কবি আরও বলছেন, ওরা বেরিয়ে পড়েছে; এদের কপালে লেগেছে সকালের আলো, ওদের পারানির কড়ি এখনও ফুরোয়নি; ওদের জন্য পথের ধারের জানালায় জানালায় কালো চোখের করুণ কামনা অনিমেষে চেয়ে আছে : রাস্তা ওদের সামনে নিমন্ত্রণের রাঙা চিঠি খুলে ধরলে, বললে, তোমাদের জন্য সব প্রস্তুত।
ওদের হৃৎপিণ্ডের রক্তের তালে তালে জয়ভেরি বেজে উঠল।
.
আর পশ্চিম পাকিস্তান? তার জন্য নিয়তি কী নির্ধারিত করছেন? আমি তো দেখছি, তাদের সম্মুখে অন্ধকার। বিপাকের বিভীষিকা রজনীর পরে ওদের জন্য কোনও শুভ্র উষার শুকতারা আমি তো দেখতে পাচ্ছিনে।
কবি যেন ওদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ইঙ্গিত দিচ্ছেন মাত্র–
এখানে সবাই ধূসর আলোয় দিনের শেষে পান্থশালার আঙিনায় কাঁথা বিছিয়েছে; কেউ-বা একলা, কারও বা সঙ্গী ক্লান্ত; সামনে পথে কী আছে অন্ধকারে দেখা গেল না, পিছনের পথে কী ছিল কানে কানে বলাবলি করছে; বলতে বলতে কথা বেধে যায়, তার পরে চুপ করে থাকে।
.
সেই দু মাসের কাহিনী; জানুয়ারি ২৯ থেকে মার্চ ২৫।
২৯-১-৭১ ভুট্টো ঢাকা থেকে বিদায় নেবার সময় গুডবাই ফেয়ার-ওয়েল না বলে যে। ইচ্ছা প্রকাশ করলেন সেটাকে ফরাসিতে বলা হয় ও-রভোয়া অর্থাৎ আবার দেখা হবে। আরও বললেন, আমাদের ডিফিকালটিজ আছে বইকি। ২৩ বত্সরের সমস্যাগুলো তো তিন দিনে সমাধান করা যায় না। তাই বলে আলোচনার দ্বার তো বন্ধ হয়ে যায়নি। যখন প্রয়োজন হবে আমি আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাবার জন্য আবার আসব।
সাংবাদিক শুধোলেন, শেখ মুজিব যে এসেমব্লির তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারির জন্য প্রস্তাব করেছেন সে সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য কী? উত্তরে তিনি সোজাসুজি রামগঙ্গা কোনও কিছু না বলে (রিমেনড নন-কমিটল) মন্তব্য করলেন, অন্তত ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত যদি আমাদের সময় লাগে তবে তাতেও তো কোনও দোষ নেই।
এবং বললেন, সংবিধান বাবদে সবকিছু আগেভাগে ফৈসালা করে নিয়ে তার পর সংবিধান এসেমব্লিতে প্রবেশ করব তার তো কোনও প্রয়োজন নেই। এসেম্বলির বৈঠক চালু থাকাকালীনও ওই নিয়ে আলোচনা (নিগোসিয়েশন) চলতে পারে।
প্রশ্ন : আপনি কি এসেমব্লির বৈঠক-তারিখ পিছিয়ে দিতে চান?
