সে বেণুবন দেড় বছরে আজ প্রায় নিঃশেষ। যে পারে, যার ইচ্ছে কেটে নিয়ে গেল প্রথম দীর্ঘাঙ্গীদের। এমন কচি বাঁশগুলো যখন কাটে, তখন আমি দু কানে আঙ্গুল গুঁজে দাঁতে দাঁত কাটি। হাউসমানের কবিতায় পড়েছিলুম, হতভাগার ফাঁসি হবে পরের দিন ভোরে। নিরেট অন্ধকারে চোখ মেলে সমস্ত রাত ধরে শুনছে, খট খট শব্দ। বাইরে ফাঁসিকাঠ তৈরি করছে মিস্ত্রিরা– তারই পেরেক ঠোকার খট খট আওয়াজ রাতভর। ওই কাঠেই সে ঝুলবে; ঘাড়ে দড়ি বেঁধে দেবে ফাঁসুড়ে। হাউসমান কবিতা শেষ করেছেন এই বলে, যে ঘাড় খুদাতালা তৈরি করেছিলেন অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে… মট করে মটকাবার জন্য না।
শেষ বাঁশ কাটা হয়ে গেলে আমিও শান্তি পাব। কিন্তু মরবে আরেক জন। যে-টিলাটার উপর চাঁদমারির পাঁচিল, সেটা নালার সম্বৎসর বয়ে যাওয়া পানিতে, বিশেষ করে বর্ষার প্রবল আঘাতে যেন ক্ষয়ে গিয়ে ধস নেমে পাচিলটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে না পড়ে, তাই টিলাটার সানুদেশ, নালার কিনারা অবধি সমস্তটা ছেয়ে বাঁশ লাগিয়েছিলেন সেই দূরদর্শী গুণী যিনি চাঁদমারির পুরো প্ল্যানটা তৈরি করেছিলেন তিনি বাঙালি। আমার মতো মূর্খও বাঁশবনের তত্ত্বটা বুঝতে পারে। এখন অন্ধকার–কৃষ্ণা দশমী; বলতে পারব না, আর কটা কচি বাচ্চা বাঁশ অবশিষ্ট আছে। দিনের আলোতে গুনতে দেড় আঙ্গুলের বেশি লাগবে না।… লোকে বলে, যাক না কেন জোয়ার জলে। খাক না কেন বাঘে। কোন অভাগা জাগে। আমার তাতে কী ভাঙবে ব্যাটা পাঁচিলটা।
ছাত্ররা বলেন, পেশাদারি পলিটিশিয়ান দেশের কথা যত না ভাবে, নিজের স্বার্থের কথা ভাবে ঢের ঢের বেশি (নিউগেটের পর কে অস্বীকার করবে এ তত্ত্বটা?)। আমরা এখনও সংসারে জড়িয়ে পড়িনি। আমরা কপট হব না, চট করে। পারলে দু চার জন করাপট প্রফেশনালদের ঠ্যাঙ্গাতেও আমাদের বাধবে না। কথাটার মধ্যে ও বাইরে গভীর জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস স্বপ্রকাশ। প্রাচ্যের পলিটিকসে করাপশন বেশি বলেই এ ভূখণ্ডে প্রথম ছাত্র আন্দোলন আরম্ভ হয়। কাবুল পর্যন্ত পৌঁছতে একটুখানি সময় লেগেছে। বছর দশেক পূর্বে কাবুল পার্লামেন্টে বোর্কাহীন, অবগুণ্ঠিতা একজন মহিলা সদস্যা লেকচার দিতে উঠলে, প্রাচীন-পন্থি কট্টর আরেক সদস্য ছুটে গিয়ে, তাকে আক্রমণ করে, তার জামা-কাপড় ছিঁড়তে আরম্ভ করে। নিরুপায় হয়ে তিনি পার্লামেন্টগৃহ ত্যাগ করে প্রাণপণে ছুটে গিয়ে একটা হোস্টেলে ঢোকেন।
ছাত্ররা তাকে আশ্রয় দেয়। খবর পেলুম এবারে তারা খোলা ময়দানে নেমেছে। তাদের ভিতর মাও, মস্কো, র্যাডিকাল তিন দলই আছে। ভাবছি, সিরিজের শিরোনামটা পাল্টাব কি না।
***
মোন-জো দড়োর বংশধর দড় বেলুচ
মৃত, ইংরেজি মর্টেল মার্ডার, ফরাসি মর, জর্মন মর্ড, ফারসি মুর (দন), গ্রিক ব্রতস-ইন্ডো-ইউরোপিয়ান সর্ব ভাষাতেই মরা অর্থে সংস্কৃত মৃ = মরা পাওয়া যায়। বর্তমান দিনে উত্তর ভারতের সব ভাষাতেই ওই মৃ পাওয়া যায়, বাংলায় মরা, হিন্দিতে মরণা ইত্যাদি ইত্যাদি।
