পাঠান-বেলুচ নিরক্ষর। কিন্তু প্রত্যেকটি করার-নামা তারা জের-জবরতক মনে গেঁথে রাখে। কিন্তু এহ বাহ্য।
বললে পেত্যয় যাবেন না, শতাধিক বৎসর ধরে ব্রিটিশ, শিখ, রুশ, আফগান, ইরান, পাকিস্তান, হিন্দুস্থান– এঁদের ভিতর আপসে কী সব চুক্তিনামা তৈরি হল, কালি শুকোবার আগেই সেগুলোকে এক পক্ষ টুকরো টুকরো করল (তিক্কা তিক্কা করদনদা), এ সব সাকুল্যে সংবাদ তাদের নখের ডগায়। এরই ওপর নির্ভর করছে তার প্রধান আমদানি- লুটতরাজ। পূর্বেই বলেছি, চাষ-আবাদ তার কাছে অনেকটা আমরা যে-রকম পুরনো খবরের কাগজ বিক্রি করে এক খেপ রিকশাভাড়া তুলি-কি-না-তুলি গোছ। বিশেষ করে তার শ্যেনদৃষ্টি পূর্বে ছিল ব্রিটিশের প্রতি, এখন নেকনজর ফেলে পাক-সরকারের দিকে। যখনই যে-সরকার, কি আফগান, কি পাকসরকার দুশমনের হামলা বা সে-ভয়ে বেকাবু, তখনই পাঠান-বেলুচের মোকা। আর আল্লার কুদরতে আজকাল পাঠানের বারোয়ারি ড্রইংরুম, ছোটাসে ছোটা চায়ের দোকানেও বেতার। এখন হাওয়ায় যায় তাজামে তাজা খবর। অন্তত পাঁচটা দেশ পশতু জবানে পরস্পরবিরোধী খবর দেয় প্রতিদিন। আর আফগানচালিত কাবুল-বেতার এবং পাঞ্জাবি চালিত পাক-বেতারে বাক-যুদ্ধ– জংগে জবান– লেগে যায় তখন সে বেহদ আরাম বোধ করে তার দিল খুশ, জান-ত-র-র-র।
এই যে পাক, হিন্দ, বাঙ্গালায় ত্রিভুজাকৃতি করার-দাদ হতে চলল এই বে-মুবারক আখবার সুবে পাঠানিস্তানের দিল-জান কলিজা-গুর্দা তিক্কা তিক্কা করে দেবে। এতে করে পাক তার পূর্ব সীমান্ত সামলে নিল। সান্ত্বনা এইটুকু, পাক সরকারের প্রতি অপ্রসন্ন কয়েক হাজার জাতভাই পাঠান সেপাই দেশে ফিরে এলে তাদের তাড়িয়ে যদি কিছু-একটা করা যায়। সদর দাউদও সেটা হিসাবে নিচ্ছেন। স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, আপন খুশিতে দাউদের হুংকারে বিব্রত পিন্ডি সরকার যুদ্ধ-বন্দিদের ফেরত নিচ্ছেন এই দুর্দিনে, বিশেষ করে নিক্সনের দুর্দিন যাদের আপন দুর্দিন– এটা বিশ্বাস করা কঠিন।
পাক-পক্ষ দিল্লিতে প্রায় এক পক্ষ ধরে কেন গাইগুই, টালবাহানা করলেন, সেটা এখানে বসে আমি বলতে পারি, পাঠান জানে, তার প্রতিবেশী আফগান জানে, বেলুচ অবশ্য অতখানি ওয়াকিফহাল নয়। সে কাহিনী দীর্ঘ। বারান্তরে।
.
