সত্যিই তো। ৪৭-এ যখন ভারত সরকার তৈরি হল, তখন দেখা গেল যেসব আত্মোৎসর্গকারী নেতারা মন্ত্রী হলেন, যারা পার্লামেন্টের মেম্বার হলেন, তাঁদের বেশিরভাগই কলেজজীবন থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত কাটিয়েছেন জেলে জেলে। মাঝে-মিশেলে আম-কাঁঠালের ছুটিটা-আসটা পেয়েছেন বটে, কিংবা অতীব অকারণে হঠাৎ করে গাঁধী-বড়লাটে একটা ফয়সালা হয়ে যাওয়ার বরকতে এবং ওই সুবাদে জেলগুলোর চুনকাম-মেরামতি, তদুপরি জেল-সাম্রাজ্যের ইনসপেক্টর জেনারেল গোরা রায়দের বহুদিনের প্রাপ্য হোম যাওয়ার মুলতুবি ফার্ণো ছুটি যখন আর কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যায় না, এহেন ত্র্যহস্পর্শ উপলক্ষে তাঁদেরও কিছুদিনের তরে নেটিভ হোম দেখার জন্য মহামান্য সম্রাটের রাজসিক অতিথিশালা থেকে ঝেটিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে– এ-সত্যটাও অস্বীকার করা যায় না। ততোধিক অস্বীকার করা যায় না, কেউ বেরিয়েছেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, কেউ ডিগ্রিহীন জ্বর-যক্ষ্মা নিয়ে, কেউ-বা স্ট্রেচারে শুয়ে শুয়ে বাড়ি এসেছেন, যাতে করে তার হাড্ডিগুলো বাপ-পিতেমোর হাড্ডির সঙ্গে সম্মিলিত হয় : সরকারি ইংরেজিতে বলা হয় যাতে করে হিজ বোনস আর গ্যাদার্ড আনটু হিজ ফোর-ফাদার্স, অথবা একই শোনে পিতৃপুরুষের ভস্মের সঙ্গে তাঁর ভস্ম মিলিত হবে বলে।
সুস্থই হোন আর নিম-মরাই হোন, ওই চন্দরোজের ফুরসতে তারা যে মার্শাল মার্কস কেইনস লাকি পড়ে বিদ্যাদিগগজ পণ্ডিত হয়ে যাবেন কিংবা দেশের বাজেট কীভাবে চৌকস ব্যালানস করে বানাতে হয়, অথবা নামকে-ওয়াস্তে যেসব এসেমব্লির তখনও সেশন হচ্ছে, সেগুলো নিত্যদিন এটেন্ড করে তর্কাতর্কি, নন-কনফিডেনসের ঘোল খাওয়ানোর কায়দা-কেতা রপ্ত করে নেবেন এমনতরো দুরাশা করা যায় না।
আমার পাপ-মন থেকে কেমন যেন একটা বেয়াদব সন্দেহ কিছুতেই দূর হতে চায় না, মহাত্মা গাঁধী তাই বোধহয়, স্বরাজ লাভের পর সভয়ে পার্লামেন্টের ছায়াটি পর্যন্ত মাড়াননি। হিন্দু মহাসভার হামলাতে কুপোকাৎ হয়ে যেতেন না তিনি? আপনারা বলবেন, ক্যান? বারিসডরিডা তেনার পাস করা আছিল না? হঃ! খুব আছিল! কলকাতা পার্কে বিলিতি কাপড় পোড়ানোর জন্য যখন একদিন আসামি হয়ে দাঁড়ালেন, ততদিনে বেবাক ব্যারিস্টারি বিদ্যে কর্পূর হয়ে উবে গিয়েছে– হাওয়ায় হাওয়ায়! সঠিক মনে নেই, কাকে উকিল পাকড়ে ছিলেন। আমাদের চাটগায়ের সেনগুপ্তকে? তিনি তখন জেলে না বাইরে, তা-ও ভুলে গিয়েছি। বাইরে থাকলে তাকেই ধরা উচিত ছিল। তাই বলছিলুম, আইনের এলেম যদি তার পেটে এক দানাও থাকত তবে কি তিনি নিদেন একটা ডেপুটি মিনিস্টারও হতে পারতেন না। পক্ষান্তরে স্মরণে আনুন, গাঁধী যে রকম পার্লামেন্টের মুখদর্শন করেননি, লেট ব্যারিস্টার জিন্নাও হুবহু তেমনি জেলের মুখ দর্শন করেননি। তিনি কাইদ-ই আজম, সদর-ই-পাকিস্তান হবেন না, তো হবে কে? গাঁধী?
