.
পূর্বেই প্রশ্ন করেছি, পশ্চিম পাকে উর্দু কই? এটার উত্তর দফে দফে বয়ান করি।
পুব বাঙলার বেদনা আরম্ভ হয় পয়লাই জিন্না সায়েবকে নিয়ে। স্বাধীনতা পাওয়ার কয়েক মাস পরে তিনি স্বয়ং এলেন বাংলাদেশে, ওই বেকার; বরবাদ বাংলা ভাষা আন্দোলনকে ঠেকাবার জন্য সেটি তখনও অঙ্কুরে। ঢাকার বুদ্ধিজীবীরা তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে করতে তাদের চক্ষু স্থির হতে স্থিরতর হতে লাগল। ভাষা বাবদে এ-হেন বেকুব (কটু বাক্যার্থে নয় : ওকিবহালের বিপরীত শব্দ বেকুবহাল বা বেকুব) তাঁরা উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে কস্মিনকালেও দেখেননি। বাংলা ভাষা ক্রমবিকাশের পথে কতখানি এগিয়ে গিয়েছে, বাংলাভাষা কতখানি সমৃদ্ধ, ওই ভাষা ও সাহিত্য দিয়েই পুব বাংলার মুসলমানের হাড়মজ্জা মগজ হিয়া নির্মিত হয়েছে এবং এর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি মুসলমান এখন পূর্ণ যুবক– এ সম্বন্ধে জিন্নার কণামাত্র ধারণা নেই। তিনি ধরে নিয়েছেন, ভাষা ও সাহিত্য বাবদে বাঙালি মুসলমান ছ মাসের শিশু; তাকে নিয়ে যদৃচ্ছ লোফালুফি করা যায়। তাঁর চোখের সামনে রয়েছে মার্কিন নিগ্রোদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এর কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় স্বয়ং জিন্নার এবং তার পরিবারে ভাষা বাবদে কোনওপ্রকারের পটভূমি বা ঐতিহ্যের ছিটেফোঁটাও নেই। তাঁর পরিবারের মাতৃভাষা কাঠিওয়াড়ি– সে উপভাষা গুজরাতির বিকৃত উপচ্ছায়া। তাঁর বাল্যকাল কাটে করাচিতে। সেখানকার ভাষা যদিও সিন্ধি তবু রাস্তাঘাটের ভাষা বহুভাষা মিশ্রণে এক বিকট জগাখিচুড়ি। তদুপরি করাচিবাসী কাঠিওয়াড়ি গুজরাতি, খোঁজা, বোরা, মেমনরা পঠন-পাঠনে সিন্ধিকে পাত্তাই দেয় না। জিন্না ছেলেবেলা থেকেই তাই দেখে আসছেন এই বত্রিশ জাতের যে কোনও ছেলেকে যে কোনও স্কুলে পাঠিয়ে যে কোনও ভাষা শেখানো যায়। যেরকম কলকাতার যে-কোনও মারওয়াড়ি বাচ্চাকে তামিল স্কুলে পাঠিয়ে দিব্য তামিলাদি শেখানো যায়। ভাষাগত ঐতিহ্য সম্বন্ধে পরিষ্কার ছবি এ হেন পরিস্থিতিতে জিন্নার চোখের সামনে ফুটে উঠবে কী করে? সর্বোপরি তিনি বুদ্ধিমান; কিশোর বয়সেই সম্যক হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছিলেন, তাঁর ভবিষ্যৎ যে-ভাষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী বিজড়িত সে-ভাষা ইংরেজি। তিনি মনপ্রাণ ওতেই ঢেলে দিয়েছিলেন এবং সে-ভাষায় নৈপুণ্য লাভ করেছিলেন।
ছেলেবেলায় করাচির আর পাঁচটা মুসলমান ছেলের মতো তাঁরও খানিকটে উর্দু শেখার কথা। কিন্তু তিনি কট্টর শিয়া, খোজা-পরিবারের ছেলে। উর্দুর প্রতি খোঁজাদের কোনও চিত্তদৌর্বল্য নেই। কাজেই বলতে পারিনে ছেলেবেলায় অন্তত কিছুটা উর্দু শিখেছিলেন কি না। তার পরিণত বয়স কাটে বোম্বাইয়ে। বলা বাহুল্য, কি করাচি, কি বোম্বাই উভয় জায়গারই উর্দু সাতিশয় খাজা মার্কা।
