তীব্র প্রতিবাদ, বিস্তীর্ণ জনপদব্যাপী প্রচণ্ড আন্দোলন আরম্ভ করলেন মোল্লারা। যেসব কওম তাদের সহায়তা করল তাদের সংখ্যাও নগণ্য নয়। এবং সেই কুখ্যাত শিনওয়ারি কওম, যারা সর্বপ্রথম বাদশাহ আমানউল্লাহর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে, এবারেও তারা এমনই খাণ্ডারের মতো রুদ্ররূপ ধারণ করল যে অবশেষে ট্যাংকসহ শাহি ফৌজ তাদের আক্রমণ করে ওই অঞ্চলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনল।
লেনিনের প্রতি এইসব উচ্ছ্বসময়ী প্রশস্তি এবং মোন্না সম্প্রদায়ের প্রবল প্রতিক্রিয়ার শেষ ফল এই দাঁড়াল যে, কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম সম্বন্ধীয় একটা নতুন শাখা প্রবর্তন করা হল। এ-শাখার চালকগণ অহরহ সজাগ দৃষ্টি রাখেন, ইসলামের স্বার্থ রক্ষার্থে অর্থাৎ সাধারণ ছাত্রসমাজের সামান্যতম মতবাদ, কার্যকলাপ তাদের মনঃপূত না হলে কুফর বিদাৎ হুঙ্কাররবসহ তীব্র প্রতিবাদ তুমুল আন্দোলন সৃষ্টি করেন।
দাউদ খান নাকি প্রথম দিন থেকেই ছাত্রসমাজের সমর্থন পেয়েছেন। তা হলে স্বতই স্বীকার করতে হয়, ছাত্রলবৈরী মোল্লা সম্প্রদায় তারও বৈরী। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, দাউদ মোল্লাদের এক বৃহৎ অংশের স্বীকৃতি পেয়েছেন। দাউদ দিবান্ধ নন। তিনি জানেন, মোল্লা ও তাদের চেলা কওমরা ছাত্রদের চেয়ে সংখ্যায় ঢের বেশি।
ছাত্ররূপ একটা ঝুড়িতে দাউদ তার কুল্লে আণ্ডা রেখে আরব্যরজনীর অননশশারের খোওয়াব দেখবেন না।
.
নামে কী করে!
গোলাপে যে নামে ডাকো, গন্ধ বিতরে
এক নিক্সন-বৈরী মার্কিনই হতাশ সুরে বলছিল, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ভালো করে বুঝতে হলে সক্কলের পয়লা এক ঝুড়ি নাম সড়গড় মুখস্ত করতে হয়। কটা লোকের সে সময়, সে উৎসাই আছে। তার পর মুখস্থ করতে হবে তাদের পূর্বকীর্তি কেরামতির ইতিহাস। কে রিপাবলিকান, কে ডেমোক্রেট; কে রিপাবলিকান বটে কিন্তু ওয়াটারগেটের কেলেঙ্কারির ঘেন্নাতে হয়ে গেছেন রিপাবলিকান দলের চাই নিক্সন-বিরোধী, কারা পয়লা নম্বরি রিপাবলিকান এবং নিক্সনের অকারণ মেহেরবানিতে কন্ট্রাক্ট-পারমিট গয়রহ পেয়ে তার প্রতি এখনও নেমক-হালাল, বিপদে পড়ে নিক্সন কাকে কাকে জল্লাদের হাতে না-হক সঁপে দিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি দফে দফে নাম-কাম মুখস্থ করতে পারেন– খুদ মার্কিন-ইয়াংকি পাঠকই কজন? তবু যারা টিভিতে ওয়াটারগেট তদন্তের জলসা আণ্ডাবাচ্চাসহ গুষ্টিসুখ অনুভব করতে করতে নিত্যি নিত্যি দেখেছেন তাদের পক্ষে মামলাটার গভীরে ঢোকা খানিকটে সহজ হয়েছে। কিন্তু প্রাচ্যে এত-সব বায়নাক্কা-আবদার বরদাস্ত করে আপন বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে শেষ রায় দিতে পারেন কজন স্পেশালিস্ট?