সেকাল একাল
ছেলেটা ডান হাত পেতে দিচ্ছে আর তার উপর পড়ছে সপাং করে লম্বা লিকলিকে কাঁটাওলা চাবুকের বাড়ি। অস্ফুট কণ্ঠে সে বলছে, বরায়ে খুদা আর এগিয়ে দিচ্ছে বা হাত। ফের চাবুকের ঘা। এবারে ছেলেটা বললে বরায়ে রসুল, এগিয়ে দিচ্ছে ডান হাত। করে করে চলত স্কুলবয়কে চাবুক মারা খাস কাবুল শহরে– একদা। ছেলেটা তসবি জপার মতো একবার বলে বরায়ে খুদা। পরের বার বলে বরায়ে রসুল বরায়ে খুদা বয়ে রসুল বরায়ে। অর্থাৎ আল্লার ওয়াস্তে (মাফ করে দিন) রসুলের ওয়াস্তে (মাফ করে দিন)। কিন্তু আমাদের মতো আর করব না, পণ্ডিতমশাই কিংবা কসম খাচ্ছি মৌলবি সাহেব, আমি তামাক খাইনি। আমি ঘুমুচ্ছিলাম, কে জানিনে হুজুর আমার হাত দিয়ে তামাক খেয়ে গিয়েছে এসব চেল্লাচেল্লি, বেকসুরির ফরিয়াদ, রেহাই পাওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় আমাদের মতে, আমাদের বাপ-দাদার মতো কাবুলি ছাত্র করে না। আমাদের বেকসুরির ফরিয়াদ আমরা করেছি আমাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী ছেলেবেলায়। কাবুলের স্কুলবয় তিফল-ই-মকতব করে তার ঐতিহ্যানুযায়ী। বরায়ে খুদা, বরায়ে রসুল ভিন্ন অন্য রা-টি কেড়েছ কি মরেছ। বেতের রেশন আরও দশ ঘা বেড়ে যাবে তৎক্ষণাতের দুলহমা আগেই–আজ ফৌরন দো লহমা পেশতার। কিন্তু হায়, ইতোমধ্যে ব্যাকরণে ভুল করে ফেলেছি, ধরতে পারেননি তো? তাইতেই তো আগা-ই-আগা সম্পাদক-চক্রের চক্রবর্তী আমার বেশুমার ভুলে ভর্তি লেখা বেদম ছাপিয়ে দিয়ে আমাকে নাচান, আপনাদেরও নাচান। বলুন, বুকে হাত রেখে বলুন, আপনারা কজন সম্পাদক সাবের চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমার অগুনতি গলৎ দেখিয়ে খাট্টা জবানে শাসিয়েছেন, আমার ধারাবাহিকের ধারা বন্ধ করতে? তা সে যাক গে। না করে ভালোই করেছেন।… হ্যাঁ, ভুলটা কী করলুম, সেই কথাই হচ্ছিল। বলে ফেলেছি রেশন বেড়ে যাবে। তা কখনও হয়? কি হিন্দুস্থান, কি পাকিস্তান, কি এই সোনার বাংলা কবে মশাই, কোন মুল্লুকে রেশন বাড়ে? রেশন কমতে দেখেছি, বাড়তে দেখেছে কে, কবে কোন রাঙ্গা শুক্কুরবারে, কোন হীরের বাংলায় সে তা হলে সাপের ঠ্যাং দেখেছে, অমাবস্যায় পূর্ণচন্দ্র দেখেছে।
.
বাস্তিনাদো
কিন্তু এ ধরনের বেত্রাঘাত কাবুলে ডাল-ভাত। দেখতেই যদি হয়, তবে দেখে নেবেন, বাস্তিনাদো। আমি কখনও দেখিনি, তবে হতভাগার গোংরানোটা শুনেছি, অতি অনিচ্ছায়।
আমাদের হোস্টেলে একজন আরেকজনের তলপেটের এক পাশে মাঝারি সাইজের একটা ছোরা ফাঁসিয়ে দেয়। প্রিন্সিপাল গয়রহ কোয়ার্টারে ছিলেন না। আমাকেই যেতে হল। যতদূর মনে পড়ছে, চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই হয়নি। বাগানে গাছতলায় ছেলেটাকে শুইয়ে রেখে তাকে ঘিরে রয়েছে কয়েকজন। তার মুখ হুবহু পচা মাছের পেটের মতো ঘিনঘিনে পাঙ্গাশ। একটা ছেলে কামিজ তুলে দেখল পেটপিঠ পেঁচিয়ে লালে লাল চওড়া ব্যান্ডেজ, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতুম না, কী জঘন্য নোংরা কাপড় ছিঁড়ে পট্টি বাধা হয়েছে। আরেকটা ছেলে বললে, নাড়িভুড়ি হড়হড়িয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, সে আর তার দোস্ত দু জনাতে চেপেচুপে কোনও-গতিকে ঢুকিয়ে দিয়ে পট্টি বেঁধেছে–বুঝলুম, এক গাদা মাল যেরকম ছোট সুটকেসে যেখানে যা খুশি ঢুকিয়ে ডালার উপর দাঁড়িয়ে একজন লাফায়, অন্যজন কজা বন্ধ করার চেষ্টা দেয়, তারই অনুকরণে কর্মটি সম্পন্ন করা হয়েছে। পট্টির উপর-নিচ দিয়ে ক্রমাগত রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে বেরুচ্ছে। আততায়ীকে একটা গাছের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়েছে।
