.
দলপতি মাত্রই আর্টিস্ট
এইসব এডভেনচারারদের সম্বন্ধে এতখানি সবিস্তর লেখার কারণ এই যে, পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয় এ ধরনের লোক এখনও লুপ্ত হননি। এদের সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ ওয়াকিবহাল হতে হলে এদের ক্রমবিকাশ লক্ষ করতে হয়। এডভেনচারার হওয়া মাত্রই এঁদের সর্বপ্রথম কর্ম হয় সাঙ্গোপাঙ্গ জোগাড় করা। ঐতিহাসিক মাত্রেরই বিস্ময়ের অবধি নেই, চব্বিশ বছরের অপদার্থ যে-ভ্যাগাবণ্ড স্বদেশ অস্ট্রিয়া ত্যাগ করে মনিকে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যে পূর্ববৎ আশ্রয়-সম্বলহীন ট্রাম্প, সে কী করে তার চতুর্দিকে অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের মধ্যে ঝাঁকে ঝাকে হরেক রঙের চিড়িয়া জোগাড় করে ফেলল? এবং সম্পূর্ণ অবিশাস্য বলে মনে হয়, তার ভিতর ছিলেন সে যুগের দুই নম্বরের জঙ্গিলাট জেনারেল লুডেনডর্ফ। অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, আমরা যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করেছি, দ্বিতীয় পর্যায়ে পাই তারই বাহ্য প্রকাশ। এখানে দুঃসাহসিক ভাগ্যান্বেষীকে আর্টিস্টরূপে আত্মপ্রকাশ করতে হয়। আর্টিস্টের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ঋষি তলস্তয় বলেছেন, যে ব্যক্তি আপন অনুভূতি অন্যজনের ভিতর সঞ্চারিত করতে পারে সে আর্টিস্ট। হিটলার তার আত্মবিশ্বাস যে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির নর-নারীতে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে সঞ্চারিত করবার মতো অলৌকিক শক্তি ধারণ করতেন সে সত্য তাঁর নিকটবর্তী প্রচ্ছন্ন শত্রুরা পর্যন্ত নিরতিশয় ক্ষোভ ও উম্মার সঙ্গে স্বীকার করেছেন….. বাবুরের সে টেকনিক বিলক্ষণ আয়ত্তাধীন ছিল, তদুপরি ভাগ্যান্বেষণের অরুণোদয় থেকেই তাকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নামতে হয়েছে। অসিহস্তে অশ্বপৃষ্ঠে রণাঙ্গনে যেখানেই সঙ্কটময় অবস্থা সেখানেই তিনি নির্ভয়ে তীরবেগে উপস্থিত হয়েছেন, যে কারণে একাধিক পরাজয়ের পরও দূরদর্শীজন তাঁকে পরিত্যাগ করেনি।
.
সাবধান! ভেজাল চিনে নেবেন!
অদ্যকার ভুট্টো, ইরানের শাহ বাবুরের তুলনায় শিশু। নিতান্তই যোগাযোগ এবং হতবুদ্ধি মজ্জমান জুন্তার শেষ ত্রাণ-তৃণ-খণ্ডরূপে প্রথম জনের কর্তৃত্ব লাভ, দ্বিতীয়জনও দ্রুতবেগে পলায়নের পর অবশেষে রুশের সদয় নিরপেক্ষতা ও ইংরেজের প্রতি নতিস্বীকার, এই দুই গ্রহের যোগাযোগের ফলে আপন পূর্ব সত্তায় প্রত্যাগমন। আমার মন লয়, কৈশোরে চতুরঙ্গ খেলায় গজচক্র অশ্বচক্র বড়েচক্র পুনঃপুন ভেঁকিবৎ ভক্ষণ করার পর, আপন আপন দেশে যখন গেলবার মতো আর কোনও চেঁকি কোনও চাষিবউই তামাশা দেখবার তরেও দিতে রাজি হল না, তখন দু জনাই সহজতর কূটনীতি-চতুরঙ্গ-অঙ্গনে রঙ্গ-ব্যঙ্গে সঙ্গ দিলেন। একে অন্যকে।
