উকিলরা আমার ওপর গোস্সা করবেন না। আমি মুর্শিদমুখে যেভাবে আপ্তবাক্যটি শুনেছি হুবহু সেভাবেই নিবেদন করলুম। … ভুট্টো যদিও স্বয়ং উকিল তবু তারও তো একসপার্ট অপিনিয়নের দরকার। মুফরাস মরে গেলে থোড়াই আপন লাশ টানে।
কিন্তু মোদ্দাকথা এই যে ভুট্টো নানাবিধ কীর্তন গাইলেন, পূর্ব পাক-এর প্রতি অনেক অবিচার করা হয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, নীতিগতভাবে আমি শেখের অধিকাংশ দফাই মেনে নিচ্ছি, বাদবাকিগুলো দেশে ফিরে গিয়ে আলোচনা করে ফের আসব। আমাদের সলাপরামর্শের দোর তো আর বন্ধ হয়ে যায়নি (নো ডেডলক!)। তাবৎ বাতের ফৈসালা করে ধোপদুরস্ত একটা রেডিমেড সংবিধান বাটন-হোলে না পরে যে সংবিধান-মনজিলে প্রবেশ করব না– এমন মাথার দিব্যি তো কেউ দেয়নি, এসেমব্লির বৈঠক চলাকালীনও তো লবি-তে আমরা বিস্তর কাঁচা কাপড় ইস্ত্রি করে নিতে পারব– রাধে মেয়ে কি চুল বাধে না- এসেমব্লির বৈঠক কবে শুরু হবে? সে তো এমন কোনও একটা বড় কথা নয়। হতে হতে ধর, এই ফেব্রুয়ারির আখের তকই যদি হয়ে যায় তাতেই-বা দোষ কী? –এগুলোর কতখানি আওয়ামী লীগের কর্তারা বিশ্বাস করেছিলেন? কারণ হয় মানতে হয়, তাঁরা ভুট্টোর ধূর্তামি ধরতে পেরেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী এমন সব কর্মপন্থা অবলম্বন করেছিলেন যাতে করে ম্যাজিশিয়ান ভুট্টো শেষমুহূর্তে যেন তাঁর হ্যাট থেকে এমন কোনও মারাত্মক পিচেশ না বের করতে পারেন যার বিষ্ঠা নিক্ষেপে এসেমব্লি সংবিধান নির্মাণ, স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে ক্ষমতা হস্তান্তর সবকিছু রসাতলে যায়। নয় বিশ্বাস করতে হয়, জেনারেল কল-এর রোগনির্ণয়ই ঠিক : ইয়েহিয়া এবং মুজিব যখন ক্ষমতা হস্তান্তর সম্বন্ধে একমত হচ্ছিলেন তখন তাঁদের কেউই মি. ভুট্টোর নষ্টামি (মিসচিফ) করার দক্ষতাটা হিসাবে নেননি। বাংলাদেশের এক অতিশয় উচ্চপদস্থ ফৌজি অফিসারও আমাকে সংক্ষেপে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন ইয়েহিয়া গোড়ার দিকে সত্যই গণতন্ত্র প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। এই অফিসারও কল-এর মতো টিক্কা, পিরজাদা গয়রহ মিলিটারি হনুমানদের ব্যক্তিগতভাবে উত্তমরূপেই চেনেন।
এস্থলে আগামীকালের সন্দেহপিচেশ ঐতিহাসিক হয়তো বলবেন, ইয়েহিয়া মিলিটারির গণ্যমান্য ব্যক্তি। কল ও উপরে উল্লিখিত বাংলাদেশের ফৌজি অফিসার দু জনাই আর্মির লোক। তারা যে মিলিটারি রাষ্ট্রপতি ইয়েহিয়ার কলঙ্কভার যতখানি পারেন কমাতে চেষ্টা করবেন সেটাই তো স্বাভাবিক।
