সে অদেখা লিপির অজানা বাণী কিন্তু সাত সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে বিশেষ করে ইরান আর তার সাকি পাকিস্তানে। নইলে মিস্টার আজিজ আহম্মদ অকস্মাৎ তার পূর্ব নীতি ত্যাগ করে বঙ্গ-প্রীতি দেখাতে আরম্ভ করলেন কেন? আমি তো শুনেছি, দুই পাকিস্তানে যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল তার জন্য কার্যত মি. আহমদই দায়ী। করাচি-পিণ্ডির নেতারা গোড়ার দিকে মরহুম পুব-পাকে কী পলিসি নেবেন স্বভাবতই সে সম্বন্ধে পাকাপাকি মনস্থির করতে পারছিলেন না। তাই কার্যক্ষেত্রে উপস্থিত সর্বাধিকারী আজিজই অনেক সময় কেন্দ্রীয় সরকারকে নীতি বাবদেও সদুপদেশ দিতেন– সে নীতি লৌহ-গোলক-নীতি। অবশ্য বর্তমান মি. আজিজ যদি প্রাক্তন চিফ সেক্রেটারি সেই আজিজই হন?- তবু ভালো, যার মারফতই একটা সমঝোতা হোক না কেন। দিল্লির এক বাদশাহ নাকি খারাপ জায়গা থেকে একটি সুন্দরী আনালে পর, উজির বিরক্তি প্রকাশ করেন। বাদশাহ বললেন, হালুয়া ভালো জিনিস, তা সে যে দোকান থেকেই আসুক না কেন– হালওয়া নিকু অস্ত, কে আজ হর দুকান বাশদ। এ স্থলে বলতে হবে, যেই নিয়ে আসুক না কেন।
.
লাইন অব রিট্রিট খোলা রাখো
তাই বলছিলুম সেই ভালো, সেই ভালো। আমরা চিরকালই শান্তি কামনা করেছি। তদুপরি ডানাকাটা পরী কে না ভালোবাসে? ডানাকাটা পরী পাকিস্তানকে কিয়ামততক দুশমনের নজরে দেখব, লায়লীকে মজনুর চোখে দেখব না, এমন কিরে কসম আমি কখনও গিলিনি– সাক্ষী এন্টালির মৌলা আলী। তবে কি না, অতীতের জাবর কেটে মনে ধোকা লেগে রয়, মুসলিম বেঙ্গল বুলি কপচানো আগাপাশতলা পালটে বাংলাদেশ নামক টেকি গিলতে পিণ্ডির ইয়ার-আজিজানের কতখানি সময় লাগবে? আপনারা যা ভাবতে চান, ভাবুন, আমার সন্দেহ-পিচে মন জানে, পিণ্ডির ইয়াররা অবশ্যই আরও বিস্তর ন্যাজ খেলাবেন। এতক্ষণে আলবৎ তেনাদের এডভোকেট জেনারেল, লীগের একসপারটগুষ্টি বসে গেছেন, চুক্তিটির ফস্কে গেরো, লুপ হোল, কোন শব্দে, কোন ফুলস্টপ সেমিকলোনে আছে, চুক্তিটায় সাদা কালিতে এমন কী সব লেখা আছে যাদের বদৌলতে তেনারা চটসে বেরিয়ে যাবেন খোলামাঠে, আর আমাদের বেলা দেখব, ফস্কে গেরো বক্স-বাধন, ফাঁসির গিটে টাইট হতে হতে কণ্ঠশ্বাস রুদ্ধপ্রায়। (এবং আমাদের উচিত, এই একই কর্মে লিপ্ত হওয়া। কোনও কোনও দেশ গোপনে বিদেশেও পাঠায়) তুলনায় এনে স্মরণ করাই, ইতোমধ্যে নিক্সন ক বার দিব্যি দিয়েছেন, আমার মনে নেই, সুপ্রিম কোর্ট ডেফিনিট রায় না দেওয়া পর্যন্ত তিনি টেপ-এর দলিল হাতছাড়া করবেন না, না, না। কিন্তু কুল্লে দুনিয়ার চেল্লাচেল্লি সত্ত্বেও ডেফিনিট বলতে তিনি কী বোঝেন, সে প্রশ্নটা সাফ ইনকার করে তিনি খামুশ! অথচ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ওই ডেফিনিট কথাটা এ-প্রসঙ্গে