আমার ব্যক্তিগতভাবে একটা মস্ত সুবিধা রয়েছে। ফোন মারফত আমার বেশুমার পাওনাদার আমাকে বেলা-অবেলায় আর হুনো দিতে পারে না। ওই তো মানুষ মাত্রেরই দোষ। ভালো দিকটা দেখে না; দেখে শুধু খারাপ দিকটা।
হঠাৎ মনে পড়ল, কাবুলের দূর-আলাপনী প্রতিষ্ঠানটির চেহারাটা। সে কেচ্ছা আরেকদিন হবে।
.
আহাম্মুকি
বিষয়টি গুরুতর। সমস্যাটি জটিল। আমার বিদ্যে অত্যল্প।
বাবুর বাদশাহ তার ইয়ার-আমিরদের মুদ্রাস্ফীতি বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, তোমরা কাঁড়া কাঁড়া দিনারমোহর নিয়ে কাবুল পৌঁছনমাত্রই তো কাবুলের উৎপাদন ক্ষমতা সঙ্গে সঙ্গে আকাশ-ছোঁয়া লক্ষ মারবে না। বাজারে আগে যে-রকম হাজারটা আণ্ডা উঠত সেই হাজারটাই উঠবে। মাঝখানে শুধু তোমাদের দরাদরির আড়াআড়িতে এক পয়সার মাল এক টাকা দিয়ে কিনবে।
ঠিক ওই পরিস্থিতিই গড়ে তুলেছিলেন ইংরেজ কোম্পানির জাঁদরেলরা বাবুরের মৃত্যুর তিনশো বছর পর, আজ থেকে দেড়শো বছর আগে। জঙ্গিলাট কিন কান্দাহার গজনি জয় করার পর বিপুল গৌরবে প্রবেশ করছেন কাবুলে এবং তাদের হাতের পুতুল শাহ সুজাকে তখতে বসিয়ে লেগে গেলেন বিপুলতর পরাক্রমে নববিজিত রাষ্ট্র আফগানিস্তানের ওপর রাজত্ব করতে।
একে তো পুতুল রাজা মাত্রই আফগানের দু চোখের বিষ, তদুপরি সুজা ইন্দ্রিয়পরায়ণ জনসাধারণ করল অসহযোগ। অর্থাৎ খুব একটা স্বেচ্ছায় সেই সতেরো-আঠারো হাজার, কাবুলে মোতায়েন, ইংরেজ সেনাদলকে খাবার-দাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কাবুল উপত্যকার লোক এবং নিকটবর্তী জনপদবাসী বেচতে চায় না। ওদিকে গোরার পাল চায়, প্রতিদিন হালুয়া খেতে! জিনিসপত্রের দাম চড়চড় করে চড়বার পূর্বেই সদাশয় ভারতস্থ ইংরেজ সরকার ইনফ্লেশন ইন্ধনের জন্য সৈন্য এবং অফিসারদের বিলাস-ব্যসনের তরে পাঠাতে লাগলেন বে-হিসাব বে-শুমার বস্তা বস্তা মোহর, টাকাকড়ি। এমনিতেই, স্বাভাবিক অবস্থাতেই সতেরো-আঠারো হাজার ফালতো, তায় শ্বেতহস্তীকে পুষবার মতো গম-যব ফসল, ভেড়ি-মুরগি কাবুল উপত্যকা ও সেই দূর হিন্দুকুশ এলাকা পর্যন্ত জনপদ উৎপাদন করে না। মুদ্রাস্ফীতি ছাড়াই, অর্থনীতির সনাতন আইনেই দ্রব্যাভাববশত বাজারে লাগল আগুন। ইতোমধ্যে আসছে, দিনের পর দিন হিন্দুস্থানের ভাণ্ডার উজাড় করে, সেখানকার তীব্র প্রতিবাদ, করুণ আর্তনাদ উপেক্ষা করে টাকার ঘি কাবুলের ইনফ্লেশন আগুনে ঢালবার তরে। গোরাদের ছাউনি শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে। শহরগামী গ্রামবাসী আশ্যাওলা মুরগি-ওলাকে গোরা সেপাইরা করে চোটপাট এবং লুটপাট। ফলে সাপ্লাই গেল আরও কমে যোগানদার সুদূর গ্রাম থেকে বেরুতেই রাজি হয় না।
.
