নিক্সন শাহ-এর মেহেরবানি পেয়ে বে-এক্তেয়ার। কোন চাড়াল বামুনের হাতে দৈবযোগে পৈতে পেলে– বুদু জানবে কী করে, বিটলেটা খাঁটি নদীয়ার মাল, না জিঞ্জিরা-মার্কা ভেজাল– উল্লাসে নৃত্যভারে ধানের মরাই খুলে দেয় না। অবশ্য নিক্সনের মুক্ত হস্তে ট্যাঙ্ক, প্লেন ঢালার অন্য কারণও আছে। কিন্তু তার গোড়ার গলদ, শাহকে একটা মস্ত বড় এডভেনচারার বলে ধরে নেওয়া।… বরঞ্চ সদর দাউদের যা-হোক তা-হোক একটা ক্যালিবার আছে। লোকটি এডভেনচারার এবং গ্যামবলার। অসম্ভবের আশায় তিনি সম্ভাবনীয়টাকে বাজি ধরতে রাজি আছেন।
.
ঐতিহাসিক দাবি
এবারে আমি যা বলতে যাচ্ছি, সেটা কোনও ঠাণ্ডা-মগজের লোক বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু যে সত্য আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ, যে সত্যের সমর্থন আমি দীর্ঘকাল ধরে পেয়ে এসেছি সেগুলো এই দাউদ-সুবাদে আমাকে বলতে হবে। বিশ্বাস না করলে কারও কোনও ক্ষতি হবে না।
(১) ১৯২৭ সালের গ্রীষ্মকালে আফগান স্বাধীনতা দিবসে (জশন্-এ) জনগণ তথা কাবুলস্থ সর্ব রাজদূতের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য গণসভায় আমান উল্লা ঘন ঘন করতালি হর্ষধ্বনির মাঝখানে নানা কথার মাঝখানে সদম্ভে সগর্বে বলেন, সিকন্দর শাহ পাঞ্জাব জয়ের পর বিরাট ভারত দখল না করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করল কেন? কারণ, আমরা আফগানরা– তার লেজ কেটে দিয়েছিলুম বলে, অর্থাৎ আফগানরা আলেকজান্ডারের লাইন অব ক্যুনিকেশন কেটে দিয়েছিল! বিগলিতাৰ্থ : আফগান জাত সিকন্দর-বিজয়ী।
(২) আফগানিস্তানের প্রাচীন ইতিহাস কোনও আফগান লিখেছেন কি না জানিনে। যে অর্বাচীন ইতিহাস কাবুলের স্কুল-কলেজে পড়ানো হয় তার পনের আনা, ভারতের গবেষণা-জাত, ভারতে লিখিত ইতিহাস থেকে আফগানাংশ কেটে বের করে, আফগান জাতির গৌরব-গরিমা শতগুণ বৃদ্ধি করে স্কুল হস্তে প্রলেপ লাগানো দম্ভোক্তি।
(৩) সাধারণ আফগান নিরক্ষর। কাবুল-কান্দাহারের স্কুলবয় সে ইতিহাসের দু পাতা পড়ে বিশ্বাস করে, ভারতে ইংরেজাধিকার না হওয়া পর্যন্ত ওই ভূখণ্ড ছিল আফগানিস্তানের কলোনি, জমিদারি– যা খুশি বলতে পারেন। মোদ্দা কথা : মুহম্মদ ঘোরির আমল থেকে, বিনয় যাদের ভূষণ নয়, তাদের মতে গজনির মাহমুদের কাল থেকে ইংরেজ কর্তৃক পাঞ্জাব বিজিত হওয়ার প্রাক্কাল পর্যন্ত আফগানিস্তান হিন্দুস্থানের ওপর রাজত্ব করেছে, সাতশো, মতান্তরে হাজার বৎসর ধরে। হ্যাঁ, কোনও কোনও আফগান রাজা দিল্লি-আগ্রায় কিছুকাল বাস করছেন বটে। যদি বলা হয় আর বলবেই-বা কোন্ উন্মাদ–বাবুর তো তুর্কোমান, তিনি তো পাঠান বা আফগান নন, তবে অতিশয় সংক্ষিপ্ত ও সরল উত্তর : বাবুর ছিলেন কাবুলের রাজা। সেই কাবুল-রাজ দিল্লি জয় করেন। কিন্তু মৃত্যুর সময় আদেশ দেন, তার মৃতদেহ যেন তার রাজধানী কাবুলে গোর দেওয়া হয়। এর পর আর কী প্রমাণ চাই? বাবুর যে কাবুলের রাজা ছিলেন, সেটা তো তর্কাতীত! পরের মীমাংসাগুলো প্রথম সিদ্ধান্ত থেকে পিল পিল করে বেরোয়।