বিলকুল ফজুল, বেকার। সুপ্রিম কোর্ট কেন, আমাদের মহল্লার বেকুব ছোঁড়াটা ওই যে সেদিন তৃতীয় শ্রেণির শক্তিসম্পন্ন হাকিম হল, সেও তো কখনও ইনডেফিনিট এমন কোনও রায় দেয়নি, যার তেত্রিশটা অর্থ করা যায়। হয় জেলে যাও, নয় বাড়ি যাও–মাত্র দুটো অর্থওয়ালা ইনডেফিনিট রায়ও সে কখনও দেয়নি। ছোকরাকে শুধান গিয়ে, সে যখন ট্রেনিঙে ছিল, তখন তার শুরু তাদের বলেছেন কি, রায় দেবে ডেফিনিট, সে রায়ের বিসমিল্লাতে লাল কালি দিয়ে লিখবে, ডেফিনিট জাজমেন্ট অব হাকিম অমুক। সেটা হবে ভেজা জল বলার মতো। শুকনো জল আমি কখনও দেখিনি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে নিষ্কর্মা ডেফিনিট শব্দটা এস্তেমাল করা হয়েছে, রায়টা আখেরে বিপক্ষে গেলে নিষ্কর্মাটা কর্মে লাগাবার জন্য। একেই বলে আইনের ফাঁক, ল-এর লুপ-হোল। গুরু নিক্সন যে ভেল্কি দেখালেন, পিণ্ডি চেলারা কি গুরুমারা বিদ্যে দেখাতে কম যাবেন? এবং আমাদেরও এটা রপ্ত করা অতিশয় উচিত। চুক্তি ভাঙাবার জন্য নয়, যে ভাঙাতে চায়, তার মোকাবিলা করার তরে।
কিন্তু সরল পাঠক, এই পোড়াগুরুর ভা-ভাতে কান দিয়ো না। বরঞ্চ গান ধরো,
নিশিদিন ভরসা রাখিস
ওরে মন হবেই হবে।
.
পৌষ মাস কেবা কার
পাঠানের হাহাকার
অবতরণিকাটি হয়তো মেকদারমাফিক হল না।
কারণ, চিন্তাশীল পাঠক হয়তো ভাবছেন, নিরক্ষর পাঠান-বেলুচে এ-সব কথার মারপ্যাঁচ আইনের ফাঁকি ফক্কিকারির কী আর বোঝে? এমনতরো মারাত্মক ভুল করবেন না। পাঠানের বাচ্চা মায়ের গর্ভ থেকে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গেই শুনতে পায়, করারনামা, করারদাদ। ওদের কওমে কওমে হর-হামেশা লড়াইফসাদ এবং নিত্যি নিত্যে সলা-সুলেহ লেগেই আছে। করার-নামা, করার-দাদ দিয়ে হয় তার অতিশয় সাময়িক তকালীন এবং ক্ষণভঙ্গুর অস্ত্রসংবরণ, আর্মিস্টস। পিস ট্রিটি চিরন্তনী শান্তি এহেন আজগবি সমাস তারা কখনও শোনেনি। করার ভাঙতে চ্যাম্পিয়ন হিটলার রিবেট্রপ পাঠানের কাছে হেসে-খেলে দু দশ বছর তালিম নিতে পারেন– করার-দাদে দফে দ েচুক্তি নির্মাণ, লুপহোল রক্ষণ, এবং তার বদৌলত চুক্তিপত্র থেকে মান-ইজ্জত বাঁচিয়ে, সসম্ভমে, একতরফা নিষ্ক্রমণ, এ-সব বাবদে যাবতীয় ফন্দি-ফিকির, সন্ধি-সুড়ুকের সম্রাট পাঠান। খাস কাবুলে কেউ কখনও এপয়েন্টমেন্ট লেটার পায় না। পায়, চুক্তিপত্র (করার-দাদ)। বেশুমার কপি সবই করতে হবে আপনাকে আপনি পাবেন কুল্লে একখানা। সরকার চাপ দিতে চাইলে দশ খানা কপি বেরিয়ে আসবে এক লহমায়। আপনি চাপ দিতে চাইলে সরকারের তাবৎ কপি গায়েব গম্ভীর কণ্ঠে বলবে শুমা শুদ, গুম হয়ে গিয়েছে। তারও বড়ড়া, হয়তো বলবে কোনও করার-দাদ নেই, ছিলও না নিস্ত-ন-বুদ– যার থেকে বাংলা নাস্তানাবুদ কথাটা এসেছে। বিশেস না হয় চলন্তিকা খুলে দেখুন।
