[*১২.১২.৭১ নাগাদ শ্রীভুট্টো আমেরিকায় নিরাপত্তা পরিষদে বক্তৃতা দেন। ইয়েহিয়া তাকে আমেরিকা পাঠাবার পূর্বে হুকুম দিয়েছিলেন তিনি যেন ফেরার পথে প্লেনে করে প্রথম কাবুল আসেন। সেখান থেকে মোটরে করে পেশাওয়ার। ইয়েহিয়ার প্ল্যান ছিল পথমধ্যে ভুট্টোকে গুমখুন করা, কারণ ইয়েহিয়ার সিংহাসন তখন টলমল। তিনি বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হয়েছিলেন, দেশে ফিরে ভুট্টো তাকে আসন থেকে সরাবেন।… কিন্তু ভুট্টোকে ডেকে নিয়ে নিকসন তাঁকে বলেন, ইয়েহিয়াকে দিয়ে আর কিছু হবে না। তিনি (নিকসন) হুকুম দিয়েছেন, ইয়েহিয়া যেন বিনাবাধায় ভুট্টোকে আসন ছেড়ে দেন। ভুট্টো তাই সরাসরি করাচি পৌঁছন। যারা ভুট্টোর মহানুভবতায় পঞ্চমুখ তারা শুনে বেজার হবেন, নিকনের হুকুম মাফিক মি. ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেন।]
উপস্থিত তিনি যতখানি পারেন ইতিহাস বিনষ্ট করছেন। অন্তত বিকৃত করছেন তাঁর আপন তবেতে নিরপেক্ষ কমিশন বসিয়ে। এ কর্মে তিনি বুচার অব বেঙ্গল-এর পরিপূর্ণ সহায়তা পাবেন। তিনি এখন পাকিস্তানের জঙ্গিলাট। কু-লোকে বলে, যে টিক্কা প্রভু ইয়েহিয়ার আদেশে বাংলাদেশ দহন-ধর্ষণ করলেন তাকে খাস করে জঙ্গিলাট বানালেন মি. ভুট্টো, ওকিবহাল টিক্কা এস্-প্রভুর সর্বাঙ্গে যেন উত্তমরূপে কর্দম লেপন করতে পারেন।
তা তারা ইতিহাস নিয়ে যা খুশি করুন, প্রামাণিক সমসাময়িক ইতিহাস বলেন :
( ) মুজিব আমার সঙ্গে সমঝোতা না করলে আমার পার্টি ঢাকা যাবে না।
সাংবাদিকের প্রশ্ন : আপনি কি তবে এসেমব্লি বয়কট করছেন?
ভুট্টো : (দৃঢ়কণ্ঠে) না।
এ ঘটনার আট মাস পরে মি. ভুট্টো অক্টোবর ১৯৭১-এ আপন পুস্তিকা দি গ্রেট ট্রাডেজিতে লিখেছেন, তিনি এসেমব্লিতে যাবার পূর্বে যে শর্ত দিয়েছেন সেটা না মানা হলে তিনি ঢাকা যাবেন না, জানালে পর, হুয়েন আস্কড বাই করেসপনডেনটস হুয়েদার পিপলস পার্টি উয়োজ বয়কটিং দি এসেমব্লি আই কেটেগরিক্যালি ডিনাইড ইট।*[* দি গ্রেট ট্র্যাজেডি, পৃ. ২৮।]
পাঠক চিন্তা করে নিজেই মনস্থির করে নিন, এটাকে বয়কট না করলে বয়কট বলে কাকে?
এ তথ্য কি বলার প্রয়োজন আছে যে পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাকের রাজনীতিক নেতারা মি. ভুট্টোর দোস্ত-দুশমন দুই-ই ভুট্টোর এই আচরণকে বয়কট নাম দেন, কেউ কেউ এটাকে ব্ল্যাকমেলও বলেন।
কট্টর মুসলিম অখণ্ড পাকিস্তান বিশ্বাসী জমাৎ-ই-ইসলামীর আমির (খলিফা) মৌলানা সৈয়দ আবুল আলা মওদুদি কড়া ভাষায় ভুট্টোর এই মনোভাবকে অসঙ্গত আচরণ বলে নিন্দা করেন। এমনকি এসেমব্লির বাইরে ভুট্টো-মুজিবে সংবিধান বাবদে সমঝোতা করার প্রচেষ্টাকেও তিনি নিন্দনীয় মনে করেন। যা-কিছু হবার তা হোক এসেমব্লির ভিতরে এই তাঁর সুচিন্তিত মত।
অথচ এর দু তিন দিন পূর্বেই স্বয়ং ভুট্টোই এই মওলানার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সর্বজনসম্মত সংবিধান নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন!
