বাংলাদেশের লোক কী পড়তে চায়, তার ফিরিস্তি অবশ্যই দীর্ঘতর।
যে ক মাস ঢাকায় কাটালুম তার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সে দেশে সবচেয়ে বেশি কাটতি দেশ পত্রিকার। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলে রাখা ভালো যে, বিশাধিক বৎসর কাল তারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় সর্বাবদে বিচ্ছিন্ন ছিল বলে দেশ-এর গল্প উপন্যাস ভ্রমণকাহিনী আধুনিক কবিতা, কিছুটা খেলাধুলোর বিবরণ এবং এদিক-ওদিক দু-একটি হালকা লেখা ছাড়া অন্যান্য রচনা, বিশেষ করে গবেষণামূলক প্রবন্ধের প্রতি নবীনদের চিত্তাকর্ষণ অপেক্ষাকৃত কম। তার প্রধান কারণ বাংলাদেশেই খুঁজতে হয়। এই বিশাধিক বৎসর ধরে তাদের আপন দেশেই সিরিয়াস রচনা গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে অত্যল্প। কাজেই এসব বিষয়ে নবীনদের রুচি সৃষ্টি ও অভ্যাস নির্মিত হবে কোথা থেকে? যুবজনের জন্য দেশ-এর মতো একটি পাঁচমেশালি পত্রিকা তাদের ছিল না যাতে করে কথাসাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো সাময়িক কৌতূহলবশত দু-একটি তথ্য ও তত্ত্বপূর্ণ প্রবন্ধাদি পড়ে ধীরে ধীরে ওদিকে রুচি বৃদ্ধি পেত এবং শেষ পর্যন্ত দু পাঁচজন প্রবন্ধ-পাঠক অবশেষে নিজেরাই গবেষক হয়ে যেত।… দেশ পত্রিকার প্রবন্ধ-পাঠক একেবারেই নেই সে ধারণা ভুল। কিন্তু যারা পড়েন। তাঁদের বয়স ৫০/৫৫-র উপরে। এঁরা কলেজে, পরে পূর্ণ যৌবনে তাদের চিন্তার খাদ্য আহরণ করেছেন প্রবাসী, ভারতবর্ষ ও পরবর্তীকাল থেকে পার্টিশেনের পরও কয়েক বৎসর দেশ থেকে। এঁরা আবার নতুন করে পশ্চিম বাঙলার ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঝালিয়ে নিচ্ছেন। আশা করা যায় যুবক-যুবতীরা ধীরে ধীরে এ দলে ভিড়বেন।
বলা একান্তই বাহুল্য রঙ্গজগৎ অংশটি তরুণ-তরুণীরা গেলে গোগ্রাসে এবং ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অতুষ্ণ্য তাদের মনস্তাপ– হায় কবে আসবে সে সুদিন যখন এ ফিল্মগুলো দেখব? যেসব স্টার গান গাইতে পারেন এবং প্লে-ব্যাক গাইয়েদের নাড়ি-নক্ষত্র তারা নিজেদের হাতের চেটোর চাইতে বেশি চেনে– কলকাতা বেতারের কল্যাণে।
বস্তুত বলতে গেলে ঢাকা ও কলকাতা বেতার এই দুটি প্রতিষ্ঠান মাত্র দুই বাঙলাকে একে অন্যের খবর দিয়েছে, গল্প গান কথিকা শুনিয়েছে নানাপ্রকার ব্যানের ওপর দিয়ে, হাওয়ায় হাওয়ায় পঁচিশটি বছর ধরে।
তার পূর্ণ ইতিহাস লিখতে গেলে পুরো একখানা কেতাব লিখতে হয়।
.