নিরপেক্ষ হরিপদ কেরানি তার স্বভাবজাত সরলতাসহ বলবে, পশ্চিমপাকের মিলিটারি কলঙ্কভার লাঘব করা কি আদৌ সম্ভব? হিটলারের ফৌজি জাদরেলরা বর্বরতায় ইয়েহিয়া ও তার পাষণ্ডদের তুলনায় দানো মলি শিশুখাদ্য। এবং তার পূর্বেকার, স্বনামধন্য না বলে স্বনির্বাচিত উপাধি ফিল্ড মার্শাল প্রাপ্ত। আইয়ুব যিনি মার্শাল ল চালিয়ে হলেন ফিল্ড মার্শাল, তিনি তো একটা আস্ত চোর। ক-কোটি টাকা জমিয়েছেন তার খোঁজ নিতে এক কাকের ভাই আরেক কাক ইয়েহিয়া কিছুতেই রাজি হল না। পশ্চিম পাকিস্তানের আর্মি সম্বন্ধে যত কম কথা কওয়া যায় ততই বুদু পাঠান-বেলুচ সেপাইদের ভক্তি তাদের প্রতি বাড়বে।
এসব কেলেঙ্কারি ধূর্তামি ভণ্ডামির পাক কে ঘটতে চায় অথচ না ঘেঁটেও উপায় নেই। হিমালয়ের বর্ণনা দিতে হলে শুধু গৌরীশঙ্কর আর কাঞ্চনজঙ্র অভ্রংলিহ সৌন্দর্য বর্ণনা করলে চলে না, তার গভীর উপত্যকা এমনকি কন্টকাকীর্ণ গুহাগহ্বর খানাখন্দেরও বয়ান দিতে হয়।
এ দু মাসের বয়ান দফে দফে না দিলে কোনও বাঙলার পাঠকই সম্যক হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন না, পূর্ব বাঙলার নেতারা ছাত্রসমাজ-বেঙ্গল রেজিমেন্ট-পাকিস্তান রাইফলস পুলিশ সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে চিন্তাশীলজন কতখানি ধৈর্য ধারণ করে অতি সন্তর্পণে অগ্রসর হয়েছিলেন।
তাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে মৌলানা ভাসানীর মতো প্রাচীন তথা জনপ্রিয় নেতার সঙ্গে। এরা কোনওপ্রকারের ঢাকঢাক গুড়গুড় না করে সরাসরি যা বলতেন তার সারার্থ এই, ১৯১৯/১৯২০ থেকে আমরা ধূর্ত ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়েছি কংগ্রেস-খিলাফতের সঙ্গে যোগ দিয়ে। সেই সময় থেকেই আমরা পরোক্ষভাবে পাঞ্জাবি সিন্ধি বেলুচ পাঠানকে চিনতে শিখেছি। আদর্শ এক হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু মহাসভার সঙ্গে আমাদের মতানৈক্য ঘটেছে, এদের এবং কমুনিস্টদের সঙ্গে কখনও দোস্তি কখনও-বা দুশমনি হয়েছে এবং সর্বশেষে চিনেছি, হাড়ে হাড়ে চিনেছি আইয়ুবের আমল থেকে পাঞ্জাবি মিলিটারি জুন্টাকে। এদের মতো পাজির পা-ঝাড়া হাড়েটক হা– জা ইহসংসারে নেই। এদের সঙ্গে কস্মিনকালেও জয়গুরু দিয়েও রফারফি করতে পারবে না। কষে প্যাদানো ছাড়া এদের জন্য অন্য কোনও ওষুধ নেই। এবং যত তুরন সেটা নির্মমতমভাবে প্রয়োগ করা যায় ততই মঙ্গল। খুদ পশ্চিম পাকেই সুপ্রচলিত প্রবাদ আছে, একই গুহায় তুমি যদি দৈবাৎ সঙ্গ পাও, এক ব্যাটা পাঞ্জাবি আর একটা গোখরোর, তবে ক্ষণতরে চিন্তা না করে প্রথম গলা কাটবে পাঞ্জাবিটার তার পর ধীরেসুস্থে মারবে গোখরোটাকে।
পাঠান্তর : গোখরোটাকে ছেড়ে দিলে দিতেও পার।
এবং লীগের মধ্যেই ছিল একদল ফায়ার-ইটিং ছাত্রছাত্রী যারা কালবিলম্ব না করে চেয়েছিল সম্মুখসগ্রাম। বিশেষ করে ছাত্রীদের যেন কেউ না ভোলে। গত সংগ্রামে স্বাধীনতার জন্য যে চরম মূল্য এরা দিয়েছে তার তুলনা পৃথিবীর সভ্য অসভ্য প্রাচীন অর্বাচীন কোনও দেশে কোনও সমাজে পাবেন না। একমাত্র তারাই এখনও শব্দার্থে রক্তবিন্দু ক্ষরিয়ে ক্ষরিয়ে সে মূল্য শোধ করে যাচ্ছে– লোকচক্ষুর অন্তরালে, নির্বাসনে কোন দানবের অশোকবনে–কীভাবে?
