প্রেসিডেন্ট ভুট্টো সম্বন্ধে মন্তব্য উহ্য রেখে তিনি বলেন, তাঁকে গ্রেফতার করার প্রকৃত তাৎপর্য এই যে, সর্বোচ্চ সরকারি ক্ষমতায় আসীন কয়েকজনের আতঙ্ক ও ভয়ের জন্যই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারণ তারা মনে করেন, তার কাছে তাদের অপকীর্তি ও গোপন কার্যকলাপের এমন সব তথ্য-প্রমাণ ও ছবি আছে যা প্রকাশিত হলে তাঁদের সুনাম নষ্ট হবে এবং দেশে তাদের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটিত হবে।
উপসংহারে তিনি বলেন, কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি যে, আমি তা প্রকাশ করব না। কারণ, তা প্রকাশিত হলে দেশের সম্মান বলতে আর কিছুই থাকবে না।
এর পর মহিলাটি– আমি ইচ্ছে করেই মহিলা বলছি, কারণ পাকিস্তানের অতিশয় অল্প দ্র পুরুষও এ তত্ত্ব বলতে সাহস ধরেন, যা এ নর্তকী বলেছে—
এমনিতেই দেশের সম্মানের আজ যা অবনতি ঘটেছে তাই যথেষ্ট।
.
মি. ভুট্টো যে বেইমানি করেছিলেন তার ফল পরে শাপেবর হয়েছিল। বাংলাদেশ দু-শো বছর পর পুনরায় স্বাধীন হল। কিন্তু সে স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য তার যে রক্তক্ষয় হল আব্রু দিয়ে ইজ্জত দিয়ে কোনও গতিকে ইমান বাঁচাল তারা, তার জন্য দায়ী কে? সে অনুসন্ধান আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে করতেই হবে। আমি মনে করি এটা আমার কর্তব্য। পাঠক যদি অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তবে আমি নাচার। আমি আমার আইষমানকে চাই-ই চাই!
মি. ভুট্টো বিলক্ষণ অবগত ছিলেন বাংলাদেশে পশ্চিম পাকের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য তার আপন দেশের লোক একদিন তাকে দায়ী করবে। বিশেষ করে এই কারণে যে, ডিসেম্বর ১৯৭০-এর গণনির্বাচনে তিনি পশ্চিম পাকে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার গৌরবে দু হাত দিয়ে কিং কং-এর মতো সর্বত্র বুক দাবড়ে প্রচার করে বেড়াচ্ছিলেন, তিনি তাবৎ পশ্চিম পাকের প্রতিভূ ফরাসি রাজার মতো লে সে মোওয়া, (আমি যা, রাষ্ট্রও তা), পুব বাংলায় পরাজয়ের পর তিনি হঠাৎ করে চটসে পালাবেন কী করে? তাই তিনি স্থির করলেন, এখন আমি প্রেসিডেন্ট, এই বেলা একটা অনুসন্ধান কমিটি বসিয়ে আমি সর্বদোষ চাপাব ইয়েহিয়ার স্কন্ধে। দরকার হলে মিলিটারি জুন্টাকেও তার সঙ্গে জড়াব।
সতেরো বছরের স্বৈরাচারের পর দিনকে রাত, রাতকে দিন করা সবকিছুই সম্ভব। কিন্তু সতেরো বছর বলি কেন? পাকিস্তানের জন্মদিন থেকেই তো স্বৈরতন্ত্র। কু-ইদ-ই আজম মুহম্মদ আলি ভাই ঝিভাড়াই (জিন্নাহ) পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন সর্বত্র বিরাজমান, সর্বশক্তির আধার। তার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইংরেজ ক্যামবেল-জনসন বলেছেন, এখানে, এইখানে পশ্য, পশ্য, পাকিস্তানের রাজাধিরাজ ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ একাধারে পার্লামেন্টের সভাপতি তথা প্রধানমন্ত্রী সর্ব ভিন্ন ভিন্ন সত্তা এক কেন্দ্রে সম্মিলিত করে বিরাটকার এই কাইদ-ই-আজম। Here indeed is Pakistans King Emperor, Archbishop of Canterbury, Speaker and Prime Minister concentrated into one formidable Quaid-i-Azam. পাকিস্তানের জন্মকালে ও মরহুম জিন্নার জীবিতাবস্থায় কোনওপ্রকারের পার্লামেন্ট বিরোধী দল ছিল না, থাকলে অতি অবশ্যই তিনি আরও বড় নেতা হতেন।
সেই শুভ ঐতিহ্যের গোড়াপত্তন থেকে সর্ব-মরহুম কি লিয়াকত আলী, কি ইসকনদার মির্জা সবাই ছিলেন এক-একটি চোটা হিটলার। এমনকি আইয়ুবের ন্যাজ, পূর্ব পাকের গবর্নর মোনায়েম খান পর্যন্ত সার্কাসের ক্লাউনের মতো মনিবের কীর্তিকলাপের ভডং করে যেতেন রাত দুটো-তিনটে অবধি তাঁর ছিল অনিন্দ্রা রোগ। আশ্চর্য! দুই প্রত্যন্ত– একসট্রিম কী জানি কী করে দোহাদুহু হয়ে যায়– হিটলারের ছিল ইনসমনিয়া, দু জনারই ছিল মদ্যে অনীহা।
এদের তুলনায় ভুট্টো কম যান কিসে?
