.
রাজার এক্সপেরিমেন্ট এক্সপেরিমেন্টের রাজা
গজনির মাহমুদ বাদশাহ উত্তমরূপেই লক্ষ করেছিলেন ভারতের উৎপাদন-ক্ষমতা, শিল্পনৈপুণ্য, শিল্পদ্রব্য-বৈচিত্র্য এবং প্রাচুর্য। এসব রফতানি করে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত হয়েছিল ভারতের অতুল ধনসম্পদ। কথিত আছে, সর্বসুদ্ধ অষ্টাদশবার তিনি ভারতলক্ষ্মী-ভাণ্ডার লুণ্ঠন করেন। এই অষ্টাদশ অভিযানের চেয়ে অল্প লোমহর্ষক একটিমাত্র সংগ্রাম নিয়ে অষ্টাদশ পর্ব মহাভারত লেখা হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধান্তে শূন্য শ্মশান, মাহমুদের প্রতি অভিযানান্তে গজনিতে বৃহত্তর স্বর্ণোদ্যান! পাঠান্তরে সপ্তদশ অভিযানের উল্লেখ আছে। এ পাঠও গ্রহণযোগ্য। মহাভারতের মুষলপর্ব মূল মহাকাব্যের পক্ষে সম্পূর্ণ অবান্তর, সে তত্ত্ব অনস্বীকার্য। অতএব সপ্তদশ পর্বে সম্পন্ন মহাভারত অনাসৃষ্টি নয়।
সর্ব ঐতিহাসিক সম্পূর্ণ একমত যে, মাহমুদের লুণ্ঠনের ফলে এদেশের ধনদৌলত সর্বনাশা রক্তক্ষরণের মতো বেরিয়ে গিয়ে (এপোলিং ড্রেন অব ওয়েলথ) সম্পূর্ণ দেশটাকে। হীনবল অসাড় করে দিয়েছিল। এ লুণ্ঠনের খতিয়ান, দফে দফে বয়ান দিয়ে এর পরিমাণ ও মূল্য নিরূপণ সম্পূর্ণ অসম্ভব! একমাত্র নাগরকোট-এর মতো দ্বিতীয় বা ইন্টার ক্লাস নগরিকা থেকে তিনি পান সাতলক্ষ সোনার মোহর, সাতশো মণ সোনা এবং রুপার পাত, দু মণ খাঁটি সোনার তাল, দু হাজার মণ খাঁটি রুপার তাল এবং কুড়ি মণ হীরে, পান্না, মুক্তো ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এ-ইনভেনট্রিতে হস্তী, অশ্ব, কামধেনু, অস্ত্রশস্ত্র, বহুবিধ ধাতু, বিচিত্র কারুকার্যময় পট্টবস্ত্র, কাষ্ঠদ্রব্যাদি–শতাধিক আইটেম ধরা হয়নি। একটা অভিযানে, মাত্র একটা নগরিকা থেকে যদি এতখানি সম্পদ লুণ্ঠিত হতে পারে তবে সপ্তদশ-অষ্টাদশ অভিযানে অগণ্য নগরে কতখানি পাওয়া যায় তার কল্পনাও অসম্ভব। মাত্র এই পরশুদিন ১৯৪৫-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে মিত্রপক্ষ ইউরোপে কী পরিমাণ, কত বিচিত্র বস্তু, মায় গণ্ডায় গণ্ডায় সমুচা কারখানা আপন আপন দেশে বাজেয়াপ্ত-জাহাজে করে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারই কি লেখাজোখা হয়?
