মার্কিন সাংবাদিকের অত্যুজ্জ্বল রিপোর্ট তথা কিশমিশের স্মরণে আমার হৃদয়ে সাংবাদিক হয়ে ফোকটে দু পয়সা কামাবার প্রলোভন জ্বলজ্বল চিতার মতো প্রজ্বলিত হয়েছে– তদুপরি পাওনাদারের ভয়ে বাড়ি থেকে বেরুনো বন্ধ। ভাগ্যিস, আকছারই বিজলি মারে ফেল; তখন অন্ধকারের সঙ্গে আমার খুদাদাদ ঘোরতর কৃষ্ণ চর্মবর্ণটি অক্লেশে মিশিয়ে দিয়ে মিরপুর রোডের মোড়ে এক ইয়ারের অন্দরে দু ছিলিম তামুক খেয়ে কলিজা ঠাণ্ডা করে আসি।
ভাবছি, কালই বহির্বিশ্বে টেলিগ্রাম ঝাড়ব :
ঢাকায় কিশমিশের সের আশি টাকায় উঠেছিল। সমাজসেবীদের ভীতি প্রদর্শনহেতু কাল চড়াকসে চল্লিশে নেমেছে।
লুফে নেবে, স্যর, সব্বাই লুফে নেবে।
.
বাবুর-নাম অবহেলা বিপজ্জনক
বাবুর বাদশাহর নাম স্মরণে এলেই আমার কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়। একাধিক মিত্র অবশ্যই বলবেন, কটা লোকের আদৌ এই বিরল গুণটি থাকে যে, সে তোমার কিংবা এবং তোমার মতো আর পাঁচটা চুকুম-বুদাইয়ের মস্তিষ্কে ঘন ঘন আনাগোনা করবে? অথচ ইংরেজিতে এই কাণ্ডজ্ঞান সমাসটির অনুবাদ কমনসেন্স এবং স্বয়ং ইংরেজই স্বীকার করে যে নামকরণের সময় ব্যাকরণে ভুল হয়ে গিয়েছে। কমনসেন্স সর্বদেশে সর্বকালে বড়ই আনকমন। বরঞ্চ এটাকে আন-কমন-সেন্স বা রেয়ার-সেন্স বলাই প্রশস্ততর– যিনি কি না গুণীজনের চৈতন্যলোকেও নিতান্তই ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন, বাংলায় বলি রাঙ্গা শুক্কুরবারে অবতীর্ণ হন। অর্থাৎ, অতিশয় কালে-কম্মিনে, নিতান্তই জীবনের বিরলতম শুভ মুহূর্তে। যেমন ধরুন এ বাড়ির পাশের বাড়ির, হয়তো-বা আপনার বাড়ির টেলিফোনটি। এনার বেলাতেই বোঝা যায়, ইনি মহাপুরুষ। অসাধারণ অর্থাৎ আন-কমন সেন্স দ্বারা যন্ত্রটি টুইটুম্বুর। সাতিশয় কালেভদ্রে আপনি এঁকে জাগ্রত অবস্থায় পাবেন। দুষ্টলোকে কয়, আমাদের রাজকর্মচারীরা এ বাবদে অলিম্পিক। আমি তীব্রকণ্ঠে, মৌলামুরশিদের দোহাই দিয়ে, যদি পাঠক হিন্দু হন তবে গঙ্গাজলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত অবস্থায় তামা-তুলসী স্পর্শ করে, ক্যাথলিক হলে তিনবার দেহের উত্তমার্ধে ক্রুশচিহ্ন এঁকে, বৌদ্ধ হলে উচ্চকণ্ঠে ত্রিশরণ মন্ত্রের শরণ নিয়ে, জৈন হলে– থাক, ওই তো সেকুলার স্টেটের চিরন্তনী শিরঃপীড়া, সব্বাইকে আপন আপন অতিশয় ন্যায্য হিস্যে দিতে হয়, এস্তেক বেতার-প্রতিষ্ঠানেও শপথ নিয়ে বলছি, এটা অতিশয় অন্যায়। অলিম্পিকের কুল্লে গোল্ড-মেডেল পাবার গগনচুম্বী পাতালস্পর্শী কুম্ভকর্ণবিজয়ী হক্ক ধরেন আমার টেলিফোনটি। অবিচল, অবিরল, নিশ্চল, সুবিমল এর কাল-কালান্তর-ব্যাপী ড্রিাটি। সুবিমল বলার সুযুক্তি : এনার নিদ্রাতে কোনও মল নেই। যথা :
শুধু বেঘোরে ঘুম ঘোরে
গরজে নাক বড় জোরে,
বাঘের ডাক মানে পরাভব।
আঁধারে মিশে গেছে আর সব ॥
(রবীন্দ্রনাথের সর্বাগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথের কাব্য থেকে উদ্ধৃত)