বেতার মারফত তার একটি উর্দু ভাষণ আমি শুনি পাকিস্তান জন্মের পর। সেটা শুনে আমি এমনই হতবুদ্ধি বিমূঢ় হই যে আমি তখন শে-শক-খাওয়া সেপাইয়ের মতো নিজের আপন মাতৃভাষা ভুলে যাই যাই, সে-হেন অবস্থায় এমনেজিয়া অর্থাৎ আচম্বিতে স্মৃতিভ্রংশতা রোগে। শেষটায় বিস্ময় বোধ হয়েছিল, যে লোক এতখানি ইংরেজি শিখতে পেরেছেন তিনি মাত্র ছ মাস চেষ্টা দিলেই তো অল্পায়াসে নাতিদ্ৰ চলনসই উর্দু শিখে নিতে পারেন। ইনি এই উর্দু নিয়ে উর্দুর প্রপাগান্ডা করলে বাংলাপ্রেমী মাত্রই বলবে, উর্দু এদেশে চালানোর বিপক্ষে আরেকটি সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া গেল। উর্দুপ্রেমী পশ্চিমা পূরবীয়া উভয়ই তখন লজ্জায় অধোবদন হয়েছিলেন।
ঢাকা, সিলেট সর্বত্রই তাঁর উর্দু ভাষণের ফল হল বিপরীত।
ঢাকা, সিলেটের লোক অত্যুত্তম উর্দু জানে না, মেনে নিচ্ছি। পাঠক, রাগ কর না, আমি যদি ধরে নিই, তুমি অক্সফোর্ডের ইংরেজি অধ্যাপকের মতো সর্বোচ্চাঙ্গের ইংরেজি জানো না; কিন্তু যদি ধরে নিই, তুমি এদেশের ক্লাস সিক্সের ছোকরার ইংরেজি আর অক্সফোর্ড অধ্যাপকের ইংরেজিতে তারতম্য করতে পার না তবে নিশ্চয়ই তুমি উম্মাভরে গোসসা করবে। ন্যায়ত, ধৰ্মত ॥
.
উভয় বাংলা– বর্বরস্য পূর্বরাগ
পূর্ব-পাক পশ্চিম-পাকের কলহ যখন প্রায় তার চরমে পৌঁছেছে তখন পশ্চিম-পাকের জনৈক তীক্ষ্ণদ্রষ্টা বলেছিলেন, আমি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পুব-পাক পশ্চিম-পাক দুই উইংই দেখেছি কিন্তু গোটা পাখিটাকে এখনও দেখতে পাইনি।
এরই সঙ্গে একই ওজনে তাল মিলিয়ে আরেকটি পরস্পর-বিরোধী নিত্য ব্যবহারযোগ্য প্রবাদপ্রায় তত্ত্বটি বলা যেতে পারে :
উভয় পাকেরই রাষ্ট্রভাষা উর্দু। কোনও পাকেই, এমনকি পশ্চিম পাকেরও কোনও প্রদেশবাসীর মাতৃভাষা উর্দু নয়।
পাঠকমাত্রই অন্তত বিস্মিত হবেন। কথাটা গুছিয়ে বলার প্রয়োজন আছে।
পশ্চিম পাকের চারটি প্রদেশের বেলুচিস্তানের ভাষা বেলুচ, ফ্রন্টিয়ার প্রদেশের ভাষা পশতু (বা পখতু), সিন্ধু প্রদেশের ভাষা সিন্ধি। সিন্ধি ভাষা উচ্চাঙ্গের সাহিত্য ধারণ করে।
বেলুচ ও পশতু ভাষায় ছাপা বই বা/এবং পাণ্ডুলিপি শতাধিক হবে না। কারণ এর অধিকাংশই আছে, লোকগীতি। শুধুমাত্র লোকগীতি দিয়ে একটা সম্পূর্ণ সাহিত্য তৈরি হয় না। এবং এগুলোও ছাপা হয়েছিল ইংরেজি নৃতত্ত্ববিদ-ঘ্যাঁষা অফিসারগণ দ্বারা কৌতূহলের সামগ্রীরূপে। মধ্য ও উচ্চশিক্ষিত বেলুচ, পশতুভাষী পাঠান এগুলোকে অবহেলা করে, বেশিরভাগ এসব সংকলনের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অচেতন। নিতান্ত পাঠশালার পড়ুয়া পড়ে কি না বলতে পারব না। আমাদের বটতলার সঙ্গে এদের কোনও তুলনাই হয় না। বটতলা শতগুণ বৈচিত্রধারী ও সহস্রগুণ জনপ্রিয়।
