এই সুবাদে আরেকটি তত্ত্ব-কথার উল্লেখ করি। কিছুদিন পূর্বে আমি চিন্তাশীল পাঠককে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলুম, তাঁরা যেন নিক্সনের চেলা ইরানের বাদশাহর প্রতি একটু নজর রাখেন। উপস্থিত সে-নজরটাকে কিছুদিনের জন্য ছুটি দিতে পারেন। কারণ শাহ ইতোমধ্যে বিকল-ইঞ্জিনওয়ালা নিক্সন-জাহাজটি ত্যাগ করে আরেকটা উত্তম জাহাজে চড়েছেন। তিনি দেখলেন নিক্সনের ইঞ্জিন বিকল করে দিয়েছে ওয়াটারগেটের বেনোপানি হড়হড়িয়ে তার সর্বাঙ্গে প্রবেশ করে। ওদিকে সরদার দাউদ গদিতে বসতে না বসতেই রুশ তাঁকে ঈদের (আনন্দের) আলিঙ্গন জানিয়েছে। এদিকে শুধু ওয়াটারগেট না, কুচক্রীরা নিক্সন আধা-আইনি বে-আইনিভাবে তাঁর প্রাইভেট বাড়িদুটো কতখানি সরকারি পয়সায় খাড়া করেছেন সেটা ক্রমশ উপন্যাসের মতো প্রকাশ করছে। এবং কিছু কিছু অনুসন্ধান আরম্ভ হয়ে গিয়েছে, ভিয়েতনাম গয়রহ ছাড়াও তিনি কারণে-অকারণে পরিপূর্ণ শান্তিময় দেশেও গোপনে টাকা, অস্ত্রশস্ত্র ঢেলেছেন কী পরিমাণ? শাহ স্পষ্ট দেখতে পেলেন, শ্রদ্ধ আখেরে যতদূরই গড়ক, না-গড়াক– প্রভু নিক্সন দুম করে আর কোম্পানির মাল বেশ কিছুকাল ধরে ইরানের দরিয়াতে ঢালবার হিম্মৎ পাবেন না। অর্থাৎ কি না, কিসিংগার মুনিব নিক্সনকে সে পরামিশ দেবেন না। মার্কিনিরা বলছে, দেশের স্বার্থের তরে তুমি যত চাও টাকা ঢালো, কিন্তু আপন প্রভুত্ব বাড়াবার জন্য না।
ইতোমধ্যে আরেকটা কাণ্ড ঘটল। মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, নিক্সনের দ্বিতীয় ইলেকশনের সুপ্রিম কর্ণধার মি. মিচেলকে বাধ্য হয়ে সাক্ষ্য দিতে হয় ওয়াটারগেট তদন্তে। এক সিনেটর কিংবা ফরিয়াদি উকিল প্রশ্ন করেন, তা হলে বলুন, আপনি দেশের স্বার্থকে নিক্সনের স্বার্থের চেয়ে বড় করে দেখেন কি না? উত্তরে তিনি সগর্বে বলেন, নিক্সনের প্রেসিডেন্টরূপে জয়লাভকে আমি বৃহত্তর বলে মনে করি। (!!) এই পরশু-দিন তক বিবিসির বিশ্বালোচনার সদস্যগণ এই বিকট নীতির উল্লেখ করে বেকুবের মতো বার বার তাজ্জব মেনেছেন। অতএব যদিস্যাৎ সকল পথচারী মার্কিন প্রশ্ন শুধোয়, হুজুর তা হলে ইরানে এবং ১৯৭১-এ ইরানের মারফত (তকালীন) পশ্চিম পাকিস্তানে যে টাকা বন্দুক কামানটা ঢাললেন সেটা কি আপন লেজ মোটা করার জন্যে, না মার্কিন মুল্লুকের স্বার্থে?– এ-প্রশ্নটা তো ছিদ্রান্বেষীর না-হক প্রশ্ন নয়। অতএব শাহও তড়িঘড়ি তার। প্রধানমন্ত্রীকে পাঠালেন মস্কোবাগে– দাউদের গদি দখলের তিন সপ্তাহ যেতে না যেতে। খুদায় মালুম, দফে দফে কত দফেই না নয়া জাহাজে চড়ে প্রধানমন্ত্রী করার-দাদ করার-নামা সই করলেন। শাহ ওদিকে পিণ্ডিকে পরামর্শ দিলেন, উপস্থিত জো-সো প্রকারের একটা সমঝোতা ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের সঙ্গে করে নাও। আমাদের রাশি এখন বেহদ বদ-বখৎ কম-বখৎ! আর পারো যদি, ঝটপট রুশ-কিশুতিতে সওয়ার হও– না হয়, গলুইটাতেই দু দিকে পা ঝুলিয়ে খোওয়াব দেখ, ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল হকিয়া নয়, হাঁটিয়া। কিন্তু পিণ্ডি যে চীনা-কানুর সঙ্গে বড় বেশি পীরিতির লেটপেট করে বসে আছেন! এখন শ্যাম না কুল? তবে– আজিজ যার নাম, রুশের সঙ্গে আজিজি করতে কতক্ষণ! কুল্লে দুনিয়া তাঁর খেশ-কুটুম –বসুধৈব কুটুম্বকং–বলেছেন স্বয়ং চাণক্য! তবে কি না চন্দ্রাবতী কুঞ্জে যেতে হবে চীনা বঁধুয়ার আঙ্গিনা দিয়া।
.
