মসিয়ো কুলোঁদ্র স্থিরদৃষ্টিতে রিবেট্রপের দিকে তাকিয়ে দুটিমাত্র শব্দ বললেন, লিস্তোয়ার জুজরা– বিচারিবে ইতিহাস। বৃথা বাক্য। ইতিহাসই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ বিচারক।
প্রথম দর্শনের মাথা নিচু করে বাও করা থেকে মাষা পরিমাণ কমিয়ে পুনরায় বাও করার আভাসটুকু ছুঁইয়ে কুলোদ্র ধীর পদক্ষেপে গ্ৰস্থান করলেন। ব্যস। ইরানি জবানে বলে, অতঃপর আলোচনার গালিচাখানি গুটিয়ে গুটিয়ে রোল করে বোন্দা পাকিয়ে ঘরের এককোণে দাঁড় করিয়ে রাখা হল।
এ ধরনের ঘোষণার শেষে প্রথম পাঠেই, উভয় দেশের ইলচির স্বদেশ প্রত্যাগমন ব্যবস্থাদি সম্বন্ধে দু-একটি নিতান্তই প্রতি পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয় ফরমুলা থাকে। আমার টায়-টায় মনে নেই। এ দুনিয়ায় নাতিহ্রস্ব জিন্দেগির চন্দ বরাজের মুসাফিরিতে এ-তাবৎ তোকে আমি দেখে নেব চারটি মাত্র শব্দ বলে কাউকে নিরস্ত্র কথা-কাটাকাটির নির্জলা যোঝাযুঝিতেও দাওয়াত জানাতে এ ভীরু আদার ব্যাপারি ধারকর্জ করেও হিম্মঠুকু জোগাড় করতে পারেনি সে রাখবে মানওয়ারি জাহাজের খবর!
.
কাবুলি কায়দা
বেলুচিস্তানে কয়েকজন হোমরাচোমরাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তা তারা যতই গেরেমভারি হন না কেন, তাই নিয়ে আফগানিস্তান হিটলারি হেকমতে তুলকালাম কাণ্ড করবে অর্থাৎ সেটাকে আন্তর্জাতিক আইনে যাকে বলে কাজুস বেল্লি- ওয়ার কজ, যুদ্ধ ঘোষণার জন্য যথেষ্ট কারণ এ কথা বলবে না। অবশ্য আমাদের সকলেরই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে খুন-জখমের মতো মারাত্মক ব্যাপারের মূল কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রায়ই শেষটায় দেখি, অতি তুচ্ছ কারণে বিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল। বড় বড় যুদ্ধের পিছনে আকছারই দেখা গেছে, যে কারণে আখেরে লড়াই শুরু হয় সেটা কোনও কারণই নয়, ইতিহাস বার বার সে সাক্ষ্য দেয়। উপস্থিত আফগান পক্ষ কীভাবে তাঁদের বক্তব্য, আপত্তি, প্রতিবাদ, শাসানো যেটাই হোক পেশ করবেন বা চোখ রাঙাবেন তার ওপর আখেরি নতিজা অনেকখানি নির্ভর করছে। আমরা তাই একাধিক কাল্পনিক ছবি আঁকতে পারি মাত্র;
আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বয়ং সরদার দাউদ বা তাঁর প্রতিনিধি : বেলুচিস্তানে এসব কী হচ্ছে?
মি. ভুট্টোর নির্দেশ অনুযায়ী পাক রাষ্ট্রদূত (যদি মোলায়েম হওয়ার নির্দেশ থাকে) হেঁ হেঁ হেঁ! কিছু না, কিচ্ছুটি না। (যদি গরম নির্দেশ থাকে) তোমার তাতে কী ভেটকি-লোচন?
