.
সেই ডাবা হুঁকো
মার্কিনি রিপোর্টে যে-সব মোক্ষম মোক্ষম খবরের উল্লেখ মাত্র নেই তার থেকেই আমি সত্য নির্ণয় করেছি।
নেই তাই খাচ্ছো, থাকলে কোথা পেতে।
কহেন কবি কালিদাস পথে যেতে যেতে।
গরুর ল্যাজটা কাটা পড়ে যাওয়ায় সেখানে যে ঘা হয়, মাছিগুলো তারই ওপর মোহব লাগিয়েছিল। মার্কিন রিপোর্টের দগদগে ঘা থেকে আমি অক্লেশে অনুমান করলুম, আদি ল্যাজটার আকার-প্রকার গড়ন-ঢং কী ছিল এবং তৎসহ যুগপৎ আরেকটি ফালতো তত্ত্ব আবিষ্কার করে বাঙ্গাল, বাঙ্গালদের সম্বন্ধে বড়ই শ্লাঘা অনুভব করলুম : মার্কিনি রিপোর্টাররা নিতান্তই সস্তা মার্কিন-কাপড়; কাবুলের হাইকোর্টটা যে কোথায়, সে তত্ত্বটাও নিরূপণ করতে পারেননি।
এনাদের এক মহাপ্রভু বলছেন, প্রশস্ত ধূলিধূসরিত কাবুল উপত্যকার হেথাহোথা এলোপাতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে আছে ভাঙাচোরা বুডট কাবুল শহর, সেই আদিকালের অপরিবর্তনীয় চেহারা নিয়ে। কিন্তু বাহ্যদৃশ্যে ভুলো না রে, মন। পরিবর্তন এসেছে আগাপাশতলা প্রকম্পিত করে।
বটে!! কী সে যুগান্তকারী খুনিয়া পরিবর্তনটি?
পূর্বে যেখানে ঢুলুঢুলু নয়নে আধো ঘুমে আধা-চেতন কাবুলি কাস্টমস্ কর্মচারী যাত্রীদের আধখেচড়া তদারকি করে না করে হাতের অলস ইশারায় বিমানবন্দর থেকে তাদের বেরিয়ে যাবার পথ দেখিয়ে দিত, সেখানে রোমহর্ষিত বিস্মিত মার্কিন বাঙ্গাল দেখলেন, হাতে টমি-গান নিয়ে ঝাঁকে ঝাকে যোদ্ধা (অশ্বারোহী কি না, বোঝা গেল না– লেখক) ট্যারমাকের উপর পাহারা দিচ্ছে, প্লেন থেকে নামবার পূর্বেই যাত্রীগণকে নিরাপত্তা-পুলিশ বাজিয়ে দেখে নিচ্ছে (ইন্সপেকট করে)।
মার্কিনের বিস্ময় দেখে আমারও বিস্ময়ে বাক্যস্ফুরণ হচ্ছে না।
আচ্ছা, পাঠক তুমিই বল, কোন্ সে মুলুক, হটেনটট বুশমেন যাদেরই হোক, যেখানে চল্লিশ বছরের সুপ্রতিষ্ঠিত রাজাকে বরখাস্ত করে কু দেতা হলে বিমানবন্দর, রেল ইস্টিশন জাহাজ বন্দর (কাবুলে এ দুটোই নেই), ছাউনি, থানা, গয়রহের সামনে তিন ডবল সশস্ত্র সৈন্য মোতায়েন করা হয় না? পঁচিশের কথা বাদ দাও, আইয়ুব যখন মেনি-বেড়াল মার্কা কু করেছিলেন তখন রাজধানীতে না, প্রাদেশিক শহরিকা ঢাকা, তারও নিচের সিলেট-কুমিল্লায় সেপাই শান্ত্রি হৈ-হৈ রৈরৈ কাণ্ড করেনি?
আরও গণ্ডা দুই কারণ আছে যেগুলো দফে দফে বলার কী প্রয়োজন? ধুন্দুমারের সময় আন্তর্জাতিক স্মাগলারদের অবাধ আগমন, প্রাক্তন রাজা জহিরের গুপ্তচর প্রেরণ, কু-জনিত ইনফ্লেশনে টু-পাইস কামাবার তরে বিস্তর চিড়িয়ার গমনাগমন, দাউদের রুদ্রদৃষ্টিতে বিপন্ন (প্রধানত জহিরের) আত্মজনের যেটুকু সোনাদানা আছে সেটুকু সস্তায় ক্রয়করণ, বিশেষ করে জাল পাসপোর্টের সাহায্যে পাকিস্তানি চরদের অহরহ শুভাগমন, আরও কত না বহুবিচিত্র রবাহূত জনগণ অস্বাভাবিক অবস্থায় এদের সবাইকে মেকি সিকিটার মতো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে হয়, ডবল জালের ছাঁকনির ভিতর দিয়ে ইসপার উস-পার করতে হয়। এ কর্ম নিদ্রালু একগণ্ডা কেরানি দিয়ে হয় না। বাংলা কথা!
