.
গজনির স্বরূপ
গজনি একটা দরিদ্র নগণ্য স্থান। আমি ভেবে হামেশাই তাজ্জব বোধ করেছি যে, হিন্দুস্তান-খুরাসানের যারা অধীশর ছিলেন তারা খুরাসানকে বাদ দিয়ে এমন একটা নগণ্য স্থানকে কী করে রাজধানী করেছিলেন।…গজনি ছোট দেশ। এখানে কৃষিকাজ অতি কঠিন। যে জমি এক বছর আবাদ হয়, পর বছর সে জমি ফের ভাঙতে হয়। অথচ বাবুরই বলছেন, গজনি অঞ্চলে পানির অভাব নেই। তদুপরি মাহমুদ এখানে কৃষির জন্য তিনটে বাঁধ তৈরি করেছিলেন। তার একটার উচ্চতা প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ গজ। বাবুর যখন গজনি যান তখন তার একটি বাঁধ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, অন্যটি মেরামতির জন্য বাবুর কিছু টাকা পাঠিয়ে বলছেন, আমি আশা করি আল্লাহর রহমে বাঁধটি নিশ্চয়ই আবার নির্মিত হবে। তৃতীয়টি তখনও কার্যক্ষম। তাবৎ গজনি জেলা ঘুরে বাবুর বলবার মতো যা পেলেন সে গজনির আঙ্গুর কাবুলের আঙ্গুরের চেয়েও ভালো, এখানে তরমুজের উৎপাদনও অনেক বেশি, আপেলও খুব ভালো। এবং আরও তাজ্জব লাগার কথা যে গজনির প্রধান চাষ লাল রঙ উৎপাদক এক প্রকার লতা। এটি বেশ লাভজনক কৃষি। এ লতা প্রচুর পরিমাণে হিন্দুস্তানে চালান হয়।
.
একাই এক লক্ষ
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যতই পড়ি ততই সন্দেহ দৃঢ়তর হয়, যে কটি দ্রব্য বাবুরের আমলেও গজনিতে উত্তম, সেগুলো কারও না কারও চেষ্টার ফলে উকৃষ্ট পর্যায়ে তোলা হয়েছে। আমার পক্ষে প্রমাণ করা কঠিন, কিন্তু আমার বিশ্বাস, মাহমুদ ভালো করেই বুঝেছিলেন, বিদেশ থেকে যত সোনা এনেই গজনিতে ছড়াও না কেন, বিদেশিরা সেই টাকার লোভে যতই উৎকৃষ্ট বিলাসব্যসনের জিনিস এমনকি খাদদ্রব্যাদিও গজনিতে এনে বিক্রি করুক না কেন, লুটের টাকাও একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে– যদি না কৃষি এবং শিল্পজাত দ্রব্য দেশ উৎপাদন করতে পারে। এই যে লতার কথা বাবুর বলছেন, এর থেকেও সন্দেহ হয়, মাহমুদ রফতানির জন্য এটার চাষ প্রবর্তন করিয়েছিলেন। হুনুরি এনেছিলেন সর্বপ্রকারের পোড়ার দেশের লোক যদি কোনও একটা শিল্প শিখে নিতে পারে! কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যায়, তিনি ঘি ঢালছিলেন ভস্মে। ভারতের অর্বাচীন ঐতিহাসিকরা বলেন, মাহমুদের স্বর্ণভূষা ছিল অস্বাভাবিক। আমার মনে হয়, প্রতি প্রচেষ্টাতে নিষ্ফল হয়ে, লোকটা আবার বেরুত নয়া ক্যাপিটালের সন্ধানে। আমরা যে রকম এক একটা ফাইভ-ইয়ার প্ল্যান শেষে নিরাশ হয়ে ফের বেরোই ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে করে।
এ কথা সত্য, গজনি শহরটাকে মাহমুদের মৃত্যুর কয়েক বৎসর পর ঘোর-অধিপতিরা পুড়িয়ে ভস্মে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু এ রকম কত শহর কতবার লুট করে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে–কোনও প্রকারের উৎপাদন-ক্ষমতা থাকলে সে-নগর ফের পুনর্জন্ম লাভ করে। গজনি। এক ধাক্কাতেই খতম।
হিন্দুস্তানের বিরাট স্বর্ণভাণ্ডার বার বার লুট করে, সে দেশটাকে প্রায় ফতুর করে দিয়ে, কুল্পে দৌলত পাড় দেশপ্রেমী একয়ে সুলতান মাহমুদ অকাতরে ঢাললেন ওইটুকু একচিলতে গজনি অঞ্চলে। আজকের দিনে একশো জর্মন বা রুশ নো-হাউ শ্বেতহস্তীকে পুষতে গেলে আমাদের বেল্টখানা তিন ফুটো টাইট করতে হয়! মাহমুদ এনেছিলেন হাজার হাজার নো-হাউ হুনুরি জলের দরে। পুরোপাক্কা প্ল্যানিংয়ের জন্য তাঁর সভায় বিজ্ঞজনের অভাব ছিল না।
সেই দোস্ত মুহম্মদের আমল থেকে আজকের প্রেসিডেন্ট দাউদ। অপরিবর্তনীয়তে কী এমন পরিবর্তন ঘটল, কী এমন সোনাদানা জুটল– তা-ও ধারকর্জায়– যে রিপাবলিক নামক নয়া নাম দিতেই কুল্লে আফগান মুল্লুকে মধু-দুগ্ধের ছয়লাপ লেগে গেল?