বস্তৃত মাহমুদ কী পরিমাণ সম্পদ স্বদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন সেইটেই এস্থলে প্রধান বক্তব্য নয়। কত রাজা কত লুটই না করছেন, সে সব নিয়ে আলোচনা বৃথা। এই শান্তি-কালেই যা-লুট পৃথিবীর সর্বত্র ন্যায়ত ধর্মত মায় ওয়াটারগেট হচ্ছে তারই খবর রাখে কজন? এবং সবচেয়ে সর্বনেশে লুণ্ঠন— দেশের ভিতর যখন রাজার হস্ত, করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি।
আমার বক্তব্য এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বটে কিন্তু ঈষৎ ভিন্ন প্রকৃতির।
একবাক্যে সর্বজন স্বীকার করেছেন, সুলতান মাহমুদ ছিলেন অসাধারণ গুণগ্রাহী, সর্বমুখী গুণসম্পন্ন বিদগ্ধ পুরুষ। কবি, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, পণ্ডিত, জ্ঞানবিজ্ঞানের গুণীজনকে তিনি এমনই অকাতরে অর্থসম্পদ দান করতেন যে দেশ-দেশান্তর থেকে প্রতিভাবান অসংখ্য গুণীজ্ঞানী তত্ত্ববিদ সেই শুষ্ক কঠিন সৌন্দর্যহীন, প্রাকৃতিক সর্বসম্পদে নিরঙ্কুশ বিবর্জিত গজনি শহরে জমায়েত হয়েছেন, সমস্ত জীবন সেখানে কাটিয়েছেন। আজ থেকে বছর বিশ-ত্রিশ পূর্বে রাজা মাহমুদের সভাকবি ফিরদৌসি, সভাপণ্ডিত অল-বিরুনির সহস্র বার্ষিকী প্রাচ্য-প্রতীচ্যের বিদ্বজ্জন সাড়ম্বরে উদযাপন করেছেন। অলবিরুনি সংস্কৃত জানতেন। ভারতের অপর্যাপ্ত জ্ঞানবিজ্ঞানের পুস্তকাদি অধ্যয়ন করা সত্ত্বেও তিনি বা অন্য কোনও সভাপণ্ডিত অর্থনীতি নিয়ে বাদশাহর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেননি, এটা অবিশ্বাস্য।
তদুপরি মাহমুদ তো মাত্র একবার ভারতবর্ষ লুট করে সে ধন গজনিতে ছড়িয়ে দিয়ে তার কুফল-সুফল দেখেননি। অধিকাংশ লুণ্ঠনকারীরা মাহমুদের মতো, পরবর্তীকালে বাবুরের মতো পর্যবেক্ষণশীল ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞানকর্মে নিয়োজিত করার মতো জ্ঞানী ছিলেন না; তদুপরি তারা বার বার পুনর্বার লুণ্ঠন করার মতো সুযোগ-কুযোগ পাননি যে আপন অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু দু একবার লুট করার পর সুলতান মাহমুদ নিশ্চয়ই অর্থ কী, ব্যবসাবাণিজ্যে অর্থের গুরুত্ব কী, অর্থের সফল ও নিষ্ফল প্রয়োগ সম্বন্ধে অনেকখানি গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন, এই আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস।
লুট করা ধনদৌলত সুন্দুমাত্র সঞ্চয় করা বা নিছক উড়িয়ে দেওয়াই যদি তার উদ্দেশ্য হত, তবে তিনি প্রতিবারে প্রধানত বন্দি করে অথবা অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে সর্বপ্রকারের আর্টিজান, ছুতোর, তাঁতি, স্থপতি, প্রস্তর কর্তনকারী, স্বর্ণকার, তাম্রকার, বস্তুত হেন শিল্প নেই যার দক্ষ হুনুরি– পালৈ পালে তিনি সুদূর গজনিতে নিয়ে যাননি। অতি অবশ্যই তিনি প্রতিমা-নির্মাণকারীদের সন্ধানে কস্মিনকালেও বেরোননি, ওই যা একমাত্র ব্যত্যয়। তার উদ্দেশ্য বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। কোথায় সে শীতল মলয় আর শস্যশ্যামলা ফুল্লকুসুমিদ্রমদল শোভিনী মাতা? সেই নির্জলা, নিষ্ফলা, সেই পোড়ারমুখো দেশটাকে তিনি চেয়েছিলেন ফলপ্রসূ করতে, কিন্তু কী সে দেশ! তবে কি না, আমি কোনও দেশ সম্বন্ধে কী বলি না বলি, কোনও দেশের কী বয়ান দিই না দিই, তারই ওপর যদি সুচতুরজন আস্থা রাখতেন তবে তো আমি এদ্দিনে বিলেত, নিদেন কাবুলের ফরেন মিনিস্টার হয়ে যেতুম! তা হলে শুনুন, সর্বশাস্ত্ৰবিচারদক্ষ পর্যবেক্ষণ শক্তিতে শার্লক হোমস মাসুদরানা যার কাছে নিতান্ত দুগ্ধপোষ্য শিশুর মতো আবুদিয়া, সেই বাবুর বাদশাহ গজনি সম্বন্ধে কী বলেছেন, অনুবাদ প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খার।
