নিত্যদিনের প্রথানুযায়ী দ্বিপ্রহরে সামরিক মন্ত্রণাসভার দিবসের প্রথম অধিবেশন আরম্ভ হয়েছে। পশ্চিম-উত্তর রণাঙ্গনে মনটগমেরি তখন হল্যান্ডের ভিতর দিয়ে হামবুর্গ পানে এগোচ্ছেন। সে রণাঙ্গনে শত্রু-মিত্রের অগ্রগতি, পশ্চাৎ অপসারণ, তাদের বর্তমান ঘাঁটি ইত্যাদি সর্বশেষ প্রতিবেদন বলে যাচ্ছেন বিরাট ম্যাপে অঙ্গুলি নির্দেশ করে করে আঞ্চলিক অ্যাদদাকা। বলতে বলতে তিনি উল্লেখ করলেন, অতিশয় অন্ধকার রাত্রি। এ রাত্রে মন্টগমেরির পক্ষে আক্রমণ করা অসম্ভব। হঠাৎ বিরাট রণাঙ্গন আলোকিত হল কৃত্রিম চন্দ্রালোকে
বিস্মিত হিটলার অ্যান্-এর কথা মাঝখানে কেটে দিয়ে শুধোলেন, কৃত্রিম চালোক! সে আবার কী? জাল, কুয়াশা বহুকাল ধরে রণ-কৌশলে সুপরিচিত কিন্তু কৃত্রিম চালোক!
অ্যাদ: পূর্বেই বলেছি, রাত্রি ছিল অত্যন্ত অন্ধকার। অমাবস্যার রাত্রেও নুয়ে-পড়া রাশি রাশি মেঘ না থাকলে নীরস্ত্র অন্ধকার সৃষ্ট হয় না। মেঘগুলো ছিল তুষারধবল। মনটগমেরি অ্যারপ্লেন-অন্বেষণকারী সবকটা সার্চলাইট মেঘের উপর তাগ করতে আদেশ দিলেন। সার্চলাইটের তীব্র রশ্মি মেঘে মেঘে প্রতিবিম্বিত হয়ে অত্যুজ্জ্বল যে-আলো সৃষ্টি করল সেটা মেঘমুক্ত পূর্ণিমার মতো।
.
এখানে বর্ষা নামে তার ঘনতম ঘনাবরণে। মাঝে মাঝে পশ্চিম থেকেও বৃষ্টি আসে– সে বৃষ্টি অতিদূর আরবসাগর থেকে বেরিয়ে এখানে পৌঁছতে পৌঁছতে দুর্বল হয়ে যায়। তাই বিরহী যক্ষ যে-রামগিরি জনকতনয়ার মান-পুণ্যোদকে অভিষিক্ত হয়েছিল তারই উপরে দাঁড়িয়ে মেঘপুঞ্জকে অনুরোধ করেছিল, আমার বিরহবার্তা নিয়ে তুমি, হে মেঘ, অলকায় গমন করে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ কর। কিন্তু আমি জানি, তুমি দয়াশীল, দাতা। যেসব ভূখণ্ডের উপর দিয়ে তুমি ভেসে যাবে সেগুলো নির্মম গ্রীষ্মের অত্যাচারে বিবর্ণ শুষ্ক দঞ্চপ্রায়। কাতর নয়নে জনপদবধূ ঊর্ধ্বে তোমার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করবে, বারিধারা ভিক্ষা চেয়ে। আমার অনুরোধ, নিজকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ কর না, বিরহিণী প্রিয়াকে আমার সন্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত।
যে শ্যামাম্বুরাজি যক্ষের কাতরতা শুনতে পায়নি তারা অলকার দিকে না গিয়ে মধ্যভারত, যুক্তপ্রদেশ, বিহার, রাঢ়ভুমিতে বিগলিত আত্মদান করতে করতে যখন দীর্ঘ যাত্রাশেষে এই পুণ্যভূমিতে পৌঁছয়, তাদের সঞ্চয় সেকালে প্রায় নিঃশেষ! কিন্তু, ভো ভো বর্ষণ-ক্লান্ত মুসাফির! আমরা অল্পেই সন্তুষ্ট। যৎ অল্পং তদ্ মিষ্টং! তোমার পদধ্বনি পূর্বাঙ্গণে, পূর্বদেশে নন্দিত হোক।
ওই, ওই যে বৃষ্টি আসে মুক্ত কেশে, আঁচলখানি দোলে। বাতাসে বাতাসে বর্ষণসিক্ত সজলভরা কণ্ঠে ভেসে আসছে ভোরের আজান। সাধ যায়, এই বর্ষণমুখরিত নগরীর উপকণ্ঠ পেরিয়ে দেখে আসি, বুড়িগঙ্গায় কতখানি জল বাড়ল।
না, আমাকে কেউ যেতে দেবে না। এ বয়সে। বয়সের শেষে।
মনে পড়ল এক জাপানি কবির করুণ শেষ প্রশ্ন। ক্ষয়রোগে তিনি যাত্রার শেষপ্রান্তে প্রায় পৌঁছে গিয়েছেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল, প্রতি বৎসর বাতায়নপাশে বসে অবিরল বরফপাত দর্শন। বরফ জমে উঠছে, মাঠে-ঘাটে-বাটে, জমে উঠছে, জমে উঠছে। তিনি দেখছেন, আর দেখছেন।
কিন্তু এবারে তুষার-বর্ষণ দর্শনার্থে তার বিছানাতে উঠে বসাও কঠিন বারণ। মাঠ-বাট দেখতে পাচ্ছেন না। জাপানি তিন কলির হাইকাই পদ্ধতিতে রচা তাঁর শেষ কবিতা রেখে গেছেন তিনিঃ
শুধায়েছি বার বার, কত বার!
