সচরাচর কাবুলে এগানা-বেগানা কেউ এলেই উচ্চকণ্ঠে সংবর্ধনা জানানো হয়, আসুন, আসুন, আসতে আজ্ঞা হোক–ব-ফরমাইদ, তশরিফ আনয়ন করুন–তশরিফ বিয়ারিদ, আপনার কদম মবারক হোক– কদম তান মুবারক, আপনার চশম রৌশন হোক– চশমে তান রওশন। সম্পূর্ণ পাঠটি বেহদ রাজ পত্রিকায় গুনজাইশ নেহায়েত তঙ্গ। আমি মজবুর হয়ে মুখতসরে কাবুলের সিভিল প্রটোকলটি সেরে নিলুম।
কিন্তু এস্থলে কার্যকরী হবে, ডিপ্লোম্যাটিক অর্থাৎ কূটনৈতিক কিংবা, রাজদূত সমাগম-সুলভ রাজসিক প্রটোকল। সে প্রটোকল বহুরূপী। যেমন ধরুন একটি সুপরিচিত নজির : বার্লিনস্থ ফরাসি রাজদূত কুলোদ্র পূর্বাহে এত্তেলা দিয়ে গিয়েছেন জর্মন ফরেন অফিসে জর্মন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোখিম ফন রিবেট্রপকে স্বহস্তে একটি মহামূল্যবান রাজপত্র সমর্পণ করতে। রিবেট্রপ কেন, ফরেন অফিসের নগণ্য ফুট-ফরমাইশের ছ্যামড়াডাতক জানে সে দলিলটি কী।
বিঘোষক দৌবারিক দ্বার উন্মোচন করে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিবে, হিজ এক-সেলেনসি সম্মানিত ফরাসি রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ অধিকারাধার (প্লেনিপোটেনশিয়ারি) রাষ্ট্রদূত সর্বোচ্চ সম্মানাধিপতি মসিয়ো কুলোদ্র! গৃহমধ্যে উচ্চাসনে বসে আছেন একদিকে ফন রিবেট্রপ। সম্মুখে বি-টিম ফুটবল খেলার মতো বৃহৎ টেবিল। অন্যদিকে অভ্যাগতের জন্য একখানা নাতি উচ্চাসন। কুলোদ্র অন্যদিনের মতো ফরাসি ভাষায় বুজুর বা জর্মনে শুটন টাখ বলবেন না। যে চেয়ারে বসার কথা, সেটাকে উপেক্ষা করে ঋজু কঠিন মেরুদণ্ড টান টান করে খাড়া দাঁড়িয়ে সুদ্ধমাত্র গ্রীবাটি ক্ষণতরে পোয়াটাক ইঞ্চি নিচু করে বাও করবেন। রিবেট্রপও উঠে দাঁড়িয়ে সম-মেকদারে বাও করবেন, মেহমানকে অন্যদিনের মতো আসন গ্রহণ করতে অনুরোধ জানাবেন না বা হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়াবেন না। বলা বাহুল্য, দু জনারই মুখমণ্ডল দেখে মনে হবে দু জনারই দারুণ কোষ্ঠকাঠিন্য।
আমি একটি প্রকৃত ঘটনারই বিবরণ দিচ্ছি। এটা ঘটেছিল ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯-এ। তার আগে আরেকটা ঘটনার উল্লেখ করে নিই। আজ ২২ আগস্ট। চৌত্রিশ বৎসর পূর্বে ঠিক গতকাল আমাদের প্রাগুক্ত রিবেট্রপ গিয়েছিলেন মস্কো। সেখানে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল এমনই সম্মান, যেটা রাজার রাজার কপালেও কালেকস্মিনে লেখা থাকে। রিবেট্রপ তার প্রভু হিটলারের হয়ে স্তালিনের সঙ্গে বিশ্বসংসারের অপ্রত্যাশিত অকল্পনীয় এক মৈত্রীচুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর স্তালিন চেঁচিয়ে উঠলেন, প গালে, প গালে– গেলাশ গেলাশ। সঙ্গে সঙ্গে জনা ছয় কমরেড হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। সমবেত কমরেডদের জন্য সেই জার আমলের ফেনসি গেলাশ, আর ইহলোকের সর্বশ্রেষ্ঠ শ্যামপেন। ফটাফট বোতলের কর্ক লক্ষ মেরে ঠোক্কর দেয় ছাতে। শ্যামপেন বইতে লাগল যেন, জাহ্নবী-যমুনা, বিগলিত করুণা, নাহি তার তুলনা। স্তালিন মদ খেতে পারতেন জালা জালা! আর-সব কমরেড টেবিলের তলায় বেহেড মাতাল হয়ে অচৈতন্য