বন্ধন পীড়ন দুঃখ অসম্মান মাঝে ভয়াবহ অত্যাচারে জর্জরিতা জীবনূতাদের যেমন দিব্যদৃষ্ট দিয়ে দেখতে পেয়ে ব্যথিত কবিগুরু নির্দেশ দিচ্ছেন কী দিয়ে তারা চরম মূল্য শোধ করছে সে উত্তর আসছে কোথা থেকে :
শশ্মান থেকে মশান থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় হাহা করে উত্তর আসছে, আব্রু দিয়ে ইজ্জৎ দিয়ে ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়েও।
না, ইমান তাদের আছে। আর সবকিছু দিয়ে ইমান তারা বাঁচিয়েছে!
.
রক্ষী বনাম নর্তকী
বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায়, ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে যখন পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে কী পদ্ধতিতে পার্লামেন্টকেন্দ্রিক গণতন্ত্র স্থাপিত হবে সেই নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছিল ওই সময় একদিন তিনটি বাজপাখি দুম দুম করে ঢুকল প্রেসিডেন্ট ইয়েহিয়ার খাস কামরায়। এই শিকরে পাখিগুলো পাকিস্তানি ফৌজের পয়লা কাতারের জাদরেলের পাল। লেফটেনেন্ট জেনারেল পিরজাদা, কার্যত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, লেফটেনেন্ট জেনারেল গুল হাসান এবং মেজর জেনারেল আকবর খান। টেবিল থাবড়াতে থাবড়াতে তারা দাবি জানালেন, ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে ইয়েহিয়া যে ঘোষণা দ্বারা ঢাকাতে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন সেটা অ-নির্দিষ্ট কালের অন্য মুলতুবি করে দিতে হবে।
লিখেছেন জেনারেল কল জুলাই ১৯৭১ সালে তাঁর কনটেশন উইদ পাকিস্তান পুস্তকে।
এবং এর পর কল যে মন্তব্যটি করেছেন, পাকিস্তানের পঁচিশ বৎসরের ইতিহাসে সেইটে সবচেয়ে গুরুত্বব্যঞ্জক ভাগ্য পরিবর্তন নিয়ে।
এবং তিনটে শিকরেই ইয়েহিয়াকে বাধ্য করালে পুব বাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কণ্ঠবোধ করার জন্য কঠোরতম ব্যবস্থা মেনে নিতে।
নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে ওই দিনই।
আকাশ বিদ্যুৎ বহ্নি
অভিশাপ গেল লেখি—
ওই দিনই মিলিটারি জুন্টা স্থির করলেন পুব বাংলাকে এমনই একটা শিক্ষা দিতে হবে, যে শিক্ষা আত্তিলা, চেঙ্গিস, নাদির, এ যুগে হিটলার কেউই কখনও বাংলার যে কটা মানুষের নামে পশু বেঁচে থাকবে তারা যেন এক হাজার বৎসরের ভিতর মাথা তুলে খাড়া না হতে পারে। কারণ, জুন্টার মুনিব বলুন, চাকর বলুন, শিখণ্ডী বলুন মি. ভুট্টো একাধিকবার বলেছেন, তিনি এক হাজার বত্সর ধরে ভারতের সঙ্গে লড়াই করে যাবেন। কিন্তু ওই পুব বাংলাটার কোনওপ্রকারের রাজনৈতিক অস্তিত্ব যদি বজায় থাকে তবে বাঙালরা নিশ্চয়ই সেই ভারত বিজয়ে বাধা দেবে বিশেষ করে তাদের ছ-দফা দাবি নামঞ্জুর করার পর।
এ স্থলে ভবিষ্যঙ্কালের ঐতিহাসিক প্রশ্ন তুলবেন, বাংলাদেশের সর্বনাশ সাধনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কি একমাত্র মিলিটারি জুন্টাই দায়ী?
আপাতদৃষ্টিতে আশ্চর্যজনক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু একথা তবুও সত্য যে বাংলাদেশের সাধারণজন আজ আর এসব বিষয়ে বিশেষ কৌতূহলী নয়। এটা আদৌ অস্বাভাবিক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে আমার ইতালির তথা জর্মন বন্ধুদের বিস্তর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ডিকটেটরদ্বয় সম্বন্ধে খবর বের করতে হয়। ওরা কেটে যাওয়া দুঃস্বপ্নের প্রসঙ্গ তুলতে চাইত না। তবু বাংলাদেশের খবরের কাগজ মাঝে মাঝে যেসব রহস্য পশ্চিম পাকে উদ্ঘাটিত হচ্ছে তার খবর দেয়।
জেনারেল কল প্রভৃতি বিশেষজ্ঞরা যে প্রকৃত সত্যের অনেকখানি সন্ধান দেবেন এ তো জানা কথা, কিন্তু যখন কোনও নর্তকীও নিতান্ত বাধ্য হয়ে নিঃস্বার্থ সেসব সত্যের সমর্থন জানায় তখন সত্য নিরূপণ অনেকখানি সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে যায়।
গত ১৫/২০ বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সরকারি-বেসরকারি নেতারা এমনই বর্বর পশ্বাচারে লিপ্ত থাকাকালীন দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন যে সেসব পুরীষাবর্তের নিকটবর্তী হতে কোনও ঐতিহাসিক বা সত্যান্বেষীজন সহজে রাজি হবেন না। পৃথিবীর ইতিহাসে নারীজাতি অনেক ক্ষেত্রেই যবনিকান্তরালে শিবাশিব রাজনৈতিক কর্ম সমাধান করেছেন। তাঁদের মধ্যে মাদাম পাদুর, লোলা মনতে (জ) বিদগ্ধা রোমান্টিক রমণী। এঁদের ললাটে পঙ্কতিলকের লাঞ্জন আছে বটে কিন্তু সেখানে অশ্লীলতার নোংরামি নগণ্য। এঁদের বুদ্ধিমত্তা রাজনৈতিক মতবাদ পর্যবেক্ষণ করে ঐতিহাসিক অনেক ক্ষেত্রেই উপকৃত হন ও শুষ্ক ইতিহাস কিঞ্চিৎ সরস হয়ে ওঠে।
কিন্তু পশ্চিম পাকে নিছক নোংরামি। তাই সংক্ষেপে সারছি।
ইয়েহিয়া সিপাহসালার, প্রেসিডেন্ট হওয়ার বহু আগের থেকেই নর্তকী আকলিম আখতরকে রক্ষিতারূপে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে তিনি বেসরকারি জেনারেল উপাধি দেন ও তিনি সুবে সিন্ধু পাঞ্জাবে জেনারেল রানি রূপে সুপরিচিতা ছিলেন। সম্প্রতি লাহোরের শব্দার্থে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। কিন্তু অল্প পরেই লাহোরের দায়রা জজ তার জামিন মঞ্জুর করেছেন মি. ভুট্টোর শাসন যে নিরন্ধ্র নয় একথাটা এস্থলে সম্পূর্ণ অবান্তর নয়। আখতর সাংবাদিকদের বলেন, ইয়েহিয়ার উত্থান-পতন সম্বন্ধে একখানি পুস্তক রচনা করার জন্য তিনি এক প্রকাশকের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করছেন; তিনি সে পুস্তকে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ার প্রকৃত কারণ উল্লেখ করবেন। তিনি আরও বলেন দ্বিখণ্ডিত হওয়ার জন্য সামরিক জুন্টারাই একমাত্র দায়ী নয়, এর পিছনে বর্তমানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কতিপয় ব্যক্তির ষড়যন্ত্র আছে; তার কাছে এ ষড়যন্ত্রের প্রমাণ আছে।
