পূর্ববঙ্গবাসী একশো বছর ধরে জানত, নোয়াখালি বা সন্দ্বীপের সুদূরতম প্রান্তেও যদি খুন হয় এবং সদরের দায়রা-আদালতে যদি আসামির ফাঁসির হুকুম হয়, তবে সে হুকুম কলকাতা হাইকোর্ট থেকে মঞ্জুরি না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ঝুলতে হয় না। রাঢ়ের তুলনায় পূর্ব বাংলার গ্রামবাসী একটু বেশি গরম মেজাজের হয়, তার আত্মসম্মান জ্ঞান একটু বেশি টনটনে। উচ্চশিক্ষিত শান্তিকামী নাগরিক এটাকে স্থলবিশেষে হিংস্র বলে মনে করতে পারে, কিন্তু আমার মতো শক্তিহীন অর্থদীনকে দেশ-বিদেশে এত লাঞ্ছনা অবমাননা সক্ষোভে সহ্য করতে হয়েছে এবং হচ্ছে যে, সে রগচটা বাঙ্গালের ধৈর্যচ্যুতি এবং সঙ্গে সঙ্গে তার সখা সুপকু বংশদণ্ডের অনুসন্ধান দেখে ঈর্ষাকাতর হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং অতি অবশ্যই তার মঙ্গল কামনা করে। সে কথা থাক। অতএব খুন-খারাবি দেখে দেখে অপেক্ষাকৃত অভ্যস্ত মিম্বর উল্লা বা গদাই নমশূদ্র পাকেচক্রে যখন কলকাতা যায় তখন যদি সে সেই ভবনটি দেখতে চায় যার গর্ভগৃহে প্রতিদিন স্থির করা হয়, কে ঝুলে ঝুলে লম্বমান অবস্থায় ইহলোক ত্যাগ করবে আর কে-ই-বা রোগশয্যায় মা-ধরণীর বক্ষ থেকে সমান্তরাল রেখাবৎ বিদায় নেবে, তখন আমি গাইয়া আশ্চর্য হব কেন? শহুরে কলকেত্তাই ব্যাপারটা আদৌ বুঝতে পারে না, কারণ তার সীমাসরহদের ভিতর তার অতি সুদূর ক্ষীণ পরিচিতজনের কাউকে কণ্ঠদেশে রজ্জবদ্ধাবস্থায় লম্ববান দেহে ইহলোক ত্যাগ করতে হয়নি কিংবা সে সম্ভাবনার সম্মুখীন হতে হয়নি। সে হাইকোর্টের মর্ম বুঝবে কী করে? তাই হাইকোর্টের প্রতি বাঙ্গালের গভীর শ্রদ্ধা, তার দর্শন-লাভ তীর্থ-দর্শনের সমতুল্য বিবেচনা করাটা নিয়ে ঘটি ঠাট্টা-মস্করা করে!… ঢাকাতে যখন হাইকোর্ট নির্মাণ আরম্ভ হয়, তখন আমার কী উল্লাস, কী নৃত্য! আমি তখন কর্তাব্যক্তিদের পই পই করে অনুরোধ উপরোধ করি– অবশ্য ফোন মেরামতির নিষ্ফল প্রচেষ্টাতে নিত্যি নিত্যি পর্বতপ্রমাণ যা করতে হয় তার তুলনায় ধূলিপরিমাণ নস্যবৎ- আমাদের হাইকোর্টটিকে যেন কলকাতার তুলনায় লাগসই জুআফিক বেশ খানিকটে উচ্চতর পর্যায়ে রূপায়িত করেন যাতে শ্যামবাজারের রকে বসে ঘটিদের সগর্বে আদেশ দিতে পারি, ঢাকা গিয়ে সেথাকার হাইকোর্ট দর্শনজনিত অশেষ পুণ্যার্জন করতে পারে! কেউ শুনল না আমার উচ্চাদর্শের প্রস্তাবটি! শুনলে কী হত? ওই যে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ দো-হুঁদো ইন্ডিয়ান সেপাই হেথায় এসেছিল তারা আমাদের হাইকোর্ট দেখবার তরে মাথা উঁচু করতেই– দ্যাখ-তো-না-দ্যাখ– তাদের টুপি, পাগড়ি এস্তেক মন্টিতক মন্তকচ্যুত হয়ে গড়াগড়ি যেত না? যে দু চারটি শেষ কুট্টিবেরাদর এখনও লিকলিক করে বেঁচে আছে তারা সরেস সরেস গণ্ডাদশেক মস্করা-কিসসা বানিয়ে টেরচা নয়নের বাঁকা টিটকিরি কেটে আপন জীবন ধন্য মেনে, স্বয়ং আপন জানাজার ব্যবস্থা করে দিয়ে কুট্টি বংশের শেষ প্রদীপটি ফুঁ মেরে নিভিয়ে দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে পুলসিরাত পেরিয়ে যেত না? শুনতে পাই, কলকাতার লোক আজ নাকি আমাদের হ্যাঁনস্তা করে। করবে না? দাসীর কথা বাসি হলে ফলে। তখন যদি হাইকোর্টটা উঁচু করে বানাত তবে– যাক গে।
.