বাচ্চা-ই সাকাও ছিল ডাকু। তদুপরি তার আমলে কাবুলের ভিতরে-বাইরে কোনও অ্যার সার্ভিস ছিল না। তথাপি সে ফরেন অফিসের গুটিকয়েক জাঁদরেল কর্মচারীকে অ্যারপোর্টে মোতায়েন করেছিল। মার্কিন রিপোর্টার কাবুল বাজারে দু চারটি নাতিবৃদ্ধ মুরুব্বিকে শুধালেই তো জানতে পেতেন, ব্যাপারটা রত্তিভর নতুনত্ব ধরে না– তাই বলছিলুম, হাইকোর্টটা যে কোন মোকামে অবস্থিত সে খবরটাও সায়েব জোগাড় করেননি।
শেষ প্রশ্ন, এই ভোজবাজির লীলাখেলা কদিনের তরে? পাঠক, আইয়ুবি জঙ্গি চৌকিদারি এ দেশে কতদিন চলেছিল সে বাবদে তুমি স্পেশালিস্ট, আমি স্কুলবয়। টমিগান হাতে থাকলে ঘুষ খাওয়ার সনাতন সিসটেমে ঢোকার পন্থা সহজতর, প্রলোভন খরতর। আখেরে মায় আপিসার, বেবাক সেপাইকে ছাউনিতে ডেকে নিতে হয়– করাপশন আগাপাশতলা ছড়িয়ে পড়ার পূর্বে। আইয়ুবের গদিতে যখন ইয়াহিয়া আসন নিলেন তখন ফিল্ড-মার্শালের প্রতি অনুরক্ত কোনও সেপাই-আপিসার উল্টো কু করল না কেন? উত্তরটি প্রাঞ্জল। সব্বাই করাপট। করাপট-জনের কোনও নেমক-হালালি থাকে না, কারও প্রতি।
.
রুটি নেই? কেক খাব
ক্যু যত নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হোক, ভোজদ্রব্যের দাম বাড়বেই। মার্কিন সংবাদদাতা সুসমাচার জানিয়েছেন, দাউদ মোটা মুনাফাখোরদের গুলি খাওয়াবার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে চালের দাম নাকি অর্ধেক কমে গিয়েছে। মার্কিন সুন্দুমাত্র চালের কথাটা তোলায় বুঝতে পারলুম তার পেটে এলেম কতখানি! কাবুলের সাধারণজন ভাত খায় না। ওটা অতিশয় বিরল বিলাসবস্তু। একশো মাইল দূরের জালালাবাদ অঞ্চল, দু-শো মাইল দূরের পাকিস্তান থেকে বিস্তর পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে তণ্ডুলকে পৌঁছতে হয় কাবুলে। পাকিস্তানি চাল কালোবাজার মারফত। সাদায় ক শো গুণ ট্যাকসো, জানিনে। কাবুলের পয়সাওলা লোকও নিত্যি নিত্যি পোলাও খায় না। বনেদি ফারসিতে প্রবাদ, প্রতিদিন ঈদ নয় যে হালুয়া খাবে– হর রোজ ঈদ নিস্ত কে হালওয়া ব-খুরিদ। কাবুলে হালুয়ার পরিবর্তে পোলাও বলে।
কথিত আছে, বাচ্চা-ই সাকাও রাজবাড়িতে পয়লা খানার সময় দেখে, সমুখে আমান উল্লাহর প্রাসাদ-পাঁচক প্রস্তুত জাফরানের ভুরভুরে খুশবাইদার পোলাও। সে নাকি লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বলেছিল, ওই খেয়েই তো আমান উল্লাহ বিলকুল বুজ-দিল (ছাগলের কলিজাওলা ভীরু) হয়ে যায়, আর রাজধানী ছেড়ে পালায় কান্দাহার। সে নাকি রুটি, কিশমিশ আর দু-চিলতে পনির– তার মামুলি খাবারই খেয়েছিল।
