এজ্ঞে, নেতাই হালদার। মহাশয়ের?
এজ্ঞে, হরিপদ পাল।… ওই যে কত্তা, আপনার?
আমার নাম? নেপালচন্দ্র গুণ।
তার পর নানাবিধ অভিজ্ঞান জিজ্ঞাসা। এমন সময় একজনের খেয়াল গেল, ছইয়ের বাইরের ওই ঠা ঠা রোদ্দুরে একটা লোক উদাস মুখে বসে আছে। চাষাভূষা হবে। এর তো পরিচয় নেওয়া হয়নি। উনিই গলা চড়িয়ে মুরুব্বি মেকদারে জিজ্ঞাসিলেন, তোমার পরিচয়টা তো জানা হল না হে। অতি বিনয়কণ্ঠে লোকটি, আইগা, আমার নাম আব্দুর রহিম বৈঠা। গয়নার পাঁচো ইয়ার তাজ্জব। তার পর কলবর। বৈঠা! সে কী, হে? মুসলমানের এ পদবিও হয় নাকি?
সবিনয় উত্তর : আইগা, অয় না, অখন অইছে। ঠেকায় পইড়া আপনারা কেউ হালদার, কেউ পাল, কেউ গুণ। বেবাক গুলাইন যদি ছইয়ের মধ্যে বইয়া থাহেন তয় নাও চলব কেমতে? তাই আমি বৈঠা অইয়া একলা একলা নাও বাইতেছি।
তা সে একা একাই নাও বাইয়া যাউক কোনও আপত্তি নেই, কারণ কবিগুরুও গেয়েছেন,
হেরো নিদ্রাহারা শশী।
স্বপ্ন পারাবারের খেয়া
একলা চালায় বসি।
তবে কি না আব্দুর রহিম বৈঠা না হয়ে লোকটার নাম জুলফিকার (দুলফিক্কার) আলি বৈঠা হলেই ১৫/১৬/১৭ ফেব্রুয়ারির হালটা বিম্বিত হয়ে মানাত ভালো।
এই সুবাদে জুলফিকার অর্ধসমাসটির কিঞ্চিৎ অর্থনিরূপণ করলে সেটাকে বহু পাঠক দীর্ঘসূত্রতারূপে অগ্রাহ্য করবেন না। কারণ যত দিন যাচ্ছে, ততই দেখতে পাচ্ছি, বহু হিন্দু প্রতিবেশী মুসলমানদের কায়দা-কানুন রীতিরেওয়াজ সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন। কেচ্ছা-সাহিত্যে আছে,
আলীর হিম্মৎ দেখ্যা
নবী চমৎকার।
আদরে দিলাইন তানে
তেজি জুলফিকার ॥
হজরত আলীর দস্তে
ঠাটা* তলওয়ার।
আসমানে বিজুলি পারা
নাচে চারিধার ॥
[*ঠাটা ডাট্টা দৃঢ় = বজ্র]
পয়গম্বর হজরত আলিকে যে জুলফিকার নামক তরবারি দেন সেটি খুব সম্ভব সিরিয়া দেশের দিমিশকে (ডামাস্কস নগরে) তৈরি। কিন্তু অতখানি এলেম আমার পেটে নেই যে তার পাকা খবর সবজান্তা পাঠকের পাতে দিতে পারি।
তা সে যাই হোক, ১৫/১৬/১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে জুলফিকার আলি বৈঠা সগর্বে তথা সকরুণ কণ্ঠে প্রচার করলেন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকার নেশনেল এসেমব্লি অধিবেশনে যে যাক সে যাক, তিনি যাবেন না, তিনি জুলফিকার আলি বৈঠা নিমজ্জমান পশ্চিম পাকিস্তানের তরণি একাই বৈঠা চালিয়ে অগ্রগামী হবেন। কারণ তিনি পাকা খবর পেয়েছেন, উত্তর কাশ্মিরের হিন্দুকুশ থেকে আরম্ভ করে কচ্ছের রান অবধি দুশমন ইন্ডিয়া সৈন্য সমাবেশ করছে। এবং সেটা বেইমান ইন্ডিয়ানরা এমনই সুচতুরতাসহ সমাধান করছে যে অতি অল্প লোকই তার খবর রাখে। এখানে বরঞ্চ সুচতুর ভুট্টো এমন একটা সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিলেন যার ভাবার্থ তোমাদের