পরবর্তীকালে বুঝেছি ওই একই ডাক অন্যরূপে :
পথে যেতে ডেকেছিলে মোরে
পিছিয়ে পড়েছি আমি,
যাব যে কী করে ॥
এসেছে নিবিড় নিশি,
পথরেখা গেছে মিশি–
সাড়া দাও, সাড়া দাও।
আঁধারের ঘোরে ॥
এই তো বুড়িগঙ্গার পাড়। এখানে জলরেখা গেছে মিশি। কতজন কাতর কণ্ঠে বার বার মিনতি জানাচ্ছে, সাড়া দাও, সাড়া দাও।
তার পর একদিন আসে যখন আর সে সাড়া দেয় না।
কতশত নিরীহ প্রাণী অকালে এই বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে গেল মাত্র সেদিন।
এখনও কত শত পাগলিনী মাতা, সাড়া দাও, সাড়া দাও রবে ডাকছে।
আরও কত মাতা গৃহকোণে বসে আশায় আশায় আছে, একদিন সাড়া পাবে।
আমি খুব ভালো করেই জানি, কোন দিন কোন প্রহরে তাকে গুলি করে মেরে বুড়িগঙ্গার গভীরে তাকে জানাজার নামাজ না শুনিয়ে গোর দেয়!
কিন্তু কী করে সেকথাটা তার মাকে বলি?
আর না বলে কী করে প্রতিদিন তার সাড়ার আশাটা মায়ের বন্ধ চোখে দেখি?
উভয় বাঙলা
হুস করে দুটো মাথার উপর দিয়ে পঁচিশটি বছর কেটে গেল। উভয়েই তন্দ্রাতুর, নিদ্রামগ্ন। কিন্তু ন্দ্রিাভ্যাস রিলেটিভ– কোনও কোনও ক্ষেত্রে। গীতাও বলেছেন, যা নিশা ইত্যাদি। পুব বাঙলা এবং পশ্চিম বাঙলা দু জনাই ছিলেন একে অন্যের সম্বন্ধে অচেতন সুষুপ্তি-দুঃস্বপ্ন মিশ্রিত ন্দ্রিাতুর অবস্থায়। অথচ যে যার আপন কাজকর্ম করে গিয়েছে আপন মনে। পঁচিশ বৎসর ধরে।
ঘুম ভেঙেছে। রিপ ভান উইঙ্কলের ঘুম ভেঙেছিল এক মুহূর্তেই কিন্তু তার ঘরবাড়ি আত্মজন এবং গোটা গ্রামকে চিনে নিতে তার সময় লেগেছিল অনেকটা। কিন্তু তার বিচরণক্ষেত্র ছিল সীমাবদ্ধ। যতটা সময়ই লাগুক সেটা ছিল মাত্র একজনের সমস্যা।
দুই বাঙলা বিরাট দেশ। জনসংখ্যা প্রচুরতম। একে অন্যের চেনবার জানবার জিনিস বিস্তর! সুতরাং সে কর্ম সমাধান করতে ক বৎসর লাগবে সেটা বলা কঠিন। এবং সেটাও যে রুটিনমাফিক মসৃণ পন্থায় অগ্রসর হবে সে সত্যও শপথ গ্রহণ করে বলা চলে না। আমরা প্রতিবেশী। খ্রিস্ট আদেশ দিয়েছেন, প্রতিবেশীকে ভালোবাস।
কারণ তিনি জানতেন, প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে পারাটা দূরে থাক, বহু ক্ষেত্রে সহ্য করাটাই সুকঠিন। দূরের জন আমার বাড়ির শখের বাগানটাকে ডিমের খোসা কাঁঠালের ভূতি ফেলে ফেলে তার প্রাইভেট আঁস্তাকুড়ে রূপান্তরিত করতে পারে না, আমার অর্ধাঙ্গিনীর দ্বিপ্রহরাধিক স্বতশ্চল বিকট বেতারের উৎকট চিৎকার দূরজনের পরীক্ষার্থী পুত্রের অধ্যয়ন প্রচেষ্টাকে লণ্ডভণ্ড করতে পারে না। প্রতিবেশীর ঝি পারে, গৃহিণীর বেতার পারে। অতএব গোড়ার থেকেই কিঞ্চিৎ সচেতন সমঝোতা মেনে নিয়ে পুনঃপরিচয়ের ভিত্তিস্থাপনা করতে হবে। আর এ-ও তো জানা কথা।
নূতন করে পাবো বলে
হারাই ক্ষণে ক্ষণ।