এই জেলের কথা যখন নিতান্ত উঠলই তখন রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ল। তিনি তো কোনও প্রকারের দেশ-সেবা করেননি, কোনও প্রকারের বাণী রেখে যাননি, তাই বলছি। রবীন্দ্রনাথ যখনই খবর পেতেন তার কোনও প্রাক্তন ছাত্র, কোনও ছাত্র বা শিক্ষকের আত্মীয় ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে জেল থেকে বেরিয়েছে বা তার কোনও পরিচিত রুগণ যুবার পিছনে পুলিশ বড্ডবেশি তাড়া লাগাচ্ছে, সে ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন তাকে ডেকে পাঠিয়ে বলতেন, এখানে থাক। শরীরটা সারিয়ে নে। লাইব্রেরি রয়েছে। পড়াশোনা কর। যদি তার মনে হত, পুলিশ নাছোড়বান্দা, তা হলে টেগার্টকে জানিয়ে দিতেন, আমার এখানে অমুক এসেছে, রুগ্ণ শরীর সারাতে। আমি কথা দিচ্ছি, সে যতদিন এখানে আছে, অ্যাকটিভ পলিটিকস করবে না। কেন জানিনে, টেগার্ট কবির কথা শুনতেন এবং আরেকটি ঘটনার কথা আমি ভালো করে জানি। রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ এক যুবা, এ-দেশে ক্যুনিজমের উদয়-কালে সে মতবাদের অত্যুৎসাহী সমর্থক ও প্রচারক হয়ে যায়। টেগার্ট যে কোনও কারণেই হোক, তাঁকে ধরতে চাননি। কবিকে জানান, অমুককে বলুন না, সে মস্কো চলে যাক। কম্যুনিজম স্বচক্ষে দেখে আসুক। আমি তাকে পাসপোর্ট দেব। হয়তো টেগার্ট ভেবেছিলেন, দূর থেকে অনেক জিনিসই সুন্দর দেখায়, কবি বায়রনের ভাষায়,
সে যেন জীর্ণ প্রাসাদ ঘেরিয়া
শ্যামা লতিকার শোভা,
নিকটে ধূসর জর্জর অতি
দূর হতে মনোলোভা।
যুবার সঙ্গে আমার বার্লিনে দেখা হয়। টেগার্টের আশা আধাআধি সফল হয়েছিল। ভদ্রলোক তখন স্তালিনের নাম শুনলে ক্ষেপে যেতেন। মস্কো থেকে সদ্য ফিরে এসেছেন। তাঁর মতবাদ হয় স্তালিনের পছন্দ হয়নি কিংবা অন্য যে কোনও কারণেই হোক, তাকে রাশা ছেড়ে বার্লিন চলে আসতে হয়। কিন্তু মার্কসিজমে দৃঢ়তর বিশ্বাস এবং আস্থা নিয়ে তিনি কম্যুনিজমের জন্মভূমি ত্যাগ করেছিলেন।
.
পলিটিকস-হীন ছাত্রসমাজ?
কল্পনাও করা যায় না, কি গুমোট গরমে এই ঢাকায়, কি কাবুলের মোলায়েম ঠাণ্ডায়– আজকের দিনে।
গুন গুন করছি,
রজনী নিদ্রাহীন
দীর্ঘদগ্ধ দিন,
আরাম নাহি যে জানে।
ভয় নাহি ভয় নাহি,
গগনে রয়েছি চাহি
জানি ঝঞ্ঝার বেশে
দিবে দেখা তুমি এসে
একদা তাপিত প্রাণে ॥
রাত দুটো বাজতে চলল। আল্লা মেহেরবান। ঝঞ্ঝা থাক মাথায়। ঝঞ্ঝার শুরু সাইক্লোনের কৃপায় এ-দেশটা যায়-যায়। মোলায়েম ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। বুড়িগঙ্গা ছাড়িয়ে, বাংলাদেশ রাইফেলসের বিরাট মাঠ পেরিয়ে, চাঁদমারি টিলাটার বেণুবনের ভিতর দিয়ে। কিন্তু হায়, কোথায় সে বেণুবন– দেড় বছর আগেও যা ছিল? টিলাটার নিচ দিয়ে বারো মাস বয়ে যায় ক্ষীণ জলধারা, কচুরিপানা ঠেলে ঠেলে এগোয়, ছোট্ট নালা বেয়ে সাত-মসজিদ-রাস্তার দিকে। আর বর্ষায় তার কী দাপট! এই এখন মৃদু পবনে আকাশ-ছোঁয়া বাঁশ দুলে দুলে এ ওর গায়ে পড়ে মৃদু মর্মর গানে মর্মের বাণী শোনাত, কানে কানে, কত গোপন গানে গানে। আর বর্ষার আকাশ-বাতাসের দাপটের সময় দেখেছি, অরণ্য হতাশ প্রাণে, আকাশে ললাট হানে– শহিদের মাতারা যেন আকাশে মাথা কুটছে, বিরাম না মেনে চলছে তাদের ক্রন্দন!
