ছেলেটা ভিরমি যায়নি, তবুও। বিড় বিড় করে কী যেন বলছে। ভাবলুম, ভুল বকছে। না, একটা ছেলে বললে, আমাকে সে কী যেন বলতে চায়, আমি যেন কাছে গিয়ে কান পেতে শুনি। কাছে যেতে আধ-মরা গলায় বললে, আমি যেন তার সব অপরাধ মাফ করে দিই। আমি বললুম, তুমি আবার কী অপরাধ করলে? সেরে ওঠো, সব ঠিক হয়ে যাবে। ছেলেটা আহ বলে চোখ বন্ধ করল।
এর পরের কাহিনী দীর্ঘ। উপস্থিত সুখবরটা জানাই। দেড় মাস পর সে হাসপাতাল ছেড়ে ফের ক্লাসে ফিরে এল। কিন্তু এহ বাহ্য।
আমাদের ফরাসি অধ্যক্ষটি ছিলেন চৌকস লোক, পুলিশকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিদায় দিয়ে, দফতরের কাবুলি হেড ক্লার্ক, খাজাঞ্চি, অনুবাদককে বললেন এ-দেশের প্রথানুযায়ী বিচার করে আততায়ীকে যেন সাজা দেওয়া হয়।
তারা স্থির করলেন পূর্ব কথিত বাস্তিনাদো। আমার কিন্তু শোনা কথা। ছেলেটাকে মাটিতে বুক রেখে টান টান করে শোয়ানো হল। হাতদুটো সামনের দিকে প্রসারিত। দু হাতের উপর মাটির সঙ্গে জোরসে চেপে ধরে দাঁড়াল মিলিটারি বুট পড়া দুই চাপরাসি, দু পায়ের গোছা সবুট চেপে দাঁড়াল আরও দু জন চাপরাসি। আরও জনা চারেক বুট দিয়ে পিঠ-কাঁধ সর্বাঙ্গ চেপে ধরে দাঁড়াল চতুর্দিকে। তার পর পায়ের তলাতে জানিনে কী ধরনের চাবুক দিয়ে বেতের পর বেতের বেদম গুনে গুনে মার। বার দশের পর পায়ের তলা দুটোতে আর এক রত্তি চামড়া অবশিষ্ট রইল না। লাল লাল ক্ষতবিক্ষত জখমের উপর আরও কত ঘা মারা হয়েছিল সেটা আমি আর শুনতে চাইনি।… দিন দশেক পরে একদিন দেখি, কুষ্ঠরোগীর মতো পট্টি দিয়ে পা দুটো সর্বাঙ্গে মোড়া অবস্থায় দুটো লাঠিতে ভর দিয়ে পা দুটো মাটি ছোঁয়-কি-না-হোয় অবস্থায় প্রাতকৃত্য সারতে যাচ্ছে। মাস দুই পরে ফের ক্লাসে এল।
আর সব সহপাঠীরা মন্তব্য করেছিল, ছেলেটার দারুণ বরাত-জোর। বিদেশি অধ্যক্ষ মধ্যস্থ না হলে, নির্ঘাত জেলে পাথর ভাঙতে হত নিদেন পাঁচটি বৎসর। অন্য অত্যাচারের কথাটা সবাই জানত আসলে যে কারণে অধ্যক্ষ মধ্যস্থ হয়েছিলেন। জেলের সম-রতি-প্রবণ গার্ড-সেপাইদের হাত থেকে ছোকরার নিস্তার থাকত না।… এতদিনে এ সব পাশবিক দণ্ডদান মকুব হয়ে যাওয়ারই কথা।
.