তা হলে আর ভাবনা কী? কাল থেকে ঢাকার নাম পালটে বলব লন্ডন, পূর্বদেশের নাম পালটে বলব দি টাইমস, আর, হে পাঠক, তোমারও আয়ের অঙ্ক হুশ করে উঠে যাবে লন্ডনবাসীর কাঁধ মিলিয়ে। ঘরে ঘরে টিভি, গ্যারাজে গ্যারাজে মোটর। বছরে দেড় মাস ছুটি মন্টিকার্লোতে!!
.
সাধারণ আচরণ
কাবুল থেকে ১৮ আগস্ট প্রেরিত, কলকাতায় ১৯ আগস্ট প্রকাশিত খবরে প্রকাশ, পাকিস্তান জাতীয় আওয়ামী দলের নেতা গাউস বখস বিজেনজো এবং আতাউল্লা খান মেঙ্গলের গ্রেফতারিতে আফগান সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ফলে আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাবুলে অবস্থিত পাক রাষ্ট্রদূতকে এত্তেলা পাঠিয়েছেন এবং গ্রেফতারির বয়ান দিতে বলেছেন।
ধরে নেওয়া যেতে পারে, আফগান পররাষ্ট্র বিভাগ শুধু যে জনসাধারণকে তাদের প্রাগুক্ত উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তাই নয়, পাক রাষ্ট্রদূতকে সর্বপ্রথম এই চিত্তবৈকল্যের দুঃসংবাদ জানিয়েই তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন। কাগজে বেরিয়েছে ডেকে পাঠানো অতএব হয়তো অভ্যর্থনার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
শুনেছি, এদেশে নাকি ইংরেজ আমলে হোম মিনিস্টার বা স্টেট সেক্রেটারি ফাঁসির আসামির করুণাভিক্ষার আবেদন নামঞ্জুর করলেও পত্রশেষে পানামায় লিখতেন, মহাশয় আপনার একান্ত বশীভূত ভূত হওয়ার গৌরবপ্রাপ্ত অমুক আই হ্যাভ দি অনার টু বি, স্যার, ইওর মোস্ট অবিডিয়েন্ট সারভেন্ট লেখার পর নাম সই করতেন। প্রকৃত সত্য নিরূপণার্থে দু চারজন ইয়ারবখশিকে এই সাতিশয় সিভিল প্রশ্নটি শুধোলে তারা রীতিমতো মিলিটারি হাঁক ছেড়ে গাক গাক করে যে-সব অশ্রাব্য উত্তর দিলেন তার থেকে অনুমান করলুম, তাঁদের প্রতি কখনও সরকার এমন অনুগ্রহ করেননি যে, জনৈক সবৈতনিক রাষ্ট্রীয় কর্মচারী স্বহস্তে সসম্মানে একটি প্রয়োজনাতীত সুদীর্ঘ নেকটাই তাঁদের গলায় পরিয়ে, পায়ের নিচের টুলটি এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে, কবিবরের ভাষায় দোদুল দোলায় দোদুল্যমান করবে। তথাপি আমার মনে ধোকা রয়ে গেল, সদাশয় সরকার এবম্প্রকার দুর্লভ গৌরব দেখালে তাঁরা মহারানির জন্মদিনে প্রদত্ত খেতাবের মতো সে নেকটাই গ্রীবাদেশে পরিধান করতেন কি না। আমার প্রশ্ন, আদব-কায়দার প্রটোকল সংক্রান্ত।