উত্তর : না।
সাংবাদিকদের আরও বিস্তর প্রশ্নের বিস্তর উত্তর দিয়ে আরেকটি মোক্ষম কথা কইলেন রাজনীতিক ভুট্টো।
শেখ আমার দৃষ্টিবিন্দু বুঝতে পেরেছেন, আমিও তার দৃষ্টিবিন্দু বুঝতে পেরেছি।
ভুট্টো যে বুঝতে পেরেছিলেন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ভুট্টো কেন, উভয় পাকের সবাই জানত শেখ এবং আওয়ামী লীগ কী চান, এবং আজও সেটা পড়ে শোনালে স্কুলবয়ও সেটা বুঝতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন, শেখ-তাজ-নজর কি বুঝতে পেরেছিলেন ভুট্টোর দৃষ্টিবিন্দু কী? কারণ পাকা পোকার জুয়াড়ির মতো তিনি তার তাস চেপে ধরে রেখেছিলেন তাঁর টাইয়ের উপর। আর সঙ্গে সঙ্গে ছয় দফার এটা-ওটা সেটার মূল তাৎপর্য কী, এটা মানলে ওটার সঙ্গে যে তার দ্বন্দ্ব বাধে, ওই যে আরেকটা, সেটা– সেটা কি পশ্চিম পাকের লোক মানবে ইত্যাদি ইত্যাদি দুনিয়ার কুল্লে হাবিজাবি প্রশ্নতে আনুষঙ্গিক যতপ্রকারের সেই সনাতন হাইপথেটিকাল মার্কা অবাস্তব আকাশকুসুম সওয়াল!
কিন্তু তিনি একবারের তরেও তার আপন দৃষ্টিবিন্দুর একটি মলিকুলও এক লহমার তরেও দেখতে দেননি। অন্য জনের বোঝা তো দূরের কথা। শেখের ঝানু ঝানু বিচক্ষণ জনেরা বার বার– যখনই ভুট্টো কোনও আপত্তি তুলেছেন তখনই ভালো করে আগাপাশতলা বুঝিয়ে দিয়ে শুধিয়েছেন, বার বার শুধিয়েছেন, আচ্ছা এতেও যদি আপনার মনে ধোকা থাকে, এটা গ্রহণ করতে যদি আপনার কোনও আপত্তি থাকে তবে আপনি বলুন আপনি কী চান, আপনার প্রস্তাব কী? আমাদের দু-দফা কাঠামোর ভিতর আমরা তো সর্বদাই রদবদল করতে প্রস্তুত আছি। নইলে আপনিই-বা এত তকলিফ বরদাস্ত করে আসবেন কেন এখানে আর আমরাই বা বসতে যাব কেন বৈঠকের পর বৈঠকে?
একদম হক কথা।
আওয়ামী লীগের দু-দফা কর্মসূচি কেনার তরে লারকানার তালুকমুলুক ডকে তুলতে হয় না এবং সেগুলো বোঝার জন্যে ধানমণ্ডির গুরুগৃহে প্রবেশকরতঃ চতুর্দশ বর্ষব্যাপী কঠোর আত্মসংযমসহ ব্রহ্মচর্য পালনও করতে হয় না।
আলোচনার সময় নিতান্ত কোণঠাসা হয়ে গেলে হরবকতই মি. ভুট্টোর পেটেন্ট উত্তর ছিল, হেঁ হেঁ হেঁ, বিলক্ষণ বিলক্ষণ! আমি দেশে ফিরে গিয়ে পার্টি মেম্বারদের সঙ্গে সলাপরামর্শ না করে পাকা উত্তর দি কী করে?
সেন্ট পিটারের স্বর্গ আর শয়তানের নরকের মধ্যিখানে ছিল একটি এজমালি পাঁচিল। চুক্তি ছিল পাচিল এ-বছর সারাবেন ইনি, ও-বছর সারাবেন শয়তান। ওই মাফিক পিটার তো সারালেন প্রথম বছর পাঁচিলটা তার পর এক বছর নেই নেই করে ঝাড়া তিনটি বছর শয়তানের আর দেখা নেই। পিটার তো শয়তানকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। শেষটায় হঠাৎ একদিন পথিমধ্যে উভয়ের কলিশন। পিটার তো শয়তানকে চেপে ধরলেন, পাকা কথা দাও, পাঁচিল মেরামত করবে কবে? শয়তান দণ্ডাধিককাল ঘাড় চুলকে শেষটায় বললে, তা-তা-তা আমি ঝটপট উত্তর দিই কী প্রকারে? আমি নরকে ফিরে যাই, আমার উকিলদের সঙ্গে পরামর্শ করি, তবেই না পাকা উত্তর দিতে পারি।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পিটার খেদোক্তি করলেন, ওইখানেই তো তুই ব্যাটা মেরেছিস আমাকে। সাকুল্যে সব-কটাই যে পেয়ে গেছিস তুই।