(৪) ইংরেজ কর্তৃক ভারত শাসন একটা অতি আকস্মিক অতিশয় সাময়িক দুঃস্বপ্ন মাত্র। আফগানিস্তান পুনরায় তার হক্কের উপনিবেশ জয় করবে। ঘোরি, গজনবি, লোধি (লোদি) এ সব কওম, তাদের বাসভূমির নাম, এখনও কাবুলে নিত্যদিনের কাজকর্মে কথাবার্তায় ফিরে ফিরে আসে; হিন্দুস্থানে এসব ইতিহাসের শুষ্কপত্রে মুদ্রিত নামমাত্র। সরকারিভাবে প্রচারিত পাকিস্তানই-বা কি, আর ভারতই-বা কি, আর বাংলাদেশই-বা কি? আসলে সবকটা মিলে ওটা অখণ্ড হিন্দুস্থান (ভারতের কট্টর সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা এতবণে অবশ্যই নিরতিশয় উল্লাস বোধ করবেন!)। সেইটে আমাদের প্রাপ্য।
(৫) সরদার দাউদ খান কাবুলের ওয়ারিসানের এই অতিশয় সীমিত বিনয়ভরে দাবি-দাওয়ায় কতখানি বিশ্বাস করেন, জানিনে, কিন্তু তিনি যে-দশ-বৎসর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সে সময় স্বাধীন, বিকল্পে আফগানিস্তানের প্রদেশরূপে পখতুনিস্তান এবং পাকিস্তানের ভিতর দিয়ে করাচি অবধি করিডরের (পুরোপাক্কা সরকারি ওয়ারিসানসূত্রে) পুনঃপুন দাবি জানিয়ে তথাকথিত ইতিহাসপুষ্ট স্কুলবয়দের ড্যাম ফেভরিট হয়েছিলেন সেটা সর্ববাদীসম্মত। সে-সব বয়রা এখন ইসটুডিনট এবং ফৌজি আপিসর–এরাই নাকি দাউদের প্রধান সহায়ক।
আমি জানি, আসমুদ্রহিমাচল আফগানের এই দাবি, গৃহে প্রত্যাবর্ত আবুহোসেনের তখং দাবির মতো বুদ্ধির অগম্য, হাস্যকর বলে মনে করবে। তা হলে স্মরণ করিয়ে দিই প্রায় একশো বছর ধরে তৎকালীন ভারত-রাজ ইংরেজের সমুখে কাবুল-রাজ কখনও লাহোর-মুলতান, কখনও পেশাওয়ার-আটক্ অবধি দাবি করেছেন। ইংরেজের কাছে তখন ঠিক আজকের মতো ওই রকম দাবি বুদ্ধির অগম্য হাস্যকর বলে মনে হয়েছে।
আর সত্যি বলতে কী, কোন্ দেশে এ ধরনের দাবিদার একদম নেই? তারতম্য শুধু সংখ্যাতে এবং দাবির চৌহদ্দি নিয়ে। পঞ্চাশ বছর পূর্বে আমরা বুক ফুলিয়ে গিয়েছি, এখনও যে একেবারে ভুলে মেরে দিয়েছি তাই-বা কিরে কেটে বলি কোন হিম্মতে–
একদা যাহার বিজয় সেনানী
হেলায় লঙ্কা করিল জয়!
হেলায়!!
.
হাইকোর্ট দর্শনস্য দর্শনং
বাঙ্গালের হাইকোর্ট দর্শনের তবু একটা অর্থ আছে। কিন্তু যখন ইউরোপীয় এবং বিশেষ করে মার্কিন-বাঙ্গাল কলকাতা বা কাবুলের হাইকোর্ট দর্শনে যায় এবং সেখান থেকে দারুণ দারুণ রগরগে রিপোর্ট পাঠায় তখন বাঙ্গালকে তসলিম জানাতে ইচ্ছে করে।
