এইবারে পলিটিশিয়ান ভুট্টো পরলেন স্টেটসম্যানের মুখোশ। সেটা যে কতখানি বেমানান বদখদ বেঢপ হল সেটা জানেন মি. ভুট্টো সবচেয়ে বেশি। যাঁকে পশ্চিম পাকের জনগণ ডিকটেটর আইয়ুবের ডেমোক্রাটিক ন্যাজ খেতাব বহু পূর্বেই দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেছে, যাঁর কাজ– পূর্বেই উল্লেখ করেছি, দীর্ঘ আঠারো মাস ধরে ছিল পর্দার আড়ালে গুঁড়িগুড়ি হামাগুড়ি দিতে দিতে একে ভজা ওকে প্যার করা, মাঝে মাঝে চিত্রিতা গর্দভীর ন্যায় ক্ষণতরে আত্মপ্রকাশ করা, সে রাতারাতি পেয়ে গেল ডবল প্রমোশন (এদানির ঢাকার অটোপ্রমোশনের চেয়ে দু কাঠি সরেস); পলিটিশিয়ান না হয়েই সরাসরি স্টেটসমেন!
দিগ্বিজয়ে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গেই পয়লা মনজিলেই খেলেন পয়লা থাপ্পড়।
প্যাভিলিয়নে বসেই মুজিব এলবি ডাবলু হওয়ার ইলেকট্রিক শকসন্দেশ দেওয়ার পরদিন বীর ভুট্টা গেলেন ফ্রন্টিয়ার নেতা খান ওয়ালি খানের কাছে। তাঁকে খবর দিলেন, পাকিস্তান টাট্টুর পিঠে ভুট্টো আসওয়ার। এসো, ভাই, দুই বেরাদরে মিলে লঙ্কাটা ভাগ করে নিই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝাণ্ডু সিন্ধু-পাণ্ডা ভুট্টো পোশতুভাষীর সঙ্গে কুস্তি লড়লেন জুডোর সর্ব প্যাঁচ চালিয়ে কিন্তু ওয়ালি খালি এক কথা বলে না। পলিটিকস ব্যাপারটা ধোয়া তুলসীপাতা নয় সে তত্ত্বটা পেশাওয়ারেও অজানা নয়, কিন্তু এতখানি হীন হবার মতো পাঠান ওয়ালি খান নন। শেষটায় ভুট্টো সঙ্গোপনে ওয়ালিকে জানালেন, এসেমব্লি অধিবেশনে আমি ঢাকা যাব না। আমার এ সিদ্ধান্ত আমার পার্টি মেম্বাররা পর্যন্ত জানে না। এটা ১৪ ফেব্রুয়ারির কথা।
তার পরদিন ১৫/২-এ সর্বজনসমক্ষে বম ফাটালেন মি. ভুট্টো ভাবার্থে। এরই ফলে ঠিক চল্লিশ দিন পরে হাজার হাজার বম ফাটল ঢাকাতে সশব্দে, শব্দার্থে রাত এগারোটায়। এ বমটা তিনি কেন ফাটালেন, কার নির্দেশে ফাটালেন তার আলোচনা হবে ১ মার্চের পরিপ্রেক্ষিতে, যেদিন ইয়েহিয়া জুন্টার আদেশমাফিক ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি করে দিলেন।
পনেরো তারিখের তাঁর সেই দীর্ঘ বিবৃতি এতই পরস্পরবিরোধী, দ্ব্যর্থসূচক, ঝাপসা এবং ইংরেজিতে যাকে বলে বিটিং এবাউট দি বুশ যে তার সারমর্ম দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। এতে আমার লজ্জিত হওয়া উচিত, কিন্তু যখন দেখি, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (এর কার্যকলাপ পশ্চিম পাকিস্তানেই ছিল বেশি) নসরুল্লা খান, মি. ভুট্টোর বম মারার দু দিন পর নিম্নের বিবৃতিটি দিচ্ছেন তখন মন সান্তনা মানে :