রণাঙ্গনে নব-নায়ক ছাত্রসমাজ
আফগানিস্তানে যুগ-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খুব যে একটা আদ্যন্ত পরিবর্তন হয়েছে এমত বিশ্বাস করার কারণ নেই। তবে একটা সত্য স্বীকার করতেই হবে। প্রাচ্যপ্রতীচ্যের আর-পাঁচটা দেশের মতো দু তিনটে নগরে, বিশেষ করে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা এদানি নানা বিষয়ে সচেতন হয়ে গিয়েছে। এটা অতিশয় স্বাভাবিক যুগধর্ম। বছরের পর বছর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, নানা পাঠ্যপুস্তক মারফত বিশ্বসংবাদ পড়ানো হবে, আর ছাত্রেরা সেই প্রাচীন সর্বাধিকারী রাজশক্তি তখনও মেনে নেবে তা রাজা যতই মেহেরবান হন না কেন– ফল ভালো হোক, মন্দ হোক সে-বিদ্যা প্রয়োগ করার প্রলোভন তার অতি অবশ্যই হবে। যেমন, দশ-বিশ বছর ধরে সেপাই-অফিসারকে কুচকাওয়াজ, সমরবিদ্যা শেখানো হবে, আর তারা জলজ্যান্ত লড়াইয়ে নেমে সেটা কখনও কাজে লাগিয়ে পরখ করে দেখতে চাইবে, এটা নিতান্তই দুরাশা মাত্র। এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাদশাহ জহির যে যৌবনের সাম্য ঐক্য স্বাধীনতার কথা ভুলে গিয়ে রাজশক্তিকে দৃঢ়তর এবং ব্যাপকতর করতে চেয়েছিলেন সেটা ন্যায়সঙ্গত না হলেও স্বাভাবিক, এমনকি আংশিক গণতন্ত্রমূলক সংবিধান মঞ্জুর করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পলিটিকসে একটা রাজার দল কিংস পার্টি স্থাপনা করতে চেয়েছিলেন, হুবহু যে-কাজটি সিংহাসন ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ডুক অব উইনজর করতে রাজি হননি। পক্ষান্তরে ছাত্ররাও সেকুলার শিক্ষার ফলস্বরূপ এবং মক্তবের ভিতরে-বাইরে মোল্লাদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার দরুন রাজনীতিতে ঢলে পড়ল পেন্ডুলামের অন্য প্রান্তে : বাইরের থেকে সাহায্য পেয়ে তারা হয়ে দাঁড়াল মার্কস, মাও এবং এককাট্টা চরমপন্থিতে। তারই ফলে ১৯৬৯ সালে তাদের বিক্ষোভ, দাবি, স্ট্রাইক গোটা আন্দোলনটা সর্বাংশে রাজনৈতিক ছিল না, ছাত্রসমাজের নিছক সুখ-সুবিধা কল্যাণকল্পে একাধিক স্ট্রাইকের আয়োজনও হয়েছিল পুলিশের সঙ্গে ভীষণ সংঘর্ষে আন্দোলন এমনই মারাত্মক আকার ধারণ করল যে, কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে ছয় মাস কাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হল।
এর ফলে কিন্তু একটা তত্ত্ব জনসাধারণ, বিশেষ করে মোল্লাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেল : সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনে বর্তমানে সর্বক্ষেত্রে সর্বপ্রধান শক্তিমান ছাত্ররাই। পক্ষান্তরে এ কথাও সত্য যে, জনপদ অঞ্চলে কওমদের ভিতর যেমন অশিক্ষিতের সংখ্যা অধিকতর ঠিক তারই সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে তাদের ধর্মোন্মাদনা মারাত্মক এবং সর্ব প্রগতিশীল সংস্কার তারা ঘৃণা করে।
তৎসত্ত্বেও ছাত্রসমাজ তাদের মাও-মার্কস আন্দোলন আরও জোরদার করে তুলতে লাগল এবং তার বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া দেখা দিল ১৯৭০-এ। লেনিনের বাৎসরিক জন্মদিনে একখানি ক্যুনিস্ট পত্রিকা তাঁর স্মরণে রচিত একটি কবিতাতে এমনসব প্রশস্তিসূচক হামদ ও নাৎ দোওয়াদরুদের শব্দ ব্যবহার করল, যেগুলো সচরাচর আল্লা-রসুলের স্মরণেই উচ্চারিত হয়।