মার্কিন খট্টাঙ্গ ভুটাঙ্গ পুরাণ
কড়ি আছে মার্কিনের। পয়লা ধাক্কাতেই তারা হাজির হয়েছেন কাবুলে হাইকোর্ট দেখতে। ঝটপট একাধিক রিপোর্ট ভি তেনাদের কাগজে বেরিয়েছে। কুল্লে এক দফা চোখ বুলিয়েই পুনরায় সেই সত্য হৃদয়ঙ্গম করলুম, পৌনঃপুনিক পরিবর্তনেও অপরিবর্তনীয় খুদা-দাদ আফগানিস্তানের জিন্দাবাদ শহর-ই আলা কাবুল। অর্থাৎ কাবুল তথা আফগানিস্তান আপাতদৃষ্টিতে যতই পরিবর্তিত বলে মনে হোক না কেন, একটু ঘষলেই উপরকার গিল্টি উপে যায়, আর বেরিয়ে পড়ে আসল দস্তা খাজা মাল। তুলনা দিয়ে চোখের সামনে আনি, ফরেন মিনিস্টার ভুট্টো, হঠাৎ আইয়ুবের বিরুদ্ধে তাঁর চেল্লাচেল্পি, গণতন্ত্র চাই, পিপলস পার্টিই পিপল, তাদের হুকুমেই চলবে দেশ, তার পর অখণ্ড পাকিস্তান যে সংবিধানই তৈরি করুক না কেন (১৯৭১ শীতকাল) পিপিপি সেটা মানবে
?, তার পর ঢাকাতে হত্যাকাণ্ড আরম্ভ হলে শুকুর আলহামদুলিল্লাহ, পাকিস্তান ইজ সেভড, তার পর ভুল বলেছিলুম, এই পোড়র দেশে গণতন্ত্র চলতে পারে না, চাই সর্বাধিকারসম্পন্ন প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্রাধিপত্য–ইত্যাদি ইত্যাদি, পাঠককে আরও উদ্ধৃতি দিয়ে বেকার বিরক্ত করব না। মোদ্দা কথা, তিনি যতবার যত তরো-বেতরো ভোল পালটান, ভেক বদলান, ক্ষণে যাত্রার দলের ইয়া দাড়ি-গোঁফওলা নারদমুনি সাজেন, ক্ষণে কামিয়ে-জুমিয়ে চাচা-ছোলা শ্রীরাধার সাজ ধরেন, একটি ভেংচি কেটেছেন কি না কেটেছেন সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন ডিকটেটর ভুট্টো, যিনি তাঁর কলোনি মরহুম পূর্ব-পাকের ওপর একদিন-না-একদিন কুলি সর্দারের ডাণ্ডা বুলোবেনই বুলোবেন। একেই বলে পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়। এক্ষেত্রে তাঁর মৌলা মুরশিদ মিয়া নিক্সন। এতখানি সবিস্তর বুঝিয়ে বলার কারণ; এদানির আমার এক মিত্র, আইনকানুনে পয়লা নম্বরি খলিকে বললেন, তাঁর ঘুঘু মক্কেলরা পর্যন্ত পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয় তকমাটার অর্থ সঠিক ধরতে পারেননি! এই নিয়ে তিনে কত্তি তিন, তিন দফে এফিডেভিট পেশ করা হল।