মওলানা ছাড়া পশ্চিম পাকের অন্যান্য নেতারাও একবাক্যে এই বয়কট-এ প্রতিবাদ নিন্দা অসম্মতি জানান নিতান্ত সরকারের ধামাধরা কাইয়ুম জাতীয় দুটি দল ছাড়া। আর পূর্ব পাকের আওয়ামী লীগবিরোধী নেতারাও ভুট্টোর সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের পক্ষে ক্ষতিকর বলে দৃঢ়মত প্রকাশ করেন।
পাকিস্তান-প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর বর্তমান ভাইস-প্রেসিডেন্ট পুব পাকের ভূতপূর্ব মুখ্যমন্ত্রী বাঙালি নুরুল আমিন* ভুট্টোর আচরণ হেস্টি এবং আনহেলপফুল আখ্যা দিয়ে পুব বাঙলার প্রতি ভুট্টোর আচরণের নিন্দা করেন। তথা ভূতপূর্ব মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান বলেন, ভুট্টো এসেমব্লি বর্জন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন পাকিস্তানকে দু খণ্ডে বিভক্ত করার জন্য!
[*অধুনা যে কয়েকজন বাঙালি পাকিস্তান থেকে কাবুল হয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন তারা কাগজে প্রকাশ করেছেন, তন্মধ্যে আমার এক আত্মীয় আমাকে বলেছেন, নূর মিঞা বন্দি বাঙালিদের জন্য কড়ে আঙুলটি পর্যন্ত তো তুলছেনই না, তদুপরি বাঙালিরা যাতে করে দেশে ফিরতে না পারে সে ব্যাপারে দারুণ উৎসাহী। বস ভুট্টো সমীপে আপন কিমকদর বাড়াবার জন্য। ফোনে বাংলা শুনলে আঁতকে ওঠেন।]
এখনও মাঝে মাঝে কানে আসে ভুট্টোর স্তুতিগান তিনি চেয়েছিলেন অখণ্ড পাকিস্তান! তা হলে বলতে হয়, আওয়ামী লীগ থেকে আরম্ভ করে ওয়ালি খান, নসরুল্লা, সলাহ্ উদ্দিন, চোর উল আমিন এস্তেক মৌলানা মওদুদি– সব্বাই সব্বাই লিপ্ত হয়েছিলেন গভীর এক ষড়যন্ত্রে, পাকিস্তানকে কী প্রকারে দ্বিখণ্ডিত করা যায়! সামনে উজ্জ্বল উদাহরণ, লেট জিন্নাহ ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করেন।
.
সাত জর্মন
এক জগাই
তবু জগাই লড়ে!
গয়নার নৌকা চেনে না কে? বিশেষ করে পুব-বাঙলায়। বারোইয়ারি নৌকা, পাঁচো ইয়ারে ভাড়া করে গুষ্টিসুখ অনুভব করতে করতে যে যার আপন মনজিলে নেমে যান। অবশ্য পাঁচো ইয়ার নৌকো ইশটিশন ঘাটে পৌঁছনো মাত্রই হুড়মুড়িয়ে একে অন্যের ঘাড়ে পড়ে চড়ে, নৌকোর ভেতর ঢোকেন– নৌকোর গর্ভ থেকে আগের যাত্রীদের নামবার পূর্বেই। অবশ্য তখনও তারা পাচো ইয়ার নয়, বরঞ্চ পঞ্চভূত বলতে পারেন। জায়গা দখল করার তরে তখন ভূতের নৃত্য। তার পর ধীরেসুস্থে জিরিয়ে-জুরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ হয়। যথা :
মহাশয়ের নাম?