আফগান পক্ষ : বটে! আমার তাতে কী? এসব জুলুম চলবে না। দেশ শান্ত করো।
পাক পক্ষ : ওটা আমার ঘরোয়া ব্যাপার। এই ঘরোয়া-ব্যাপারের জিগির গেয়ে গেয়ে পাকিস্তানের গলায় কড়া পড়ে গেছে।
আ প : নিতান্তই আন্তর্জাতিক, দ্বি-রাষ্ট্রীয় ব্যাপার এটা। দেশের লোককে বেধড়ক ঠ্যাঙ্গাবে, তারা শুধু বেলুচ নয়, পাঠানও বিস্তর, তারা সীমান্ত পেরিয়ে আমার দেশে ঝামেলা লাগাচ্ছে, এদেশের পাঠানকে তোমার দেশের পাঠান দিবারাত্তির তাতাচ্ছে, তোমার সঙ্গে লড়াই দিতে।
পা প : তোমার দেশ তুমি সামলাও।
আ প : ইন্ডিয়ার ঘাড়ে একবার লক্ষ লক্ষ বাঙালি চাপিয়ে যে আক্কেল সেলামিটা দিলে তার পরও তোমার হুঁশ হল না?
পা প; কেন, খারাপটা কী হল? ইয়াহিয়া গেছে, বেশ হয়েছে। আমরা নরুন দিয়ে হাঁড়ি পেলুম তাক ডুমাডুম ডুম। আমরা ইয়াহিয়া দিয়ে ভুট্টো পেলুম, তাক ডুমাডুম ডুম। জ্ঞানে লুকমান, বিচারে সুলেমান, বুদ্ধিতে
আ প : (বাধা দিয়ে) সুলেমান শব্দের সঙ্গে মিল একটা বিশেষ জনের আছে, কিন্তু
পা প : (বাধা না মেনে)
সুধা পানে এজিদ শা।
জঙ্গি লড়ায়ে কামাল পাশা ॥
ফলসফাতে আফলাতুন—
অকস্মাৎ দৌবারিকের প্রবেশ। হন্তদন্ত হয়ে বললে, বাঙ্গালা দেশ, না কী যেন নাম, সেখান থেকে কিছু লোক সেঁদরি, না কী যেন লকড়ি, না লাঠি নিয়ে এসেছে।
আ প : কী তাজ্জব! পাকিস্তানের লোকটা গেল কোথায়?
.
ঘরে বাইরে, জেলে বাইরে
বিংশ শতাব্দীর যে একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিবর্তন দেশের শিক্ষাদীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একদা চিন্তিত করে তোলে এবং আজ যেটা নিতান্ত বুড়ো-হাবড়া ছাড়া আর-সবাই অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়, সেটা ছাত্রদের রাজনীতিতে যোগ দেওয়া নিয়ে। আজ যদি ঢাকাতে কোনও একটা ঘটনা সর্বসাধারণের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং পরদিন তারই ফলে দেখা যায়, আপিস-আদালত-দোকানপাট বন্ধ, বেতার কথা কয় না, কাগজওয়ালা কাগজ দেয়নি আর রাস্তায় রাস্তায় বিরাট বিরাট মিছিল কুল্লে শহরটাকে গিলে ফেলল, শুধু শুধু কোনও মিছিলে একটিমাত্র ছাত্র সরি- ছাত্রীছাত্র নেই, তবে আপনার-আমার মন কী ধরনের ঝাঁকুনি, বরঞ্চ বলা উচিত, কী ধরনের বিজলির শক খাবে সেটা কল্পনা করতে পারেন কি? কারণ শুধিয়ে যদি শুনতে পান, ছাত্র-ছাত্রীরা বাড়িতে হোস্টেলে দোরে খিল দিয়ে পাঠ্যবই পড়ছে এবং বলছে, প্রসেসনে যোগ দিলে লেখা-পড়া করব কখন? তোমরা মিছিল করে গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, জুন্তাতন্ত্র, যে ঢপের গবরনমেন্টই কায়েম কর না কেন, দু দিন বাদে সেটা চালাবার জন্য আমরাই তো হব মন্ত্রী, সেক্রেটারি, পার্লামেন্টের মেম্বার, ডাক্তার, উকিল, ইঞ্জিনিয়ার। এখন যদি রাজনীতি, অর্থনীতি, এডমিনিসট্রেশন গয়রহ ভালো করে না শিখি, তবে সরকারের রূপটা পাল্টে কিই-বা এমন পাকা ধান ঘরে তুলবে তোমরা?