সংক্ষিপ্ত কিসিংগার কাহিনী
বিশেষ করে বাংলাদেশের লোকের স্মরণে থাকার কথা শ্রীযুক্ত কিসিংগারের (ডাকনাম কি?) মূর্তিটি। ইনি খাঁটি ইহুদি। জন্ম জর্মনির ফুর্ট শহরে। নাৎসিরা তাঁর কোনও ক্ষয়ক্ষতি করার পূর্বেই পিতা-মাতা তাঁর পনেরো বছর বয়সে তাকে নিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। কী করে তিনি শেষটায় নিক্সনের একমাত্র উপদেষ্টার আসন পেলেন সে কাহিনী দীর্ঘ, অতএব বারান্তরে।… ৭১ ডিসেম্বরের যুদ্ধ লাগার আগে এবং পরে এবং এখনও (যদিও ঠিক এখুনি বড়ই বেকায়দায়) ইনি পাকিস্তানের মিলিটারি জুন্টাকে যে কোনও উপায়েই থোক, খোদার খাসির মতো পোস্টাই খোরাক দিয়ে দিয়ে তাগড়া করে রাখতে চান। কেন? এইটে তার সর্ববিশ্ব সম্বন্ধে যে পূর্ণাঙ্গ দর্শন তারই একটি ক্ষুদ্র অংশ– ইরান-আফগান পাক-ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে তার বড় একটা অধ্যায়। নিক্সনকে তিনি এই মন্ত্রে দীক্ষিত করেন ধীরে ধীরে। সে-কাহিনীও দীর্ঘ, আলোচনা বারান্তরে। এই দর্শনানুযায়ী ন মাস ধরে নিক্সন বাইরে নিরপেক্ষতার ভড়ং করতেন– যদিও সেটা এতই ঠুনকো ছিল যে, সামান্য ঠোনা মারতেই চৌচির হয়েছে একাধিকবার। অন্দরমহলে কিসিংগারের নেতৃত্ব আখেরি ত্রাহি ত্রাহি যে গোপনস্য গোপন সভা ৩, ৪, ৫, ৬, ৮ ডিসেম্বরে ৭১-এ হয়েছিল, সেগুলোর চিচিং ফাঁক করে দেন প্রাতঃস্মরণীয় প্রখ্যাত কলাম-লেখক জ্যাক এন্ডারসন মার্কিন সংবাদপত্রে, ৫ জানুয়ারি ১৯৭২-এ। কী নিদারুণ বেহায়া ভণ্ডামি চালিয়েছিলেন মুনিব-চাকর দু জনাতে। হন্যে হয়ে কিসিংগার সব্বাইকে শুধোচ্ছেন, কী কৌশলে গোপনে পাক-সরকারকে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা যায়? বিশেষজ্ঞরা মাথা নেড়ে বলছেন, ইরান, তুর্কির মারফত ও হয় না। (পাঠানো হয়েছিল, আমরা জানি– লেখক)। শেষটায় কিসিংগার অতিষ্ঠ হয়ে বলছেন, আমরা একটা স্টেটমেন্ট দেব বই কি। আমরা, এই যেন অনেকটা সাধারণভাবে (ইন জেনরেল টার্মস অর্থাৎ ধরি মাছ না ছুঁই পানি ধরনের বলব, পুব-পাকে একটা পলিটিকাল গুনজাইশ একোমডেশন–অর্থাৎ সন্ধি না, চুক্তি না, (ছয় পয়েন্ট মাথায় থাকুন। লেখক) করে নেওয়ার পক্ষপাতী আমরা। কিন্তু কোনও ধরা-বাঁধার মতো (স্পেসিফিকস) অবশ্যই কিছু বলব না, ইঙ্গিতও দেব না– যেমন ধরো মুজিবকে মুক্তি দেওয়ার মত। এটা অন্দরমহলে।