মি. ভুট্টোর পরিষদ বয়কট করার সিদ্ধান্ত যে গণতন্ত্রবিরোধী সে মন্তব্য করার পর খান সাহেব বলেছেন : মি. ভুট্টোর পরিষদ বয়কট করার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে (এর ফলস্বরূপ– লেখক) কী হবে সে সম্বন্ধে কোনওকিছু একটা বলা শক্ত। কারণ পিপলস পার্টির চেয়ারম্যানের স্বভাবই হচ্ছে অতিশয় দ্রুতবেগে তাঁর মল্লভূমি পরিবর্তন করা (চেনজিং হিজ স্ট্যান্ডস উইদ গ্রেট রেপিডিটি)। মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি বলেছিলেন যে, পরিষদ অধিবেশনে সভা মধ্যে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে বোঝাপড়া করবেন।
পাঠকের স্মরণ থাকতে পারে আমরা ২ সেপ্টেম্বরের দেশ পত্রিকায় মি. ভুট্টোর একটি বিবৃতি থেকে তার সারাংশ উদ্ধৃত করি। তিনি তখন (১৯.১.৭১) বলেছিলেন, ইট ইজ নট নেসারারি টু এনটার ইনটু দি কনসটিচুয়েন্ট এসেম্বব্লি উইদ অ্যান এগ্রিমেন্ট অন ডিফারেন্ট ইস্যুজ বিকজ নিগোসিয়েশন কুড কন্টিন ইভন হোয়েন দি হাউজ ইজ ইন সেশন।
তা হলে এক পক্ষকাল সময় যেতে না যেতে আজ (১৫.২.৭১) হঠাৎ ভুট্টোজি এ বোমাটা ফাটালেন কেন?– যে, আমার সঙ্গে আগেভাগে সমঝোতা না করলে আমরা এসেম্বব্লি করতে ঢাকা যাব না।
ঠিক এই প্রশ্নটিই শুধোলেন নসরুল্লার সঙ্গে সঙ্গে ভুট্টো-বিবৃতি পাঠমাত্র পশ্চিম পাকের নেতা সলাহ উদ্দিন খান, ভুট্টো এসেমব্লি বয়কটের ঘোষণা করার জন্য যে সময়টা বেছে নিলেন সেটা ভারি হেঁয়ালিভরা (ভেরি ইনট্রিগিং)। তিনি ঢাকাতে যখন শেখ মুজিবের সঙ্গে দফে দফে চুলচেরা (থ্রেডবেয়ার) আলোচনা করেছিলেন তখনই তো শেখের মতিগতি তিনি অতি অবশ্যই বুঝে নিয়েছিলেন। কারণ শেখ তো তখন তাঁর সাকুল্যে তাস টেবিলের উপর রেখে সর্বসংশয় নিরসন করেছিলেন।
এটা তো প্রহেলিকা (ব্যাফলিং) যে, মি. ভুট্টো সেই সময়ই তার আপন মনের গতি বুঝিয়ে বলেননি কেন?
এই এক পক্ষকাল মধ্যে তো আওয়ামী লীগ তার প্রোগ্রামে কণামাত্র রদবদল, কাটাই-ছাঁটাই, ডলাই-মলাই কিছুই করেননি তবে কেন আজ মন্থরার মুখে যেন নবান্নের বিনে-ধানের খই ফুটতে আরম্ভ করল?
কিছু না। সেই টেবিল-থাবড়ানোর ফলশ্রুতি যেন জুন্টা কর্তৃক মি. ভুট্টোর পিঠ থাবড়ানোর শামিল। যেন পিতামহ ভীষ্ম শঙ্খধ্বনি ফুকলেন–দুর্যোধনের মন থেকে সর্ব দ্বিধা অন্তর্ধান করেছে– কারণ সৈন্য পর্যাপ্ত, কারই-বা অপর্যাপ্ত, কে নেয় তার খবর!
.
জনাব ভুট্টোর বক্তব্য এতই দীর্ঘ যে, যে ছেলে তার প্রেসি লিখতে পারবে সে হেসে খেলে বিএ, এমএ-তে ফাস্ট হবে। সংক্ষেপে যতখানি পারি তারই নিষ্ফল চেষ্টা দেব। না করে উপায় নেই। কারণ হিটলারের মতো মি. ভুট্টো ইতিহাসের বিচার-সিদ্ধান্তে বিশ্বাস করেন। মি. ভুট্টোর কেতাবে আছে– একদা শেখ মুজিব আমাকে হুঁশিয়ার করে বলেন, আমি যেন মিলিটারিকে বিশ্বাস না করি। শেখ বলেন, মিলিটারি যদি তাকে (মুজিবকে) প্রথম বিনষ্ট করে তবে আমাকেও তারা বিনষ্ট করবে।* আমি বললাম, মিলিটারি বরঞ্চ আমাকে বিনষ্ট করে করুক, কিন্তু ইতিহাসের হাতে আমি বিনষ্ট হতে চাইনে।