আমি সায় দিয়ে বললুম, আমরা বরঞ্চ ব্রিটিশের তরো-বেতরো নামের কিছুটা হদিস পাই, কিন্তু তোমাদের মার্কিন জাতটা ইংরেজ, জর্মন, ডাচ, ফরাসি, আরও কত বেশুমার জাত-উপজাত দিয়ে গড়া আস্ত একটা জগাখিচুড়ির লাবড়া-ঘাট। ওই ধরো মামলার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী-আলিঙ্গনে বিজড়িত, নিক্সনের ঘরোয়া, হোয়াইট হাউসের চাই চাই সচিব, কর্মকর্তাদের ইসমে মোবারকের ফিরিস্তি : সক্কলের পয়লা যে দুই মহাপ্রভু এ-ফিরিস্তি ধন্য করেন, তাঁদের নাম খাঁটি জর্মন এরলিষমান, হালডেমান। অবশ্যই সাদামাটা মার্কিন নাগরিক কুল্লে ভিনজাতের নাম উচ্চারণ করে মাতৃভাষা ইংরেজি কায়দায়। এই সোনার বাংলাতেই উন্নাসিক পণ্ডিতমশাই মুকুলেশ্বর রহমান লেখেন মুখলেসুর রহমান-এর পরিবর্তে। তার পর ধরুন, রুমসফেট, ক্লাইন, কের্লি, গিলার এগুলো নিঃসন্দেহে জর্মন নাম। ফরাসি নাম অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু জাতে ভারী। খুদ ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম অ্যাগনো ফরাসি উচ্চারণ আইন্নো। এনার বিরুদ্ধেও ফৌজদারি তদন্ত চলছে, নানাবিধ নজরানা নিয়ে। এবং হাসি পায়, যখন আইন্নোর মূল অর্থ স্মরণে আসে। প্রথম অর্থ মেষশাবক, পরের অর্থ সাধু-সরল-পবিত্র! হুবহু ওই অর্থ ধরেন এরলিষমান। এ-নামের সরল অর্থ সরল! সাধু, অনারেবল! অধিকাংশ ঘড়েল জনের বিশ্বাস, ইনি ওয়াটারগেট তদন্ত কমিশনে যে সাক্ষ্য দেন তার চোদ্দ আনা ঝুট। ওই সময় জর্মনিবাসী এক জর্মন, সুদূর স্বদেশ থেকে, বিখ্যাত এক মার্কিন সাপ্তাহিকে এরলিমানের সরলার্থের প্রতি সাদা-মাটা মার্কিন নাগরিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের তরে ব্যঙ্গ-রসের খোরাক যোগান।
কিন্তু এহ বাহ্য।
.
প্রেসিডেন্ট; না দেশের মঙ্গল?
ভুট্টো সাহেবের যে রকম আজিজ, হিটলারের বরমান, হুবহু ঠিক তেমনি মি. নিশ্বনের মহামান্য মি. হেনরি এ কিসিংগার। আমি জানি, একমাত্র খাস জর্মন ভিন্ন তামাম দুনিয়া উচ্চারণ করে কিসিঞ্জার। এস্তেক বিবিসি। পাঠক একটু ধৈর্য ধরুন, পরে তাবৎ গুহ্য তথ্যতত্ত্ব স্বপ্রকাশ হয়ে যাবে। এস্থলে বলা প্রয়োজনীয় যে আজিজ বরমান কিসিংগার চরিত্রে অতি অবশ্যই তফাৎ আছে; মি. ভুট্টোর দোষগুণ যাই থাক, তিনি কখনও আজিজের ম্যাড়া বনবেন না। বাকিদের কথা ক্রমশ প্রকাশ্য। কিন্তু এস্থলে সাতিশয় প্রয়োজনীয়, পাঠক যেন এই কিসিংগার প্রভুর প্রতি একটু নজর রাখেন। কিন্তু এর প্রেম বাংলাদেশ কখনওই পাবে না। কারণ ইনি ধর্মে, কর্মে সর্ববিষয়ে কট্টর ইহুদি। ইহুদিজনসুলভ তার বিরাট নাসাযন্ত্র, তথা ঘন-কুঞ্চিত প্রায় নিগ্রোসম কেশ যেন পাঠক তার ফটোতে লক্ষ করেন। বিস্তর নৃতত্ত্ববিদের অভিমত, ফেরাউনের দাসত্বকালে মিসরস্থ নিগ্রোদের সঙ্গে সংমিশ্রণের ফলে ইহুদিদের মস্তকে এই কুঞ্চিত কেশের উদ্ভব।… স্বভাবতই ইহুদি কিসিংগার তথাকথিত ইজরায়েলকে জানপ্রাণ দিয়ে মহব্বৎ করেন; পক্ষান্তরে আমরা ফলস্তিনের গৃহহারা আরবদের মঙ্গল কামনা করি। তারা যেন একদিন স্বদেশে সসম্মানে ফিরে যেতে পারে আমরা সেই প্রার্থনা করি– শরণার্থী হয়ে ভিন দেশে বাস করার পীড়া আমরা জানিনে, তো জানেন নিক্সন? তিন দিন আগে তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেন, আরব-ইজরায়েলের মোকাবেলায় আমি নিরপেক্ষ (পাঠক বিশ্বাস করতে চান, তো করুন, সেটা আপনার মর্জি)। আমি চাই শান্তি। পাঠক লক্ষ করবেন, আমি চাই বিচার, আমি চাই জাস্টিস, ইনসাফ- এ কথা হুজুর বলেননি, কস্মিনকালেও তার মুখ থেকে শুনিনি। কিন্তু শান্তি তো অতি সহজেই হয়। মিশর, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়াকে অন্তত একশো বছরের তরে শান্ত করার জন্য যথেষ্ট এটম বোম নিক্সনের ভাণ্ডারে আছে। শান্তিভঙ্গ তো এই পাষণ্ডরাই করছে। ইজরায়েল তো শব্দার্থে নিষ্পাপ এরলিষমান অ্যাগনোর মতো! নিক্সন তো এই মতই পোষণ করেন। তার পিছনের ছায়াটি– কিসিংগার তিনি তো টুইয়ে দেবার তাতিয়ে দেবার তরে আছেনই। তবে কি না, সে শান্তিটা হবে গোরস্তানের শান্তি।