কেউ কেউ তো অন্তত জানো, মিলিটারির সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ দোস্তি হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ অর্থাৎ তিনি, ভুট্টো, খবরটা পেয়েছেন নিতান্তই মিলিটারি প্রসাদাৎ। কিন্তু প্রশ্ন, ইন্ডিয়া ঠিক এই সময়ই সৈন্য সমাবেশ করছে কেন? কারণ ধুরন্ধর ইন্ডিয়া জানে, পশ্চিম পাকের বিস্তর রাজনৈতিক নেতা মার্চের পয়লা সপ্তাহে ঢাকা গিয়ে জড়ো হচ্ছেন। সেই সুযোগে ইন্ডিয়া পাকিস্তান আক্রমণ করলে তারা সবাই আটকা পড়ে যাবেন ঢাকায়। দেশের জনগণকে লিডারশিপ দিয়ে মাতৃভূমি রক্ষার্থে জিহাদ লড়বার জন্য অনুপ্রাণিত করতে পারবেন না।
এই ইন্ডিয়া জুজুর বিভীষিকা দেখানো- যখন তখন, মোকা-বেমোকায় ওইটেই মি. জুলফিকার আলি ভুট্টোর জুলফিকার তলওয়ার। তার সম্মানিত নামে (ইসমে শারিফে) আলি যখন রয়েছে তখন এই জুলফিকার তলওয়ারে তাঁরই হক সর্বাধিক। এই বেতাল-অসিতে ভানুমতী মন্ত্র আউড়ে ইন্দ্রজাল-রাজ ভুট্টো দিবা দ্বিপ্রহরে প্রাণসঞ্চার করতে সক্ষম।
সাতিশয় মনস্তাপের বিষয়, এই পোড়ার সংসারে আর যে অভাব থাক থাক, সন্দেহপিশাচের অভাব হয় না। তাদেরই দু-একজন মৃদুকণ্ঠে আপত্তি জানালে পর ভুট্টো যে উত্তর দিলেন সেটি পরশুরাম ক্লাসিক পর্যায়ে তুলে লিপিবদ্ধ করে গেছেন :
তারিণী (স্যান, কবরেজ)। প্রাতিক্কালে বোমি হয়?
নন্দ। আজ্ঞে না।
তারিণী। হয়, জানতি পার না।
কিন্তু এই বাহ্য।
এরপর মি. ভুট্টো যে ভয় দেখালেন সেটা আরও প্রাণঘাতী। তিনি বললেন, আমি আমার পার্টি সদস্যদের ঢাকা পাঠিয়ে সেখানে ওদেরকে ডবল হস্টেজে পরিণত করতে পারিনে। একদিকে তারা পশ্চিম পাকে ফিরতে পারবেন না (ইন্ডিয়া ফিরতে দেবে না) অতএব তারা হয়ে যাবেন ইন্ডিয়ার হস্টেজ, এবং তারা আওয়ামী লীগের দুদফা মানতে পারবেন না বলে তারা হয়ে যাবেন লীগেরও হস্টেজ। অর্থাৎ ইন্ডিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করে কতকগুলি অপমানজনক দাবি তুলবে পাকিস্তানের কাছে এবং সেগুলো না মানা পর্যন্ত সেই আমানতি সদস্যদের জলপথে, শূন্যমার্গে পশ্চিম পাকে ফিরতে দেবে না। আর আওয়ামী লীগও তাদের পুব পাক থেকে বেরুতে দেবে না।
সর্বনাশ! তা হলে এই দুধের ছাওয়ালদের হালটা হবে কী?
সব জেনেশুনে সদস্যরা যদি ঢাকা যান তবে, তবে কী আর হবে– এসেমব্লি হল কসাইখানাতে (মি. ভুট্টোর আপন জবানিতে স্লটার হাউস-এ) পরিবর্তিত হবে!
সাংবাদিকরা যে সাতিশয় বিদগ্ধান্ত (হার্ড বয়েলড এগস) সে তত্ত্বটি বিশ্বজন সম্যকরূপে অবগত আছে। তথাপি তারাও নাকি আঁতকে উঠেছিলেন। শকটা সামলে নিয়ে সমস্বরে তারা নানান প্রশ্ন শুধালেন। কিন্তু মি. ভুট্টো চুপ মেরে গেলেন। হি ডিড নট এলাবরেট অন দিস পয়েন্ট–সবিস্তর স্বপ্রকাশ হতে সম্মত হলেন না।
