কী জানি? কে জানে? হয়তো তিনি তখন বৃহত্তর ব্যাপকতর স্লটার-ভূমির স্বপ্ন দেখছিলেন।
.
বুড়িগঙ্গা
ঢাকা শহরের সৌন্দর্য আর মাধুর্য শুধু এ শহরের আপনজনই হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে পারে। ঢাকার আবহাওয়ার সঙ্গে, ধরুন বর্ধমানের কণামাত্র সাদৃশ্য নেই–যদিও দুটিই বিশাল বঙ্গের দুই নগর। বর্ধমান-বীরভূমের সৌন্দর্যে রুদ্রের প্রচণ্ড প্রখরতা– ঢাকার সৌন্দর্য তার লাবণ্যে।
ঢাকা, মৈমনসিং, সিলেট খাঁটি বাংলা কিন্তু তার আস বাঁশ তার আমজাম তার রিমঝিম বারিপাত তার একান্ত নিজস্ব। অথচ এ-ও জানি এ দেশের লতা-পাতা ফল-ফুল পশু-পক্ষী কেমন যেন মণিপুর, আরাকান, বর্মার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে বেশি। এসব দেশের সঙ্গে ঢাকা-চাটগার পরিচয় বহুদিনের কিন্তু আমার মনে হয় মাত্র এক শতাব্দী হয় কি না হয় ঢাকার শৌখিন লোকের খেয়াল গেল, বৰ্মা-মালয় থেকে অচেনা গাছপালা, তরুলতা এনে এখানে বাঁচানো যায় কি না। কারণ এতদিন এরা পশ্চিম থেকেই এনেছে এসব, এবং এদেশের বড় বেশি সঁতসেঁতে আবহাওয়াতে সেগুলোর অনেকেই মারা যেত কিংবা মুমূর্ষরূপে মানুষের হৃদয়ের করুণা জাগাত মাত্র। পক্ষান্তরে আশ্চর্য সুফল পেল ঢাকার তরুবিলাসী জন বর্মা-মালয়ের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনা করে। তার পর এল আরও নানান দেশ থেকে নানান রকমের গাছ।
বসন্তকাল মিটফোর্ড পাড়ার বারান্দায় বসে আছি সন্ধেবেলা। বাঁশের ফ্রেমে লতিয়ে উঠেছে পল্লবজাল। স্নান গোধূলিটি অন্ধকারে গা-ঢাকা দিতে না দিতেই অচেনা এক মৃদু গন্ধ যেন ভীরু মাধবীর মতো আসিবে কি থামিবে কি করে করে হঠাৎ সমস্ত বারান্দাটায় যেন জোয়ার লাগিয়ে দিল। হায়, আমি বটানির কিছুই জানিনে। গৃহলক্ষ্মী ক্ষণতরে বাইরে এসেছিলেন। নামটা বললেন। সঙ্গে সঙ্গে ভুলে গেলুম।
অন্ধকার ঘনিয়ে এল। বুড়িগঙ্গার জল আর দেখা যাচ্ছে না। ওপারে একটি-দুটি তারাও ফুটতে আরম্ভ করেছে– যেন সমস্ত রাত ধরে এপারের ফুলকে সঙ্গ দেবে বলে। একমাত্র ওই তারাগুলোই তো সব দেশের উপর দিয়ে প্রতি রাত্রে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি পাড়ি দেয়। তারা চেনে সব ফুল, সব গাছ, সব মানুষ। মনে পড়ল, একদা বহু বহু বৎসর পূর্বে কাবুলের এক পান্থশালায় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল প্রায় প্রথম আলোর চরণধ্বনির সঙ্গে, একবুক অচেনা ফুলের গন্ধ নিয়ে ঝাপসা ঝাপসা দেখেছিলুম অচেনা গাছ, অজানা পল্লব, বিচিত্র ভঙ্গির ভবন অলিন্দ, সম্পূর্ণ অপরিচিত পাখির কুহু কেকার অনুকরণ। আমার। অধঃচেতন একাধিক ইন্দ্রিয়ের ওপর অচেনার এই আকস্মিক অভিযান যেন বিহ্বল বিকল করে দিয়েছিল আমাকে। দেশের কথা মায়ের কথা সঙ্গে সঙ্গে মনে এল। ঠিক এই সময়ে দেশের বাড়িতে ঘুম ভাঙলে শুনতে পেতুম মা আঙিনায় গোলাপঝাড়ের নিচে জলচৌকিতে বসে বদনার পানি ঢেলে ঢেলে ওজু করছে। কখনও-সখনও চুড়ির ঠুংঠুংও শুনেছি। একেবারে অবশ হয়ে গেল সমস্ত দেহমন।