আমার টেলিফোনটি নাসিকাগর্জনের মতো ইতরজনসুলভ কুকর্মদ্বারা ধ্যান-ধারণায় নিযুক্ত প্রতিবেশীকে অযথা অত্যাচার করেন না। করলেই তো তার সর্বনাশ। তদ্দণ্ডেইতার কান দিয়ে
অনেক কথা বলে নেব
এবে তোমার কানে কানে
কত নিশীথ অন্ধকারে
ছিল কত গোপন গানে ॥
অর্থাৎ তখন তাঁকে ফের কর্মক্ষেত্রে নামতে হবে।
টেলিফোন সম্বন্ধে এতখানি বলার প্রয়োজন হল এই কারণে যে, গত রবিবার ১১-৮ তারিখে আমি লিখেছিলুম আমাদের হাইকোর্টটিকে কলকাতারটির চেয়ে উচ্চতররূপে নির্মাণ করার জন্য আমি হেথাকার কর্তাব্যক্তিদের পই পই করে অনুরোধ করি– অবশ্য ফোন মেরামতির নিষ্ফল প্রচেষ্টাতে নিত্যি নিত্যি পর্বত-প্রমাণ যা করতে হয় তার তুলনায় ধূলিপরিমাণ নস্যবৎ। ইয়াল্লা ছাপাতে বেরুল, কোন মেরামতির নিষ্ফল প্রচেষ্টাতে নিত্যি নিত্যি ইত্যাদি অর্থাৎ ফোন স্থলে কোন ছাপা হয়ে গিয়েছে। পূর্বে কিংবা পরে ফোনের কোনও ইঙ্গিত ছিল না বলে পাঠকের পক্ষে আগাগোড়া বাক্যটাই অবোধ্য রয়ে গেল। কিংবা পাঠক ভাবল, আমি একটা বুদু, কী একটা বাজে রসিকতা করেছি যার মাথামুণ্ডু কোনও অর্থ হয় না–রস তো দূরের কথা। কিন্তু এর সঙ্গে তড়িঘড়ি একটা সত্য এস্থলে উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। টেলিফোন বিভাগ সরকার চালান। যদি বা সাহস সঞ্চয় করে টেলিফোনের প্রতি বক্রোক্তি করব বলে মনস্থির করেছিলুম, সরকার বাবদে আমার সতত সশঙ্কিত অচেতন মন– যার জন্ম ইংরেজের গোলামির যুগে আমার কলমের কানটি আচ্ছাসে মলে দিয়ে শাসিয়েছে, অমন কম্মটি করতে যাসনি। ফোন না লিখে ল্যাখ কোন। এবং কলমও তাই লিখেছে, ছাপাখানাও তাই ছাপিয়েছে। এর সঙ্গে এটাও বলা উচিত মনে করি, ছাপাখানা যতই ভুল করুক, সে আমাদের মতো কাঁচা লেখকের কত যে বানান সংশোধন করে দেয় সে তত্ত্ব কি কেউ জানে? ন্যাশনাল প্রফেসর সুনীতি চাটুয্যের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। একদা অর্বাচীন এক সাহিত্যিক আমাদের সম্মুখে ছাপাখানার বিস্তর কুৎসা গেয়ে চলে যাওয়ার পর বাঘা বৈয়াকরণিক সুনীতি চট্টো বললেন, হু, ছাপাখানা যে আমাদের কত না বানান-ভুল শুধরে দিয়ে সমাজে ইজ্জত বাঁচায়, তার খবর এ-চ্যাংড়া জানবে কোত্থেকে? আমি ঘন ঘন সম্মতি তথা কৃতজ্ঞতাসূচক মাথা নাড়িয়েছিলুম।
টেলিফোনের বেলাও তাই। ওই বিভাগের কর্মচারীরা ভদ্র এবং ডাক্তারের সঙ্গে এঁদের অনেকটা মিল আছে। ডাক্তার কি কখনও রোগীকে বলে, দাদা, যা গোরস্তান মার্কা নিউমোনিয়াটি ঝড়-বিষ্টিতে জোগাড় করে এনেছ, এতে নিদেন তিন হপ্তার ধাক্কা! ফোন অফিসার কী করে বলেন, ঝড়বৃষ্টিতে ফোনের তারটির যা হাল হয়েছে, সে তো দাদা নতুন তারের দাওয়াই না আসা পর্যন্ত সারবার কথা নয়– সে তত দেড় মাসের ধাক্কা। নিউমোনিয়া সারতে এক মাস লাগলেও কি আপনি ডাক্তারকে তাড়া লাগান? তবে? ফোনের বেলাই যত গোসসা?
