন এই তো আমরা প্রত্যাশা করব, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হয় না। ইংরেজ ফৌজি আপিসাররা নেটিভ পাঞ্জাবি আপিসারদের ওপর যে চোটপাট করত, তাই নিয়ে পাঞ্জাবিদের মনস্তাপের অন্ত ছিল না– যদিও তার বিরুদ্ধে ফরিয়াদ তারা বড় একটা করত না। তার কারণ অন্যত্র সবিস্তার বলেছি, পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। আবার এই পাঞ্জাবিরাই যখন একদিন ব্রিটিশ-রাহুমুক্ত হল তখন তারা এদেশে যা করল সে তো ব্রিটিশকে সব দিক দিয়ে লজ্জা দিতে পারে।
আমার মনে তাই নিত্য একটা আশঙ্কা জেগে আছে, পাঞ্জাবি ফৌজ এবং তাদের চেলা-চামুণ্ডারা যেসব নিষ্ঠুরতা এ দেশে করেছে আমরা যেন তারই পুনরাবৃত্তি করে না বসি। আমাদের মধ্যে যাদের চিত্ত দুর্বল, যারা একমাত্র অনুকরণ ছাড়া স্বাধীনভাবে চিন্তা করে আপন কর্মপন্থা বেছে নিতে পারে না, তাদের কিছু লোক কিছুটা নিষ্ঠুরতা করবেই, কিন্তু আল্লার কাছে বার বার করুণ আবেদন জানাই, ওটা যেন আমাদের রক্তমাংসে প্রবেশ না করতে পারে, আমাদের ঈমান যেন আচ্ছন্ন না করে তোলে। এইটেই আমার এ জীবনে আমি সবচেয়ে বেশি ডরিয়েছি। অকারণে নয়। যুগে যুগে গুণীজ্ঞানীরা সাবধানবাণী শুনিয়েছেন, পাপাচার নির্মূল করো, কিন্তু সে পাপের কালিমা যেন তোমার গাত্র স্পর্শ না করতে পারে। তার চেয়ে পাপাচারীর হাতে শহিদ হওয়া ঢের ঢের ভালো।… আমি জানি, এ প্রস্তাবনাটি এখানে সম্পূর্ণ অবান্তর না হলেও এতখানি সবিস্তর বলাটা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু যে ভয় আমাকে আজীবন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি শঙ্কাতুর করে রেখেছে সেটা এ-জীবনে অন্তত একবার সংক্ষেপে উল্লেখ না করে থাকতে পারলুম না। বহু পরিবর্তনের ভিতর দিয়েও যুগ-যুগ ধাবিত নিষ্ঠুরতা অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে এই তো সর্বনাশ!
কিসিংগার দেশত্যাগী হন পনেরো বৎসর বয়সে। নাৎসিরা ক্ষমতা লাভের প্রায় চার বৎসর আগের থেকে, দেশময় না হলেও ফুর্ট-রনবের্গ অঞ্চলে যে নিষ্ঠুরতা দিয়ে জনগণের বিশেষ করে ইহুদিদের মনে ত্রাসের সঞ্চার করে, তার লক্ষণ যেন আমি কিসিংগারের কার্যকলাপে মাঝে মাঝে দেখতে পাই। খাঁটি নিষ্ঠুরতাটার কথা হচ্ছে না। মানুষ যে নিষ্ঠুর হয় সেটা সর্বাগ্রে বোঝাবার জন্য যে তার শক্তি অসীম, তোমার একমাত্র কাজ তার বশ্যতা স্বীকার করা। কবির ভাষায়–
পালোয়ানের চেলারা সব
ওঠে সেদিন খেপে,
ফেঁসে সর্প– হিংসা-দর্প
সকল পৃথ্বী ব্যেপে,
বীভৎস তার ক্ষুধার জ্বালায়
জাগে দানব ভায়া
গর্জি বলে আমিই সত্য,
দেবতা মিথ্যা মায়া।
ব্রাউন-শার্ট, এস এস, হিমলার হিটলারের গর্জন– তারাই সত্য। তাদের পশুবলেই সত্য শেষটায় একদিন লোপ পেল। কিন্তু হায়, এখনও আজও তাদের দর্প দম্ভ শুনতে পাই বহু জর্মন পলিটিশিয়ানের জলজ্যান্ত কণ্ঠে, কন্টিনেন্ট, মার্কিন মুল্লুকে। হ্যাঁ, দেশকালপাত্রভেদে অবশ্যই কখনও নিররূপে, কখনও-বা ১ দু কণ্ঠে সে স্বৈরতন্ত্র– ডিটেটরি– আত্মপ্রকাশ করে। তার কুরতম নীতিধর্মহীন স্বপ্রকাশ ইজরায়েলের গোড়াপত্তনের দিন থেকে। এই ইহুদিরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছিল হিটলারের হাতে। হিটলার অবশেষে আইন পাস করলেন ইহুদিদের কোনও রাষ্ট্রাধিকার নেই, জর্মনি তাদের মাতৃভূমি নয়। এবং সবচেয়ে বড় বিস্ময়, রূঢ়তম ট্র্যাজেডি– এইসব বাস্তুহারা ইহুদিরাই ফলস্তিনে গিয়ে লেগে গেলে সঙ্গিন দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নর-নারী, আবাল-বৃদ্ধ-শিশুকে আরবদের আপন মাতৃভূমি থেকে বাস্তুহারা করতে। কিসিংগার পরিবার বাস্তুহারা হয়ে পেয়ে গেলেন, বিপুলতর রাষ্ট্র আমেরিকা যেন বিশ্বভুবন দু বিঘার পরিবর্তে।