এক্কেবারে সর্বক্ষেত্রে যে হারিয়েছিলুম তা নয়। এখানকার বিশেষ সম্প্রদায় এই পঁচিশ বৎসর ধরে যে কোনও সময়ে বলে দিতে পারতেন নারায়ণগঞ্জে এই মুহূর্তে শেয়ারবাজারে জুট মিলের তেজিমন্দির গতিটা কোন বাগে। এ-পারের বিশেষ সম্প্রদায়ও তদ্বৎ বলতে পারতেন এ-পারে টেপাতার চাহিদা রফতানির ওজনটা কোন পাল্লায় বেশি।
কিন্তু হায়, দেশ পত্রিকার সম্পাদক, ১০০% পাঠককুলের ৯৯% পাট ও টেণ্ড সম্বন্ধে উদাসীন। বহু গুণীন তাই বলেন বাঙালির এই উদাসীনতাই তার ভবিষ্যৎ ঝরঝরে করে দিয়েছে।
যতদিন সে শুভবুদ্ধির উদয় না হয় ততদিনও কিন্তু বর্তমান সত্যকে অস্বীকার করা যায় না। দেশ পত্রিকার পাঠক চায় জানতে ওদেশে উত্তম উত্তম উপন্যাস গল্প কী বেরুল এই পঁচিশ বৎসরে? যদিও তারা লেখে বাঙলাতেই তবু তাদের সুর ভিন্ন, সেটাতে নতুন কিক থাকে, বীরভূমের খোয়াইডাঙা গরুর গাড়ি, ওদিককার নদী-বিল নৌকো দুটোর রঙ তো এক হতে পারে না। এক রবীন্দ্রনাথে ব্যত্যয়। তাঁর জীবনের প্রথমাংশ কাটে জলচরের দেশে নদীপাড়ে, শেষাংশ কাকড়ধুলোর দেশে খোয়াইয়ের পাড়ে। কিন্তু তিনি তাঁর অলৌকিক প্রতিভা দিয়ে করেছেন দুটোরই সমন্বয়। অন্য লেখকদের বেলা দুটোর রঙ আলাদা আলাদা থাকে।
অন্যরা চান ওপারের কাব্য নাট্য ও বিভিন্ন রসসৃষ্টি। পণ্ডিতরা চান প্রাচীন কবিদের ছাপাতে প্রথম আত্মপ্রকাশ, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারো জিনিস যা পুস্তকের মাধ্যমে জ্ঞান ও তথ্য বিতরণ করে। বললে পেত্যয় যাবেন না, কলকাতারই এক যুবা আমাকে একদা জিগ্যেস করছিল, পুব বাঙলায় যে ইরি (ইন্টারনেশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটুট না কী যেন পুরো নাম) ধান ফলানো হচ্ছে সে সম্বন্ধে আমার কাছে মুদ্রিত কোনও কিছু আছে কি না? (এস্থলে যদিও অবান্তর তবু একটা খবর অনেককেই রীতিমতো বিস্মিত করবে : বাংলাদেশের একাধিক বিশেষজ্ঞজন বলছেন, বর্ষাকালের আউশ ধান আমাদের বৃহত্তম পরিমাণে উৎপন্ন খাদ্য। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল অতিবৃষ্টি বন্যা এবং অনাবৃষ্টির ওপর। পক্ষান্তরে হেমন্তের আমন যদিও আউশের তুলনায় উৎপাদন অনেক কম তবু তার একটি মহৎ গুণ যে পূর্বোক্ত ওইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর নির্ভর করে না। অতএব আমাদের উচিত আউশের তুলনায় প্রচুরতম আমন ফলানো– এককথায় পূর্ব ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণ পাল্টে আমন হবে আমাদের প্রধান চাষ ও আউশ নেবে দ্বিতীয় স্থান। অবশ্য তার জন্য দরকার হবে লক্ষ লক্ষ ট্যুবওয়েল। শেষ পর্যন্ত তাই যদি হয়, তবে হাজার হাজার বৎসরের প্রাচীন প্রাকৃতিক ব্যবস্থা মানুষ দেবে পাল্টে– সেটাতেই জাগে আমাদের মতো অজ্ঞজনের বিস্ময়!)
