তাই ফ্রন্টিয়ার বেলুচিস্তানের নিম্ন ও মধ্যস্তরের রাজকার্য ব্যবসাদি হয় উর্দুতে। সেই কারণে উভয় প্রদেশের মাতৃভাষা উর্দু, এ বাক্য বদ্ধ উন্মাদও বলবে না। পাঠানকে শুধু প্রশ্নটি মাত্র শুধোলে তার মাতৃভাষা উর্দু কি না, সে রীতিমতো অপমানিত বোধ করবে, মোকা পেলে রাইফেল তুলবে। বেলুচের বেলাও মোটামুটি তাই। তবে বেলুচ জাত অপেক্ষাকৃত স্র এবং শান্ত। লোকমুখে শুনেছি ১৯৭১ সালে পুব বাঙলায় যে পাশবিক অত্যাচার হয়েছিল তাতে পাঞ্জাবি-পাঠানের তুলনায় বেলুচরা ছিল অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ। পশ্চিম-পাক বর্বরতার প্রধান পুরোহিত টিক্কা খান একবার বা একাধিকবার বেলুচিস্তানে শান্ত জনতার উপর প্লেন থেকে বোমা ফেলেছিলেন বলে তিনি লোকমুখে যে উপাধি পান সেটা টিক্কাজাতীয় অফিসারকুলের পক্ষে সাতিশয় শ্লাঘার খেতাব মার (বহুবার) অব বেলুচিস্তান। পরবর্তীকালে বাংলাদেশে তিনি পান লক্ষগুণে উচ্চ পর্যায়ের খেতাব বুচার অব বেঙ্গল।
এছাড়া বেলুচিস্তানের একটা ক্ষুদ্র অংশের লোক ব্রুহি উপভাষা বলে থাকে। ভাষাটি জাতে দ্রাবিড়। সুদূর দ্রাবিড়ভূমি থেকে এ ভাষার একটা পকেট এখানে গড়ে উঠল কী করে এ নিয়ে ভাষাবিদরা এখনও মাথা ঘামাচ্ছেন। এরা উর্দু শেখে ঢাকাবাসীর চেয়েও শতাংশের একাংশ।
সিন্ধিদের কথা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাদের ভাষা বিকশিত, সাহিত্য-সমৃদ্ধ। উত্তর ভারতের উর্দুর সঙ্গে সে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারে। তাই উর্দু শেখার জন্য তারা কখনও কোনও প্রয়োজন বোধ করেনি– নিতান্ত কয়েকজন মোল্লা মৌলবি ছাড়া এবং যেহেতু বহুকাল পূর্বে আরবদের সঙ্গে সিন্ধুবাসীর সমুদ্রপথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল ও ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সিন্ধি ভাষা সোজাসুজি বিস্তর আরবি শব্দ গ্রহণ করেছিল (পক্ষান্তরে উর্দুতার তাবৎ আরবি শব্দ গ্রহণ করেছে ফারসি মারফত, অতএব কিছুটা বিকৃতরূপে) তাই মোল্লামৌলবিরাও উর্দুর নামে অযথা বে-এক্তেয়ার হতেন না– গুজরাতি, মারাঠি, এমনকি কোনও কোনও বাঙালি মুসলমান যেরকম হয়ে থাকেন।
আমি মুক্তকণ্ঠে বলতে পারি, নাতিবৃহৎ পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতর ওই সিন্ধিরাই একমাত্র ভদ্র, বিদগ্ধ, আপন ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি।
এই যে ১৯৭১ নয় মাসব্যাপী পশ্চিম-পাকের সেপাই অফিসার রাজকর্মচারী পুব বাংলাকে ধর্ষণ করে গেল এর ভিতরে কোনও সিন্ধি ছিল বলে আমি শুনিনি। বিস্তর পূর্ববঙ্গবাসীদের আমি এ প্রশ্ন শুধানোর পরও। বস্তুত গত পঁচিশ বৎসর ধরে আমি প্রায়ই রাজশাহী, ঢাকা, সিলেট, চাটগাঁ, যশোর, খুলনা গিয়েছি কিন্তু কোনও সিন্ধি আর্মি অফিসার দূরে থাক, ছোট বা বড় কোনও চাকুরের সঙ্গে পরিচয়তক হয়নি। পুব বাঙলাকে সিন্ধিরা কস্মিনকালেও কলোনির মতো শোষণ করেনি।
সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল এবং এখনও আছে পাঞ্জাবিরা।
ব্যত্যয় নিশ্চয়ই আছে, তথাপি মুক্তকণ্ঠে বলব, এরকম তথাকথিত শিক্ষিত অথচ বর্বর জাত বহুদেশ ভ্রমণ করার পরও আমি কোথাও দেখিনি।
এদের সবাই বলবে তাদের মাতৃভাষা উর্দু। বরঞ্চ আমি যদি বলি আমার মাতৃভাষা ঋগ্বেদের ভাষা তবু আমি ওদের চেয়ে সত্যের অনেক কাছাকাছি থাকব।
উর্দু ভাষা জন্মগ্রহণ করে উত্তর প্রদেশের আগ্রা ও তার সংলগ্ন দিল্লিতে। ওই সময়কার পাঞ্জাবের বৃহৎ নগর লাহোর বা অমৃতসর উর্দুর কোনও সেবা করেনি। এবং এস্থলে এ তথ্যটাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত যে উর্দুতে হরিয়ানা অঞ্চলের দিল্লির প্রাধান্য, সেটা রাজধানী ছিল বলে। সর্বোত্তম উর্দু এখনও উত্তর প্রদেশের মলিহাবাদ অঞ্চলে উচ্চারিত হয় এবং সাহিত্য গড়ে উঠেছে দিল্লি এবং লক্ষ্ণৌয়ের প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার ফলে। পরবর্তীকালে এলাহাবাদ উর্দুর অন্যতম পীঠভূমি হয়ে দাঁড়ায় এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পিতামহ উর্দু সাহিত্যের যে সেবা করে গিয়েছেন সেটা অবিস্মরণীয়।
উর্দু জন্ম নেয় উত্তর প্রদেশের প্রাকৃত মায়ের কোলে। পাঞ্জাবে যে প্রাকৃত প্রচলিত সে এ প্রাকৃতের অনেক দূরের। লাহোর অঞ্চলে সে প্রাকৃতকে সম্পূর্ণ ভিন্ন নামে ডাকতে হয়। সিলেটি বাঙলা এবং রাঢ়ের বাঙলা একই প্রাকৃত থেকে। তাই সিলেটি উপভাষা সাধু বা চলিত বাঙলার ডায়লেক্ট। লাহোরের আচণ্ডাল নিজেদের মধ্যে যে পাঞ্জাবি বুলিতে কথা বলে সেটা উর্দুর ডায়লেক্ট নয়।
লাহোর অমৃতসর অঞ্চলগত প্রাকৃতের প্রকৃত মূল্য দিয়েছিলেন মাত্র একটি মহাজন। উত্তর প্রদেশে যে যুগে হিন্দি রীতিমতো উন্নত সাহিত্য ধারণ করত, উর্দুর কুচিৎ জাগরিত বিহঙ্গকাকলি আরম্ভ হয়ে গিয়েছে, সেই যুগে আমাদের এই মহাত্মা এসব কিছু সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আপন পাঞ্জাবের প্রাকৃত দৃঢ়ভূমির উপর নির্মাণ করলেন অজরামর গ্রন্থসাহেব।
তাবৎ পাঞ্জাবভূমি, পাকিস্তানি পাঞ্জাব হিন্দুস্থানি পাঞ্জাব সব মিলিয়ে দেখি যে এখানে মাত্র একটি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য আছে। শিখ সম্প্রদায়। আপন মাতৃভাষায় রচিত হয়েছে তাদের শাস্ত্রগ্রন্থ। শুনে বিস্মিত হয়েছি, শিখদের প্রতি বিরূপ বাদশা ঔরঙ্গজেব নাকি গ্রন্থসাহেব থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারতেন।
মোদ্দা কথা : পশ্চিম পাঞ্জাববাসীর মাতৃভাষা উর্দু তো নয়ই, তাদের মধ্যে যে ভাষায় কথাবার্তা হয় সেটা উর্দুর ডায়লেকটও নয়। অর্থাৎ তাদের মাতৃভাষা এখনও সাহিত্যের পর্যায়ে ওঠেনি। বরঞ্চ মার্কিন নিগ্রোদের অবস্থা ঢের ভালো, ইংরেজি ভিন্ন অন্য কোনও ভাষা বা উপভাষা তারা আদৌ জানে না, নিজেদের মধ্যেও ইংরেজি বলে।
