সংক্ষেপে বলতে গেলে বাধ্য হয়ে বলতে হয়, মাতৃভাষাহীন সদম্ভস্ফীত, অজ্ঞতামদমত্ত এই একটা বর্বর জাত রাজত্ব করার ছলে শোষণ করতে এসেছিল পুব বাঙলায় এমন একটা জাতকে যার ভাষা ও সাহিত্য সমৃদ্ধ এবং সম্পূর্ণ অবান্তর নয় বলে উল্লেখ করি, সে সাহিত্যের স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল প্রতিষ্ঠান যাকে বিশ্বস্বীকৃতিও বলা যায়।
.
উভয় বাঙলা– পুস্তকসেতুভঙ্গ
বঙ্গভূমিতে যদি কস্মিনকালেও সংস্কৃতের কোনও চর্চা না থাকত, তবে আজ বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য, বিশেষ করে গদ্য-সাহিত্য, নিশ্চয়ই এতখানি বিকাশ ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারত না। রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র হয়ে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সর্ব গদ্যলেখকই অত্যুত্তম সংস্কৃত জানতেন এবং ওই সাহিত্য থেকে কী যে গ্রহণ করেননি, তার নির্ঘণ্ট দেওয়া বরং সোজা। বস্তুত এ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দ্বিতীয় শ্রেণির লেখকও মধ্যম শ্রেণির সংস্কৃত জানতেন। এবং একালেও একাধিক সাহিত্যিক অনায়াসে সংস্কৃতের অধ্যাপক হতে পারেন। এবং বঙ্গসাহিত্যসেবী সংস্কৃত অধ্যাপকদের কথা তোলাই বাহুল্য। সংস্কৃতের সাহায্য না নিয়ে বাঙলা গদ্যের ক্রমবিকাশ আমরা কল্পনাই করতে পারিনে।
উর্দু ঠিক সেইরকম নির্ভর করেছে প্রধানত অতিশয় সমৃদ্ধ ফারসি সাহিত্য ও অল্পবিস্তর আরবির ওপর। তাই উর্দুর লীলাভূমি উত্তরপ্রদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে পাক-ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ দুটি মাদ্রাসা বহুকালের ঐতিহ্য নিয়ে, ও প্রধানত ধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষাদান করেছে। এদের আরবি-ফারসি চর্চা উর্দুর জন্মকাল থেকে সে সাহিত্যকে পরিপুষ্ট করেছে। মাইকেল যেরকম অত্যুত্তম সংস্কৃত জানতেন, গালিবও তদবৎ উচ্চাঙ্গের ফারসি জানতেন। এমনকি পাঞ্জাবের সবেধন নীলমণি কবি ইকবালও ফারসি দিয়ে আপন ঈষৎ কষ্টসাধ্য উর্দুকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
কিন্তু তাবৎ পাঞ্জাবের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি, এমনকি যে লাহোর পাঠান-মোগল আমল থেকে সমৃদ্ধিশালিনী নগরী, পাঞ্জাবের মুকুটমণি, মুসলমানদের সংখ্যাগুরুত্ব যেখানে অন্যান্য সম্প্রদায়কে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছিল সেখানেও কস্মিনকালেও পূর্ণাঙ্গ একটি মাদ্রাসা ছিল না– উর্দুকে রসদ-খোরাক যোগাবার জন্য, কারণ পূর্বেই বলেছি, পাঞ্জাবির মাতৃভাষা উর্দু নয়। পার্টিশেনের সঙ্গে সঙ্গে যেসব মৌলবি-মৌলানা উত্তর প্রদেশ থেকে শরণার্থীরূপে লাহোর পৌঁছলেন তাঁরা লাহোরের