এমন সময় আল্লার মেহেরবানিতে চোখ দুটি গেল ঊর্ধ্বাকাশের দিকে। দেখি, অবাক হয়ে দেখি, সেই পরিচিত অতিপরিচিত এ জীবনে আমার প্রথম কৈশোরের প্রথম পরিচয়ের নক্ষত্রপুঞ্জ— কৃত্তিকা। সেটা কিন্তু তোলা নাম। তার আটপৌরে ডাকনাম সাত ভাই চম্পা। একমাত্র রবীন্দ্রনাথের কাব্যেই পেয়েছি সে জনপদবধূর প্রিয় নাম,
–ওরে, এতক্ষণে বুঝি
তারা ঝরা নিঝরের স্রোতঃপথে।
পথ খুঁজি খুঁজি
গেছে সাত ভাই চম্পা—
সাত ভাই চম্পা চলেছে ছায়াপথ বা আকাশগঙ্গার পিছে পিছে– তারই উল্লেখ করলেন কবি তারা ঝরা নিঝরের স্রোতঃপথ বর্ণনা দিয়ে। আর এই যে-দেশে এসেছি গ্রহ তারকার যোগাযোগে, সে দেশের রাজা আমানুল্লার রানির নাম সুরাইয়া, কৃত্তিকার আরবি নাম। তাঁকে ধরবে বলে পিছনে ছুটেছে রোহিণী, আরবদের জ্যোতিষশাস্ত্রে আল-দাবরান। কাবুলে সে দেখা দিল দু বৎসর পরে।
সাত ভাই চম্পা আমাকে চেনে আর বুড়িগঙ্গার পারে নির্বাসিতা ওই বিদেশি ফুলকেও চেনে।
না, ভুল করেছি। দু-একটি তারা যে নড়তে-চড়তে আরম্ভ করেছে। এগুলো ওপারের নৌকোর আলো। অথচ ওই আলোগুলোর একটু উপরের দিকে তাকালেই দেখি, আকাশের তারা। অন্ধকার এত নিবিড় যে এই মাটির আলো আর আকাশের আলোর মিতালি ছাড়া আর-কিছু চোখে পড়ে না।
এ পাড় থেকে মাঝে মাঝে কানে আসছে কে যেন কাকে ডাকছে। সাড়াও পাচ্ছে। রাত ঘনিয়ে আসছে। হাটবাজার শেষ হতে চলল। এইবারে বাড়ি ফেরার পালা। চারদিকে গভীর নৈস্তব্ধ্য।
দিনের কোলাহলে
ঢাকা সে যে রইবে
হৃদয়তলে।
কবি এখানে ঢাকা অন্য অর্থে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু নগর অর্থে নিলেও কোনও আপত্তি নেই। কারণ তার পরই কবির কথামতো।
রাতের তারা উঠবে যবে
সুরের মালা বদল হবে।
ওই তো হচ্ছে, ওই ওপারে, তারা প্রদীপের মালার বদল। স্বর্গের দেয়ালির গন্ধে পৃথিবীর দেয়ালিতে মিলে আলোক শিখীর আলিম্পন।
নিবিড় অন্ধকারে যখন মানুষ ভরা চোখ টাটিয়েও কিছুই দেখতে পায় না, এমনকি পাকা মাঝির ছুঁচের মতো ধারালো চোখও হার মানে, তখন নদীর ঘাটে-অঘাটে একে অন্যকে খুঁজে পাওয়ার জন্য ক্ষণে ক্ষণে যে ডাকাডাকি কানে আসে সেটা ছেলেবেলা থেকেই আমার কাছে। অত্যন্ত অকারণে অজানা রহস্যভরা রূপে ধরা দিত। তার সঙ্গে থাকত কিছুটা অহেতুক ভীতির ছোঁয়াচ। যদি এরা একে অন্যকে খুঁজে না পায়। ওই যে মাঝির গলা মিলিয়ে যাবার আগেই যেন কাতর এক নারীকণ্ঠ– তবে কি মা তার ছেলেকে ডাকছে? তাকে যদি না পায়।