হায়, শুধু প্রশ্ন– এ আমার,
এবারেতে কত উঁচু হয়েছে তুষার?
হাউ অফটেন,
হ্যাভ আই আসকট
হাও হাই ইজ দি স্নো??
.
ডানপিটে দুঁদে
একাধিকবার পরাজিত হয়ে জহির উদ্দীন মহম্মদ বাবুর মনস্থির করলেন, আপন পিতৃভূমি ফরগনা পীর মানে না দেশে দেশে, পীর মানে না ঘরের বউয়ে, নীতি অবলম্বন করে তার প্রকৃত মূল্য নিতান্তই যখন সম্যক হৃদয়ঙ্গম করতে পারল না, তখন ভাগ্যান্বেষণে দেশান্তর অভিযানই প্রশস্ততর। এ-যুগে কিন্তু, কি দুর্কমানিস্তান, কি আফগানিস্তান সর্বত্রই ভাগ্যান্বেষণকারীর সংখ্যা কমে আসছে। তার প্রধান কারণ, সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে হলে যে গুণটি মাত্রাধিক, অপর্যাপ্ত পরিমাণে প্রয়োজন তার নাম আত্মবিশ্বাস। এ যুগের সবচেয়ে নামকরা এডভেনচারার আডলফ হিটলারের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঐতিহাসিক, কূটনৈতিক, সামবিদ, মনস্তাত্ত্বিক, অতিশয় সীমিত সংখ্যক তার অন্তরঙ্গ জন অ্যা-দকা সেক্রেটারি স্টেনো পরিচারক ভ্যালে– এমনকি তার বৈরীকুল পর্যন্ত এক বাক্যে তার সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান যে বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেন সেটি তার আত্মবিশ্বাস। তার অবিচল সদাজাগ্রত প্রত্যয় ছিল, নিয়তি (প্রভিডেন্স) তাকে নির্বাচিত করেছেন, জর্মনির ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য। পরাজয়ের পর পরাজয়, পুনরপি পরাজয়, তথাপি তার আত্মবিশ্বাস এবং সর্বশেষ সংগ্রামে তিনি বিজয়ী হবেনই হবেন প্রত্যয় দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে চলছিল তার জীবনান্ত পর্যন্ত। তাঁর অতিশয় অন্তরঙ্গ, নিত্য সহচরগণ বিস্মিত অবিশ্বাসের সঙ্গে লক্ষ করেছেন, তার কল্পনাপ্রসূত স্বকৃত অনৈসর্গিক আত্মবিশ্বাসের এই ইন্দ্রজাল। বস্তুত তিনি ঠিক কোন মুহূর্তে পরাজয় স্বীকার করে আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুত হলেন সেটা চিরকালই অভেদ্য রহস্য থেকে যাবে।…. জহির উদ-দীন বাবুরের আত্মবিশ্বাস হিটলারের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না। কিন্তু বাবুরের সহচরদের মধ্যে সে আত্মবিশ্বাসের প্রতিনিয়ত বর্ধমান দার্চ লিপিবদ্ধ করার মতো লিপি-কৌশলী কেউই ছিলেন না, অপরঞ্চ বাবুর অতিশয় সযত্নে রোজনামচার মাধ্যমে তার আত্মজীবনী রেখে গিয়েছেন; ওদিকে হিটলার এ ধরনের অপকর্ম রীতিমতো বিপজ্জনক বলে মনে করতেন এবং তার আন্তরিক বিশ্বাস ছিল, যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ পরিকল্পনা একান্ত একা-একাই করে, সফলতা কামনা করতে পারে একমাত্র সেই-ই।