বস্তুত তিনি প্রথম রাউন্ড তারই আদেশমতো করিয়ে নিয়েছেন। পূর্বোক্ত কমিশন আগস্টের মাঝামাঝি নির্দেশ দিয়েছেন– অবশ্য প্রভু ভুট্টোর অনুমোদন সাপেক্ষে ইয়েহিয়াকে আসামিরূপে মিলিটারি ট্রাইব্যুনালের সমুখে দাঁড়াতে হবে।
মিলিটারি ট্রাইবুনালের কাজকারবার হয় সাতিশয় গোপনে। জনসমাজে যেটুকু মি. ভুট্টোর ফেবারে যায় মাত্র ওইটুকুই প্রকাশ পাবে।
কিন্তু ভয় নেই পাঠক, আমরা আখেরে সবকিছুই জানতে পাব। মূল তত্ত্বগুলো নিশ্চয়ই বহুকাল ধরে জানি। অবশ্য নর্তকী জানেন অনেক বেশি।
.
মুজিব আউট!
ভুট্টোর স্বগতোক্তি
যেথা যাই সকলেই
বলে, ‘রাজা হবে?’
‘রাজা হবে?’– এ বড়ো
আশ্চর্য কাণ্ড। একা
বসে থাকি, তবু শুনি
কে যেন বলিছে–
রাজা হবে? রাজা হবে?
দুই কানে যেন
বাসা করিয়াছে দুই
টিয়ে পাখি, এক
বুলি জানে শুধু–
রাজা হবে। রাজা হবে।
সেই ভালো বাপু, তাই হব।
কবিগুরুর বিসর্জন থেকে। হ্যাঁ, বিসর্জন বইকি? এর তিনপক্ষ পরেই আইনানুযায়ী প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান সরকার বিসর্জন দিল সর্ব আইন, জলাঞ্জলি দিল সর্ব ধর্মাচার, ন্যায়বিচার।
এস্থলে অবশ্য দুটি নিরীহ টিয়ে নয়। এখানে তিনটে ঘৃণ্য গৃধ্র– পিরজাদা, গুল আর আকবর। তাঁরা ভুট্টোকে বললেন, তুমিই রাজা হবে।
এই ‘ই’টার অর্থ কী?
অর্থ এই : ইয়েহিয়া যখন সবরকমের রাজনৈতিক ক্ষমতা মুজিবকে হাতে তুলে দেবেন বলে স্থির করেছিলেন তার বিগলিতাৰ্থ এই, তিনি ডিকটেটর রূপে অখণ্ড ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করতে চান না। তিনি চান সুন্দুমাত্র দুটি জিনিস– মদ্য এবং মৈথুন। এবং পাকেচক্রে নিতান্তই যখন ডিকটেটর হয়েই গিয়েছেন তখন অন্ততপক্ষে তিনি প্রেসিডেন্টরূপে বিরাজ করতে চাইবেন বইকি। কিন্তু ক্ষমতালোভী যখন নন তখন রাষ্ট্রচালনার ভার মুজিবকে দেওয়া যা তোমাকে দেওয়াও তা।
