বেলুচি ভাষা ও পাঠানের পশতো ভাষা দুই-ই প্রাচীন জেলে (জরথুস্ত্রীয় ইরানি ভাষা; এই ভাষায় ধর্মগ্রন্থ আবেস্তা রচিত বলে একে আবেস্তান বা আবেস্তাও বলা হয়) থেকে উৎপন্ন, বা বিবর্তিত, বলা যেতে পারে। প্রাগুক্ত সংগ্রামে বেলুচ ও পাঠান হেরে গিয়েও সম্পূর্ণ হারেনি। আড়াই হাজার বছর পরও তারা গৃহী বটে, যাযাবরও বটে, কিন্তু প্রতি বৎসর তাদের বৃহৎ অংশ উর্বর চারণভূমির সন্ধানে জরু-গরু, ভেড়া-খচ্চর নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, চীন কোনও দেশের কোনও সীমান্তের রত্তিভর পরোয়া তারা করে না। কারও ধড়ে দুটো মুণ্ডু নেই,- দাউদ, ভুট্টো, শাহ, কারওরই যে, ওদের কাছ থেকে পাসপোর্ট চাইবার হিম্মৎ-হেকমতি দেখাবেন। ওই অতি পুরাতন যাযাবর বৃত্তির সঙ্গে অতি অবশ্যই তারা বহু সনাতন লুণ্ঠন-ধর্মটি ন সিকে তোয়াজ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। বস্তুত ওইটেই তাদের প্রফেশন, চাষবাস নিতান্তই একটা নগণ্য হবি–স্ট্যাম্প কালেক্ট করার মতো। পাকিস্তানের শহুরে পাঠান-বেলুচ অটোনমি চায় না স্বাধীন হতে চায়– অতটা খবর নেবার মতো ফুরসত আমার নেই, অত এলেম আমার পেটেও ধরে না। কিন্তু প্রশ্ন, শহরের বাইরে যারা থাকে তারা কবে কোন রাজাকে খাজনা-ট্যাকসো দিয়েছে, শুনি। উল্টো তারা সাবসিডি পায়। খাইবারপাসের দু-পাশের পাঠানদের কারও বাচ্চা হলে প্রথম ছুট দেয় পেশাওয়ারবাগে। সেখানে নামটা পত্রপাঠ রেজিস্ট্রি করিয়ে নিয়ে তবে যায় ধীরে-সুস্থে মোল্লার বাড়িতে। তিনি ততোধিক আস্তে-ব্যস্তে একটা ভোলা নাম ঠিক করে দেন– কী যেন একখানা কেতাব থেকে, যদিও সুবে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বেলুচিস্তান, পাঠানিস্তান জানে, তিনি একবর্ণও পড়তে পারেন না, আলিফের নামে ঠ্যাঙা!
এরা আরও স্বাধীন হবে কী করে? গোল মার্বেল কি গোলতর করা যায়? স্বয়ং যিশুখ্রিস্ট বলেননি, লিলি ফুলটিকে রঙ মাখিয়ে আরও রঙিন করতে যায় কে?
আর যদি নিতান্তই কোনও পাঠানকে শুধোন, হে ইয়ার! পাকিস্তান-হিন্দুস্তান যদি তোমাদের নিয়ে লড়াই লাগায়, তবে তোমরা কোন পক্ষ নিয়ে লড়বে? তবে সে-পাঠান অনেকক্ষণ ধরে তার পাগড়ির ন্যাজটা দড়ি দলার মতো পাকাতে পাকাতে বলবে, আগা জান! দুটো কুকুর যদি একটা হাড়ি নিয়ে লড়ালড়ি লাগায়, হাড্ডিটা কি কোনও পক্ষ নিয়ে লড়ে?
.