উভয় বাঙলা– বিসমিল্লায় গলদ
গত পঁচিশ বত্সর ঢাকা এবং কলকাতা কে কতখানি রসসৃষ্টি করেছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পুস্তক প্রকাশ করেছে সে নিয়ে তুলনা করা নিতান্তই অসঙ্গত। এই পঁচিশ বছর ধরে পূর্ব বাঙলাকে একসঙ্গে চালাতে হয়েছে লড়াই এবং পুস্তক লেখন। অদ্ভুত সমন্বয় বা দ্বন্দ্ব। সেপাই কলম জিনিসটাকে বিলকুল বেফায়দা জানে বলে টিপসই দিয়ে তনখা ওঠায়, আর কবি, যদিও-বা তিনি বীররস সৃষ্টি করার সময় তরবারি হস্তে বিস্তর লম্ফঝম্প করেন তবু তিনি জানেন, ও জিনিসটা একদম বেকার– ওটা দিয়ে তার পালকের কলম মেরামত করা যায় না। বাংলাদেশের লেখক, চিন্তাশীল ব্যক্তি, এমনকি পাঠককেও লড়াই করতে হয়েছে অরক্ষণীয়া বাঙলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে, এবং প্রথম দুইশ্রেণির লোককে সঙ্গে সঙ্গে লিখতে হয়েছে পাঠ্যপুস্তক থেকে আরম্ভ করে হিউ এন সাঙ বর্ণিত ময়নামতি-লালমাই সম্বন্ধে গবেষণামূলক পুস্তক পূর্ব পাকিস্তান জন্ম নেবার প্রথম প্রভাত থেকে। একই ব্যক্তি কভু রণাঙ্গণে, কভু গৃহকোণে।
প্রথম দিন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান শ্লোগান তুলেছে, এক রাষ্ট্র, এক ভাষা, এক প্রভু (কাঈ-ই-আজম = জিন্নাহ)। অর্থাৎ পুব বাঙলায় চালানো হবে উর্দু এবং বাঙলাকে করা হবে নিমূল। আমেরিকার নিগ্রোরা যেরকম তাদের মাতৃভাষা ভুলে গিয়ে ইংরেজি গ্রহণ করেছে, পূর্ব বাঙলার তাবল্লোক হুবহু সেইরকম বাঙলা সর্বার্থে বর্জন করে উর্দু গ্রহণ করবে। জানিনে, পুব বাঙলার মাঝির প্রতি তখন পশ্চিম পাক থেকে কী ফরমান জারি হয়েছিল– তারা ভাটিয়ালি সুরে উর্দুভাষায় গীত গাইবে, না কিসুদ্দ উর্দু গজল কাসিদা গাইবে উর্দু ঢঙে
কিন্তু মাঝির উর্দুই হোক, কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যানসেলারের উর্দুই হোক, সে উর্দু শেখাবে কে? নিশ্চয়ই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু কই?
বাঙালি পাঠক এস্থলে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হবেন। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আমি বেশ বুঝতে পারছি, পুব বা পশ্চিম পাকের এসব ইতিহাসের প্রতি আমার নিত্যদিনের সরল পাঠকের বিশেষ কোনও চিত্তাকর্ষণ নেই। কিন্তু তবু আমাকে বেহায়ার মতো এসব রসকষহীন কাহিনী শোনাতেই হবে। (যতদিন-না সম্পাদক মহাশয়ের মিলিটারি হুকুম আসে হ-লু-টদীর্ঘ বাইশ বছর ধরে তিনি এ-ফরমান কখনও জারি করেননি, কিন্তু তাঁরও ধৈর্যের সীমা আছে, তিনি হট হুঙ্কার ছাড়া মাত্রই আমি হুস করে আমার জীবনব্যাপী সাধনার ধন গাঁজা-গুল কেচ্ছার ঊধ্বস্তরে পুনরপি উড়তে আরম্ভ করব)। কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস : দুই বাঙলা ক্রমে ক্রমে একে অন্যের কাছে আসবে। পঁচিশ বৎসরের বিচ্ছেদের পর নতুন করে একে অন্যকে চিনতে হবে। এই দীর্ঘকালব্যাপী তারা যে দুঃখ-দুর্দৈবের ভিতর দিয়ে গিয়েছে তার কাহিনী আমাদের জানতে হবে। নইলে ব্যাপারটা হবে এই : আমার যে বাল্যবন্ধু পঁচিশ বৎসর ধরে আমার অজানাতে অর্থাভাবে অনাহারে অম্লাহারে অকালবৃদ্ধ হয়ে গিয়েছে, তাকে পথমধ্যে হঠাৎ পেয়ে যতই-না দরদি গলায় শুধোই, তবু শোনাবে নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের মতো, হা রে, আদ্দিন ধরে স্বাস্থ্যের কী অবহেলাটাই-না করেছিস? একবার ঘুরে আয় না দার্জিলিং। ঠিক তেমনি হবে, আজ যদি বাংলাদেশের কোনও সাহিত্যসেবীকে বলি, কী সায়েব, পঁচিশ বৎসর পাঞ্জাবিদের সঙ্গে দোস্তি দহরম মহরম করে বাঙলা ভাষাটাকে করলেন বেধড়ক অবহেলা। এইবারে শুরু করে দিন বাঙলার সেবা কোমর বেঁধে। গোটা দুই সাহিত্য পরিষদ গড়ে তুলতে আর ক মাস লাগবে আপনাদের? গোটা তিনেক দেশ— একটাতে আপনাদের হবে না। আর আনন্দবাজারের বিক্রি-সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারেন আপনারা তুড়ি মেরে। আপনাদের দেশ বিরাট, জনসংখ্যা এন্তের।