গোরা মার্কা আজব ইনফ্লেশন
কাবুল শহরের কাছে ইনফ্লেশন হুমা জাতীয় আজব চিড়িয়া নয়। মাহমুদ, তিমুর নাদির বিস্তর লোক, বিস্তর না হোক, অল্প-বিস্তর ইনফ্লেশন ঘটিয়েছেন কাবুলে, লুটের টাকা ঢেলে। কিন্তু এবারের ইনফ্লেশনে মার খেল কাবুলের ফকির-আমির দুই পক্ষই। সে যা দাম– সে দাম দিয়ে রুটি, আণ্ডা, মটন, আঙ্গুর, নাসপাতি, আপেল খেতে পারেন স্রেফ গোরা রায়রাই। ২৫ মার্চের পর টিকা শুষ্ঠীরও নিত্যি নিত্যি ছিল হালুয়া। আমির মোল্লা গেরস্ত সবাই গেল একসঙ্গে ক্ষেপে।
ওদিকে ভারতের রাজকোষে মারাত্মক অর্থাভাব। রব উঠেছে, সরকার মহলেই, খর্চা কমাও, কড়ি বাঁচাও। তখন এই পাগলা-অভিযান, ইটারনেল পিকনিকের খর্চা না কমিয়ে ইংরেজ করল আরেক গো-মূর্খামি। মাসোহারা ঘুষ দিয়ে যেসব আফগান সরদার-আমিরদের একদিন কোনও গতিকে ঠেকিয়ে রেখেছিল গণবিক্ষোভের আবর্ত থেকে, তাদের ভাতা দিল কমিয়ে আর সঙ্গে সঙ্গে তারা আর তাদের পুষ্যির পাল গেল ক্ষেপে। কোথায় না একদিকে গোরাদের বে-এক্তেয়ার খর্চা কমিয়ে, অন্যদিকে সরদারদের ভাতা বাড়িয়ে এবং তাদের মাধ্যমে গেরস্তদের হাতে টাকার একাংশ পৌঁছিয়ে বাজারদরে ভারসাম্য আনা হবে, তা না উল্টো দাঁড়িপাল্লার যে দিকটা হাল্কা হয়ে হয়ে হিন্দুকুশের চুড়ো ছুঁই ছুঁই করছিল তার থেকে। আচমকা থাবা মেরে সরিয়ে নেওয়া হল তিন খাবলা। ভারী দিকটা এক ঝটকায় ঠাং করে ঠেকল কাবুলের পাথরে।
.
জাহান্নামের পথে
উন্মত্ত জনতা তিনজন ইংরেজ অফিসারকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে খুন করল কাবুলের রাজপথোপরি চিৎকারে চিল্কারে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে।
এর পরের কাহিনী সবাই জানেন। অশেষ লাঞ্ছনা অবমাননার পর প্রায় সাড়ে ষোল হাজার গোরা, নেটিভ– নেটিভ যৎসামান্যেরও কম– কাবুল থেকে বেরুল ভারতের পথে। সেই ভয়াবহ জগদল-গিরিপথ, যেটাকে বাবুর পর্যন্ত সমঝে চলতেন, তারই ভিতর কচুকাটা হল শেষ লোকটি পর্যন্ত–না, মাত্র একজন ডাক্তার যখন কোনও গতিকে ছন্নের মতো টলতে টলতে জালালাবাদের ইংরেজ ছাউনিতে পৌঁছল তখন সে অর্ধোন্মাদ। এটা আমাকে আর নতুন করে বলতে হবে না, এমনকি আমি স্বয়ং, মোটর ভেঙে যাওয়ার দরুন, জগদলকে যে-এক রাত্রি কাটাই সে কাহিনী উপস্থিত মুলতবি থাক।
.
সর্বজনীন সর্বদেশের প্রশ্নমালা
কাবুল শহরে আজও যদি অকস্মাৎ একগাদা টাকা ফেলা হয় তবে ফল কী হবে? আফগানিস্তানে চিরকালই খাদ্যাভাব। বহির্বিশ্ব থেকে যে গম-ডাল আসবে মার্কিন রিপোর্টারের শৌখিন চাল মাথায় থাকুন– সেটা আসবে কোন দেশ থেকে, কোন পথ বেয়ে, সেই হঠাৎ-পাওয়া টাকার জোরে? (সে কড়ি কাবুলে ছেড়ে ইনফ্লেশন ডাকার কোনও অর্থ হয় ন)। যে দুটো পথ দিয়ে প্রধান শহর কাবুল, গজনি, কান্দাহার, জালালাবাদ বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত, সেগুলোর উপর দিয়ে একদা চলাচল করত উট গাধা ইত্যাদি ভারবাহী পশু। এখনও বেশিরভাগ তাই। তবে হ্যাঁ, এখন ট্রাকও চলে। এস্থলে মনে রাখা ভালো, ট্রাকের ইসকুরু বন্দু থেকে আরম্ভ করে ট্রেলের শেষ ফোঁটা পর্যন্ত কিনতে হয় বিদেশ থেকে। এবং দুটি রাস্তার একটা জগদলক-জালালাবাদ হয়ে পৌঁছয় পাকিস্তানের পেশাওয়ারে, অন্যটিও পাকিস্তানের চমন-কুয়েটাতে।