মাদ্রাসাটি দেখে বিস্ময়ে নৈরাশ্যে মূক হয়ে গেলেন। তুলনা দিয়ে বোঝাতে গেলে বলি, সে মাদ্রাসাটি ক্লাস সিক্স্ অবধি পড়াতে পারে, অর্থাৎ মাইনর স্কুলের মতো মাইনর মাদ্রাসা! সম্পূর্ণ অবান্তর নয়, তাই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিবেদন করি, পাঞ্জাবের তুলনায় যদিও পুব বাঙলা অতিশয় দীন, তবু সেই পুব বাঙলাতেই আছে, বহুকাল ধরে তিনটি পূর্ণাঙ্গ মাদ্রাসা ফের তুলনা দিয়ে বলি, পিএইচডি মান পর্যন্ত! ওদিকে মাইনর স্কুল এদিকে ডকটরেট! মাদ্রাসার সিস্ অবধি কতখানি ইসলামি শাস্ত্রচর্চা হওয়া সম্ভবে! উর্দুর সেবাই-বা করবে কতখানি? তারই ফলে পাঞ্জাবিদের কোনও দিক দিয়ে কোনও প্রকারের বৈদগ্ধের ঐতিহ্য নেই।
তারই দ্বিতীয় বিষময় ফল, যে পাঞ্জাবে মাদ্রাসার অভাবে শাস্ত্রীয় ইসলামের কোনও আবহাওয়া নেই। সেখানকার পাঞ্জাবি সিভিল, মিলিটারি অফিসাররা, তিনটে সমৃদ্ধশালী মাদ্রাসা এবং অগুণিত মাইনর মাদ্রাসার ওপর দণ্ডায়মান, ইসলামি আবহাওয়া দ্বারা পরিবেষ্টিত পুব বাঙলায় এসে দম্ভভরে সর্বত্র দাবড়াতে দাবড়াতে প্রচার করতে লাগল, তারাই পাক-ভারতের ইসলামি ঐতিহ্যের সর্বোত্তম মুসলমান, পুব বাঙলার মুসলমানরা মেরেকেটে আধা-মুসলমান কিংবা মুসলমানি নাম এরা ধরে বটে, কিন্তু আসলে কাফির! গত যুদ্ধের সময় পাঞ্জাবি-পাঠান সেপাইদের লাহোর পেশাওয়ারে শেখানো হয়েছিল, পুব পাক-এ মসজিদের ঢঙে নির্মিত এমারত দেখতে পাবে। সেগুলো একদা মসজিদ ছিল। পরবর্তীকালে ওদেশের লোক ইসলাম বর্জন করে, এবং বর্তমানে নামাজের অছিলা ধরে ভারতাগত কাফের এজেন্টদের সঙ্গে ওইসব এমারতে মিলিত হয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের সর্বনাশ। সাধনের জন্য ষড়যন্ত্র করে।
এসব তথ্য তত্ত্ব আমার মূল বক্তব্যের পক্ষে কিছুটা অবান্তর কিন্তু এগুলো থেকে বিশেষ করে হিন্দুপাঠকের বিস্ময় কঞ্চিৎ প্রশমিত হতে পারে মুসলমান সেপাই কী করে তাদেরও ধর্মালয় মসজিদে ঢুকে নামাজরত তাদের ধর্মভ্রাতা নিষ্ঠাবান মুসলমানদের মেশিনগান চালিয়ে মারল? নিশ্চয়ই কলকাতার বিস্তর হিন্দু স্বচক্ষে দেখেছেন পাঠান, পাঞ্জাবি, কাবুলি, বাঙালি সর্বদেশের মুসলমান চিৎপুরের একই নাখুদা মসজিদে ঢুকছে।
কিন্তু আমার মূল বক্তব্য : পুব বাঙলায় পশ্চিম বাঙলার বই ব্যান হল কীভাবে? তার অবতরণিকাতেই যদি বলি, লাহোরের ওই যে ক্ষুদে মাদ্রাসাটি লিকলিক করছিল, সে-ই এ লড়াইয়ের পয়লা বুলেট ফায়ার করেছিল, তবে বাঙালি পাঠকমাত্রই বিস্মিত হবেন, সন্দেহ কি!
উত্তর প্রদেশ থেকে লাহোরাগত মৌলবি-মৌলানারা নিজের স্বার্থেই হোক- মাইনর মাদ্রাসার তনখা তাঁদের পক্ষে হাস্যাস্পদ কিংবা ইসলামি চর্চা উচ্চতর পর্যায়ে তোলার জন্যই হোক, তাঁরা উঠেপড়ে লেগে গেলেন পুঁচকে ওই মাদ্রাসাটিকে উচ্চমানে তোলার জন্য।