হওয়ার পরও স্তালিন একা একা চালিয়ে যেতে পারতেন আরেক পাল শুষ্ক-কণ্ঠ নয়া কমরেড না আসা পর্যন্ত। তাদের অবস্থাও হত তদ্বৎ। হিটলার ছিলেন। নিরামিষভোজী, মদ্যে বিরাগ। অথচ তার দোস্ত ছিলেন পাড় পিনেওলা, ফটোগ্রাফার হফমান। তাঁকে রিবেট্রপের সঙ্গে পাঠিয়েছেন, মৈত্রী-পরবের ছবি তুলতে, আর স্তালিনের সঙ্গে সুধাপানে পাল্লা দিতে। হফমানই সে জলসার রসময় উভয়ার্থে সরেস বর্ণনা দিয়েছেন, হিটলার গত হওয়ার পর তাঁর কেতাবে হিটলার ছিলেন আমার দোস্ত। এটা হল সৌজন্যের প্রটোকল সুধাপান ম্যাচ ও সেই প্রটোকল অনুযায়ী ড্র যায়।
সে সন্ধ্যায় হিটলার তার সাঙ্গোপাঙ্গসহ জর্মনিতে পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আকাশে উত্তরের আলো দেখছিলেন। নৈসর্গিক এই সূর্যরশ্মি মাঝেসাঝে দেখা যায়। হিটলারের অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণের মন্ত্রী স্পের (যুদ্ধ চালনার অপরাধে কুড়ি বৎসর জেল খেটে বেরুবার পর) তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ স্মৃতিচারণ গ্রন্থে লিখেছেন, সমস্ত আকাশ টকটকে লালে লাল হয়ে গিয়েছে, আমাদের হাত-মুখ যেন সে লালের ছোপে লাল হয়ে গিয়েছে। লালের সেই লীলা-খেলায় আমাদের মন যেন অদ্ভুত এক চিন্তায় নিমজ্জিত। হঠাৎ হিটলার তার অন্যতম মিলিটারি অ্যাডজুটেন্টের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, গাদা গাদা রক্তের মতো দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এবারে বিনা রক্তপাতে আমরা সফল হব না।
আমার এক বোন এবং সিলেটের আরও কে একজন বলছিলেন, তারা ১৯৭১-এর ২৫ মার্চে রক্তে রাঙা অস্বাভাবিক টকটকে লাল সূর্যাস্ত দেখেছিলেন। এদের দু জনাই অতিশয় ধর্মনিষ্ঠ, সর্ব কুসংস্কার বর্জিত। তবু নাকি তাদের মনে এক অজানা অস্বস্তি অনেকক্ষণ ধরে জেগে রয়েছিল।
.
হিটলারি হেকমত
যাক সে-কথা। খুব একটা দূরে চলে আসিনি। আর সামনেই ৩ সেপ্টেম্বর। কুলোদ্র-রিবেট্রপ দু জনাই যেন আজন্ম মূক বধির– এতক্ষণ অবধি। অতঃপর কুলোদ্র প্রতিটি শব্দ যেন হরফ গুনে গুনে পড়ে গেলেন জর্মনির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের যুদ্ধ-ঘোষণা। ঘোষণান্তে এস্থলে রিবেট্রপ ত্রিবিধ পন্থার যে কোনও একটা বেছে নিতে পারেন। নীরবে ঘোষণাপত্র গ্রহণ করতে পারেন, কিংবা বলতে পারেন তিনি এ ঘোষণা আন্তর্জাতিক বিধিবিধান-বিরোধী বে-আইনিরূপে গণ্য করে ঘোষণাটা রিজেক্ট করছেন, কিংবা ঘোষণা সম্বন্ধে আপন মন্তব্য প্রকাশ করতে পারেন। রিবেনট্রপ কষায় বদনে, প্রকৃতিদত্ত তাঁর বেতমিজ কণ্ঠে অতি দীর্ঘ এক বিবৃতি পড়ে যেতে লাগলেন– অবশ্য দুই পালোয়ানই তখনও ঝাণ্ডার ডাণ্ডার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে, নড়ন চড়ন-নট-কিছু– দফে দফে বয়ান করলেন ফ্রান্সের অগুনতি অপরাধ, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নীর নিরবচ্ছিন্ন গুনাগার হারামি একমাত্র ফ্রান্স, জর্মন গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসীপাতাটি। সর্বশেষে কণ্ঠস্বর এক পর্দা চড়িয়ে বললেন, যুদ্ধ যদি লাগে তবে ফ্রান্সই সর্বাংশে দায়ী।