ওয়াটারগেটের পানি সিন্ধুজল
ফারসিতে বলে, দের আয়েদ, দুরুস্ত আয়েদ দেরিতে যা আসে, দুরস্ত হয়ে আসে। দের–তেহরানের ফারসিতে দীর শব্দটা, ধীরে ধীরে অর্থও ধরে। ওয়াটারগেটের নোনাজল পিণ্ডিতে পৌঁছেছে ধীরে ধীরে। এমনিতেই বাংলায় বলে দেখি না, শ্রদ্ধের জল কদ্দূর অবধি গড়ায়–তাতে এসে জুটল গেট ভেঙে হুড়মুড়িয়ে ওয়াটারগেটের পানি, ওদিকে সিন্ধুতে বান জেগেছে। একেবারে খাজা তেরোস্পশশ (ত্র্যহস্পর্শ), মাইরি! বলবে সামবাজারি খাস কলকাত্তাই। সিন্ধুর এই বান বার বার সাত বার মোন-জো দড়োকে নাকানি-চুবানি খাওয়ালে র ওখানকার লোক তিতিবিরক্ত হয়ে জরু-গরু নিয়ে কেটে পড়ল, কিংবা হয়তো সাত বারের বার সাত হাত পানিমে ঘায়েল হল। কিন্তু এ আন্দাজটা বোধহয় ধোপের পানিতে টেকে না। চল্লিশ-তেতাল্লিশ বছর আগে মার্শাল সাহেব যখন বিরাট ডবল ইটের থান মার্কা ঢাউস তিন-ভলুমি মোন-জো দড়ো প্রকাশ করলেন তখন আর পাঁচজনের মতো আমিও পাণ্ডিত্য ফলাবার তরে তার উপর হদ্দমুদ্দ হয়ে আছড়ে পড়েছিলুম। মোন-জো আখেরে বানের জলে খতম হয়েছিল কি না, এ প্রশ্নটা তখন শুধোলে ভালোমন্দ, অন্তত এ-বাবদে লেটেসট থিয়োরি কী সেটা বলতে পারতুম; লেটেসটু বললুম এই কারণে যে, কেতাব বেরুবার আগে পত্র-পত্রিকায় সিন্ধুসভ্যতা নিয়ে এন্তের আলোচনা বাদ-প্রতিবাদ তো হয়েই ছিল, বেরোবার পর দুনিয়ার কুল্লে শুণী-জ্ঞানী তত্ত্ববিদ মাথায় গামছা বেঁধে লেগে গেলেন, হয় মার্শালকে ঘায়েল করতে, নয় তাঁকে আসমানে চড়াতে। সুচতুর পাঠককে বলে দেবার কোনও দরকার নেই, দুসরা দলেই বেশিরভাগ ছিলেন ইংরেজ। সে সময় আমার এক আইরিশ শুরু বলেছিলেন, সিলগুলোর উপর যে লিপি খোদাই করা আছে সেটা পড়তে না পারা পর্যন্ত চিত্তিরবিচিত্তির থিয়োরি গড়া বিলকুল বেকার হাওয়ার কোমরে রশি বাধার মতো। এর পর বৃদ্ধ শুরু তাঁর জীবনের শেষ দশ বৎসর কাটান লিপি পাঠের নিষ্ফল প্রচেষ্টাতে। সে কাহিনী আর কোনও সুবাদে না হয় বলব। কিন্তু সিন্ধুলিপির চেয়ে ঢের রগরগে লিপি ওয়াটারগেট মামলা নিয়ে মি. নিক্সন যে টেপ-লিপি যখের ধনের মতো জাবড়ে ধরে বসে আছেন। প্রকাশ পেলে সে লিপি কিন্তু অনায়াসে পড়তে পারবে, মার্কিন স্কুলবয় তক্। উঁহু, হল না। সন্দেহ-পিচেশ মার্কিন-অমার্কিন দুশমনজন বলছে, পড়তে পারবে বটে, কিন্তু কত লিপি কত পাষণ্ডই না ভেজাল ঢুকিয়ে মূল লিপি পয়মাল করেছে– যাকে শাস্ত্রীয় ভাষায় বলা হয়, প্রক্ষিপ্ত, ইন্টারপলেশন। নিক্সনই লিপিটি নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলবেন না, এমনতরো সাধু মহাশয় তো তিনি না-ও হতে পারেন। বস্তুত আখেরে যখন নিঃসন্দেহে ধরা পড়ল নিক্সনের সাঙ্গোপাঙ্গর প্রায় সব কটাই ফোর টুয়েনটি ফেরেব্বাজ, তথাপি, তখনও যারা তাঁর ব্যক্তিগত সতোর কেত্তন গেয়েই চলেছে তাদের উদ্দেশে এক বিদগ্ধ ঠোঁটকাটা মার্কিন নাগরী বলেন, একটা ঘাপটি মারা ব্রথেল-বাড়ি কাল যদি ধরা পড়ে, তবে বাড়িউলী অক্ষতযোনি কুমারী কন্যা হবে– এহেন দুরাশা কর না। তাই আফসোস, হে মুশকিলপানা মাসুদ রানা, এ গজব-মুসিবতের ওক্তে তুমি কোথায় ছিলিমে দম মেরে শিবনেত্র হয়ে হুরপরীর খোওয়াব দেখছ?
