অতএব তুমিই রাজা হবে।
জেনারেল কল-এর ভাষ্যে যারা বিশ্বাস করেন তারা স্বচ্ছন্দে মেনে নিতে পারেন যে উপরের সবকটি যুক্তিই দ্ব্যর্থহীন সত্য। বাদশাহ জাহাঁগির একাধিকবার বলেছেন, আমার কয়েক পাত্র মদ্য আর রুটি-মাংস মিললেই ব্যস– রাজত্ব চালান না মহারানি নূরজঁহা। বিস্তরে বিস্তরে এ হেন দৃষ্টান্ত আছে। বস্তুত আমি জনৈক পাকিস্তানির মুখে শুনেছি, ১৯৬৮-৬৯-এর আইয়ুব যখন যমের (আজরাইলের সঙ্গে যুঝছেন তখন জাদরেলকুল ইয়েহিয়ার সমুখে প্রস্তাব করেন, তিনি যেন তদ্দশ্যেই রাজ্যভার গ্রহণ করেন, পাছে আইয়ুব হঠাৎ গত হলে কোনও সিভিলিয়ান না প্রেসিডেন্ট হয়ে পুনরায় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে মিলিটারি শাসনের অবসান ঘটায়, তখন ইয়েহিয়া স্রেফ কবুল জবাব দেন। … তাই বলে পাঠক অবশ্য অন্য একসট্রিমে গিয়ে ভাববেন না যে রাষ্ট্রপতি হওয়ার লোভ তাঁর আদৌ ছিল না। নিশ্চয়ই ছিল। আর কিছু না হোক, ওই পদে অধিষ্ঠিত হলে তাঁর যে দুটো জিনিসে শখ সেগুলো তিনি নির্ভাবনায় পর্যাপ্ত পরিমাণে আমৃত্যু উপভোগ করতে পারবেন।
১১/১২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো পিণ্ডিতে উড়ে এসে ইয়েহিয়ার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ধরে দীর্ঘ আলোচনা করেন। বিবেচনা করি তাকে বোঝাবার শেষ চেষ্টা দিলেন মুজিবকে তার প্রস্তাবমতো সবকিছু যদি দিয়ে দাও তবে তোমার, আমার, পাকিস্তানের সর্বনাশ হবে। খুব সম্ভব এ প্রস্তাবও করেছিলেন, টালবাহানা দিয়ে অ্যাসেমব্লিটা অন্তত মুলতুবি রাখ।
অনুমান করা যেতে পারে ইয়েহিয়া তখন ভুট্টোকে কোনও পাকা কথা দেননি।
ভুট্টো নিশ্চয় তখন তাঁর নিষ্ফলতার কাহিনী মিলিটারি জুন্টার পিরজাদা, গুল ইত্যাদিকে বলেছিলেন।
১৩.২.৭২- ইয়েহিয়া ঘোষণা করলেন, ৩ মার্চ অ্যাসেমব্লির অধিবেশন হবে। সরকারি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি বেরুল,
The President, General A.M. Yahya Khan, has been pleased to summon the National Assembly of Pakistan to meet on Wednesday, March 3, 1971, at 9 a.m. in the Provincial Assembly Building, Dacca, for the purpose of forming a Constitution for Pakistan.