সিন্ধিতেও ওই মো দিয়েই মর মানুষের সর্বশেষ ইচ্ছা-অনিচ্ছাকৃত কর্মটি প্রকাশ করা হয়। এই মো-এর সঙ্গে ন যোগ দিয়ে মৃত শব্দের বহুবচন নির্মাণ করা হয় : ফলে সিন্ধিতে মোন শব্দের অর্থ মৃতরা। উচ্চারণ করার সময় সিন্ধিরা আমাদের মতো মোন বা মন-এর মতো করেন না। আমরা, পূর্ব বাংলায় যে রকম মেঠাই মোহনভোগ উচ্চারণ করার সময় মোহন শব্দের হটি অ-এ পরিণত করে মোটা আরেকটু লম্বা করে দিই, সিন্ধিরাও ঠিক তেমনি উচ্চারণ করেন, যেন শব্দটা মোঅন। বাংলায় আমরা যে রকম বড়র পীরিতি বালির বাঁধ বাক্যটিতে বড়লোকদের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পীরিতির সম্পর্ক বোঝাবার জন্য র অক্ষর যোগ দিই, কিংবা ইংরেজিতে ফুলস প্যারাডাইজ- আহাম্মুকের স্বর্গ, ডগস টেল- কুকুরের ল্যাজ বাক্যে এপসট্রফি এবং এস অক্ষর যোগ করি, হিন্দুস্তানিতে রহমতকা বেটারহমতের ছেলে বাক্যে কা জুড়ি, সিন্ধিরা তেমনি মৃতদের টিলা আপন ভাষাতে লেখেন মোন-জো দড়ো, উচ্চারণ করেন প্রাগুক্ত পদ্ধতিতে–মোঅন (কিন্তু মো আর অ-এর মাঝখানে আরবির হামজার মতো সামান্য আমরা একটুখানি থেমে যাই, সেটা করা হবে না, মা-র ও-কারটা শুধু দীর্ঘতর করতে হবে) জো দড়ো।
প্রাচীন সিন্ধু-সভ্যতার ভগ্নস্তূপ স্থলে আছে, তার আশপাশের আধুনিক জনগণের মধ্যে একটা বহুদিনকার কিংবদন্তি প্রচলিত ছিল, ওই টিলার নিচে বিস্তর মৃতজন রয়েছে। সঠিক কিন্তু তড়িঘড়ি অনুমান করে বসবেন না যে ওই (লারকানা) অঞ্চলের জনপদবাসী সিন্ধুর চার-পাঁচ হাজার বৎসরের মৃত, পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম সভ্যতার স্মরণে টিলা অঞ্চলের নাম দিয়েছিল মোন-জো দড়ো। বস্তৃত তাদের ধারণা ছিল, একদা ওখানে প্রাচীন বৌদ্ধদের বিহার-ভূমি ছিল।
আমি লোকমুখে যা শুনেছি সে অনুযায়ী পরলোকগত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এই টিলাটি প্রথম দেখেন, তখন এটাকে কোনও বৌদ্ধস্তূপের ভগ্নাবশেষ বলেই ধরে নিয়েছিলেন, কারণ হিউয়েন সাং তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর সময়ে সিন্ধু দেশের রাজা যদিও হিন্দু ছিলেন, তবু সে দেশে যথেষ্ট বৌদ্ধবিহার সঙ্ঘারাম আছে। যতদূর মনে পড়ে, রাখালদাস টিলা খোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম পান বৌদ্ধ-নিদর্শন, আরও গভীরে যাওয়ার পর বেরুল এমন সব বস্তু, যা রাখালদাসের মতো সুপণ্ডিত প্রত্নতাত্ত্বিক পৃথিবীর কোনও যাদুঘরে বা তার দর্শনীয় বস্তুর ছবিতে দেখেননি। অর্বাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক হলে হয়তো এগুলো অবহেলা করত, এবং চিরতরে না হলেও বিশ্বজন হয়তো বহু শতাব্দী অপেক্ষা করার পর এ সভ্যতার সন্ধান পেত। রাখালদাস প্রথম দর্শনেই বুঝতে পেরেছিলেন এর অনন্যতা ও নিশ্চয়ই ইউরেকা হুঙ্কার রব ছেড়েছিলেন।