নিক্সন আর পাঁচটা ভুইফোড় মার্কিনের মতো খানদানি মনিষিদত্ত বাদশাহি হাতের পিঠ চাপড়ানোটা পাবার তরে হামেহাল বড্ডই ছোঁক ছোঁক করেন। তদুপরি, আড়াই-তিন হাজার বছরের প্রাচীনস্য প্রাচীন রাজসিংহাসনে আসীন– জানিনে, হয়তো কুল্লে দুনিয়ার প্রাচীনতম মনার্কি, যদ্যপি বর্তমান শাহটির পিতামহ-প্রপিতামহের প্রস্তাব তুলছিনে সম্বন্ধে কৌতূহল প্রকাশ করলে শাহ-ইন-শাহের অনুগতজন অকস্মাৎ সাময়িক স্মৃতিস্তম্ভন বা আংশিক বধিরতায় আক্রান্ত হন। সর্বোপরি প্রশ্ন, দেড় হাজার বছরের প্রাচীন পেহলভি (সংস্কৃতে পহলবি) খেতাব হঠাৎ করে ভুড়ভুড়ি দিয়ে উঠল কোন রসাতল থেকে? একদা যেরকম তারই অক্ষম অনুকরণে গওহরি মহিমায় আড়াই-তিন হাজার বছরের পুরনো গান্ধার (প্রাচীন পেশাওয়ার-জালালাবাদ অঞ্চল) ফান্দার আমাদের মতো গাইয়া বেকুবদের চমক লাগবার তরে মরা লাশে ভূতের মতো চাড়া দিয়ে উঠেছিল? এর খাতিম উল-খিতাব হয়, যদিস্যাৎ অকস্মাৎ সদর-ই আলা ভুট্টো তার এলাকার পঞ্চসহস্রাধিক বর্ষীয় মোন-জো-দভোর বলদ-মার্কা সিল সেঁটে কিছু একটা পাঁচহাজারি মনসব তলব করে তাবৎ পাপী-তাপী পাকিজনকে শরিফ উল্-আশরাফ খানদানে তুলে নেন।
.
প্রাণনাথ ডাকো
শ্রুতিধর পাঠক! অস্বীকার করতে পারবে না, এইমাত্র সেদিন আমি তোমাকে ফেয়ার ওয়ার্নিং দিয়েছি, গুলতানি না করতে পারলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। এবং আফসোসের কথা, বর্তমান গুলটি খুব সম্ভব তোমার ন সিকে চেনা। কিন্তু পাঠক, আমরা সব্বাই চেনা জন, চেনা জিনিসকেই কি বেশি পছন্দ করিনে? মেলায় গিয়ে চেনা জনের মুখ খুঁজি, অচেনা লাইব্রেরিতে ঢুকলে তার দাম যাচাই করি চেনা বইয়ের সন্ধান নিয়ে, গোরস্তানে খুঁজি মরহুমদের চেনা নাম। তবু অতি সংক্ষেপেই সারছি। বাঙ্গাল গেছে শেয়ালদ বাজারে ঘটির তরকারি পট্টিতে। বাইগনের সের কত? ঘটি হেসে কুটি কুটি। বাইগন! কী কইলে মাইরি! বাঙ্গাল– চটিতং : ক্যান, কইছি তো কইছি, অইছে কী? ঘটি : ছোঃ! কিবা নাম, বাইগন! বেগুন–আহা, কী মিষ্টিই না শোনায়! বাঙ্গাল– উচ্চহাস্যে : হঃ! মিষ্টি নামেই ডাকবা তয় প্রাণনাথ ডাকো না ক্যান? স্যার কত প্রাণনাথের? ডাঙ্গর ডাঙ্গর প্রাণনাথ গুলাইন?
শাহ, গওহর, গদিটা আরেকটু দড় হলে মিস্টার ভুট্টোও সবাই এ নীতিতে আমাগো প্রাণনাথ নীতির প্রবর্তক প্রাণনাথ বাঙ্গালের অতিশয় অনুগত বশংবদ শাকরেদ। খানদানি খেতাবই যদি লইবা, তয় লওনা কইলজাড়া ভইরা পুরানার পুরানা, হিডারও পুরানা খানদানি খেতাব। হিটলারও বলেছেন, মিথ্যে যদি বলতেই চাও তবে পাতি মিথ্যে বল না। বল পাড় মিথ্যে–ইয়াব্বড়াবড়া কেঁদে কেঁদো মিথ্যে। মিথ্যেটা যত বিরাট কলেবর হবে, পাবলিক গিলবে সেটা তত সহজেই।