অনুমান করি ওইদিনই জুন্টা গিয়ে থাবড়ালেন ইয়েহিয়ার টেবিল! দাবি করলেন অনির্দিষ্টকালের জন্য অ্যাসেমব্লি মুলতুবি রাখতে হবে। ইয়েহিয়াকে সম্মতি দিতে হল বাধ্য হয়ে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট তো ঝটপট সে মত পরিবর্তন আরেকটা গেজেট একস্ট্রা-অরডিনারিতে রাতারাতি প্রকাশ করতে পারে না। তাই সে কর্ম করা হল ঠিক এক পক্ষ পরে।
সেইদিনই বিজয়গর্বে উফুল্ল জুন্টা মি. ভুট্টোকে জানালেন,
তুমি রাজা হবে।
অর্থাৎ মুজিব আর লীগের নেতাদের জেলে পুরব। লীগ পার্টিকে বে-আইনি বলে ঘোষণা করার ফলে তোমার পাটিই হবে সংখ্যাগুরু। তুমিই হবে প্রধানমন্ত্রী।
ভুট্টো উল্লাসে নৃত্য করতে করতে ফ্লাই করলেন পেশোয়ারবাগে। এবারে পশ্চিম পাকের বাকি পার্টিগুলোকে বশে আনা যাবে অতি সহজে। তাঁর কেবিনেটে তিনি নেবেন অন্য পার্টি থেকে কিছু মন্ত্রী, উপমন্ত্রী গয়রহ, গয়রহ। সেই প্রলোভনই যথেষ্ট।
১৩.২.৭১–১৪.২.৭১ টেবিল থাবড়ানোর দিন সন্ধেবেলা পেশওয়ারের বিশ্ববিদ্যালয় নগরীর এক বাঙলোতে বসল জমজমাট আঁদরেল ককটেল পার্টি। তিনি যে অখণ্ড পাকিস্তানের রাজা হতে চললেন সে সুসমাচার তিনি কি অত সহজে চেপে যাবেন– অতি অবশ্যই দু চারজন অন্তরঙ্গ বন্ধুকে সে আনন্দের হিস্যেদার করেছিলেন। কিন্তু অল্পে সুখ কোথায়? সুখ। ভূমাতে। ইতোমধ্যে পিপলস পার্টির রাজা হয়ে গিয়েছেন ককটেল পার্টির রাজা। পাকিস্তানের পলিটিক্যাল পার্টি এবং ককটেল পার্টিতে অবশ্য কোনওকালেই বিশেষ কোনও পার্থক্য ছিল না এমন উপবাসের মাস রমজানের দিনে (!), লাঞ্চ পার্টিতেও না।
প্রখ্যাত সাংবাদিক এন্টনি বলেছেন, গেলাস– পাঠক, নিম্বুপানির গেলাস ভেবে আপন কল্পনাশক্তিকে বিড়ম্বিত কর না–হাতে করে সে ককটেল পার্টির চক্রবর্তী হবু রাজা মি. ভুট্টো রসে নিমজ্জ সর্বজনকে ইলেকট্রিফাই করলেন মাত্র কয়েকটি ঐতিহাসিক লবজো মারফত ভুট্টো আবার ঘোড়ার জিনে সোয়ার। এ ঘটনা ঘটল যারা শক্তিধর তাদেরই মীমাংসা দ্বারা। মুজিব আউট (মুজিব ইজ আউট!)! আমি প্রধানমন্ত্রী হব।
মুজিব আউট! লেগ বিফোর উইকেট? সেইটেই তো ধাপ্পার হেডাপিস। ইয়েস, অ্যান্ড নো। টসে (গণনির্বাচনে জিতেছিলেন লীগের ক্যাপটেন শেখজি। তিনিই ওপনিং ব্যাটসমেন। কী এ ক্রিকেট খেলাতে কুদরতে কী খেল! ফার্স্ট ইনিংসে নামবার পূর্বে পেভিলিয়নে যখন শেখ লেগিং পরছেন তখনই তিনি লেগ বিফোর উইকেট, ইন দি পেভিলিয়ন।
বাকি খেলোয়াড়দের যে কটিকে আমপারার–বুচারের দু আঁসলা বেটা টিক্কা পাকড়াতে পেরেছিলেন তাদের নিয়ে সেই টিক্কা-এলেভন হানড্রেড-হানড্রেডের ব্লাডি ইনিংস-এ আমরা এখনও পৌঁছইনি।
.
অখণ্ড পাকের চাঁই/ ভুট্টো বিনে কেউ নেই
প্রেসিডেন্ট ইয়েহিয়া, জুন্টা আর ভুট্টোতে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এর মাঝামাঝি থেকে আর কোনও মতভেদ রইল না– ভুট্টো সামলাবেন সিভিলিয়ান দিক অর্থাৎ পশ্চিম পাকের যে-কটা রাজনৈতিক দল আছে তার যে কজন লিডারকে তিনি পারেন আপন দলে টানবেন, প্রলোভন দেখিয়ে।
পলিটিশিয়ান আর স্টেটমেনে তফাত কী? পলিটিশিয়ান জনগণকে একত্র করে পার্টি বানিয়ে তাদের চালায় আর স্টেটসম্যান সেই ব্যক্তি যে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের ভিন্ন ভিন্ন পলিটিশিয়ানকে একজোট করে রাষ্ট্র নির্মাণকর্মে অগ্রসর হয়। কাষ্ঠরসিকরা বলেন, পলিটিশিয়ান ম্যাস (জনগণকে) বুদ্ধ বানায় আর স্টেটসম্যান পলিটিশিয়ানদের বুদ্ধ বানায়।
