না, না, না।
স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন তার চরমে তখন কে একজন জেনারেল আতাউল গনী ওসমানীকে শুধিয়েছিলেন, এ লড়াই আর কতদিন চলবে? ক্ষণতরে চিন্তা না করে তিনি বলেছিলেন, ফর ডিকেডস,–দশাধিক বৎসর, দশং দশং বৎসর– তার পর তিনি মে বি হতেও পারে বলছিলেন কি না সেটা নিতান্তই বাহ্য।
কারণ জেনারেল (এর চেয়ে কত অল্পে কত সেপাই ফিল্ড মার্শাল হয়েছে!) ওসমানী বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাস উত্তমরূপে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি খাঁটি বাঙাল। তাই তিনি শুধু জর্মন ক্লাউজেভিৎসের রণনীতি, আউস্টরলিস, ওয়াটারলু, স্তালিনগ্রাদ, নরমাদিই পড়েননি– তাঁর স্মৃতিতে আছে বাংলাদেশের পৌনঃপুনিক শতশত বর্ষব্যাপী মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস। যে কারণে পশ্চিমপাকের মিলিটারি বড়কর্তারা তাঁকে সামনাসামনি বলেছেন তিনি শভিনিস্ট; পেরোকিয়াল।
তিনি জানতেন, যে দেশ সাতশো বছর ধরে সেটুকুর ইতিহাস তো দিল্লিতে লেখা একচোখে ফারসি কেতাবেই আছে– ক্রমাগত স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছে তার পক্ষে এক ডিকেড, দু ডিকেড-ই তো স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী। কে জানে, আরও বেশি হতে পারে।
আজ না হয় বাংলাদেশের দুঃখদৈন্য চরমে পৌঁছেছে কিন্তু এটা তো এমন কিছু নিত্যকালের তত্ত্বকথা নয়। প্রাচুর্য আর সৌন্দর্য এদেশের সর্বত্র। সেই তার চিরন্তন স্বরূপ। তাই তার দিকে সকলেরই লোলুপ দৃষ্টি। পাঠান মোগল বাদশাদের তোষাখানাতে দু পয়সা জমে গেলেই তাঁদের নজর যেত এই উপমহাদেশের পূর্বাচলের দিকে সে রমণী সুজলা সুফলা। এস্থলে ধর্ম নিয়ে বাদানুবাদ করা ধর্মকে বিড়ম্বিত করা মাত্র। দিল্লির বাদশারা ছিলেন মুসলমান; গোড়ার দিকে না হোক, পরে বাংলার অধিবাসীর অধিকাংশই ছিল মুসলমান। এদের কতল করতে তবু তাদের বাধেনি। তাদের কিন্তু কিছুটা শালীনতাবোধ ছিল। বিংশ শতাব্দীর লাহোরি মোল্লাদের মতো দিল্লির মোল্লারা অতখানি জাহান্নমের অধঃপাতে যায়নি; তারা বাংলাদেশের বিদ্রোহ দমনের সময় ইসলাম ইন ডেঞ্জার জিগির তুলে বাঙালি মুসলমানকে কাফির ফতওয়া দিয়ে, জাল জেহাদ চালিয়ে নিজেদের পরকাল খোওয়ায়নি। রাজ্য বিস্তারে কলোনি শোষণের সময় ধর্ম অবাস্তর, দেশটার প্রাচুর্য বাস্তব সত্য।
বাংলাদেশের ছিল। যেমন এককালে ইতালির সৌন্দর্য ও প্রাচুর্য দুই-ই ছিল বলে তার দিকে ছিল বহু জাতের লুব্ধ দৃষ্টি। তাই ইতালির কবি ফিলিকাজা একদা কেঁদেছিলেন :
ইতালি, ইতালি, এত রূপ তুমি
কেন ধরেছিলে, হায়!
অনন্ত ক্লেশ লেখা ও ললাটে
নিরাশায় কালিমায়!
নইলে কবিগুরুই-বা বাঙালির জন্য এমন মর্মান্তিক প্রার্থনা করতে যাবেন কেন?
প্রতাপ যখন চেঁচিয়ে করে
দুঃখ দেবার বড়াই,*
জেনো মনে, তখন তাহার
বিধির সঙ্গে লড়াই।
দুঃখ সহার তপস্যাতেই
হোক বাঙালির জয়!
কী বাঙালিকে চিরকাল করতে হবে দুঃখের তপস্যা! এ কী আশীর্বাদ, না অভিসম্পাত।
[*এস্থলে টিক্কা যখন চেঁচিয়ে করে/ দুঃখ দেবার বড়াই
বললে টিক্কা ও দুঃখ-এর একটা/ মধ্যানুপ্রাস পাই।]
সাতশো বছরের ঐতিহ্য তোমার, হে বাঙালি স্বাধীনতার জন্য বার বার বিদ্রোহ করা, রক্তাক্ত সংগ্রামে আত্মবিসর্জন দেওয়া-না হয় তুমি সে ঐতিহ্য সম্বন্ধে আজ সচেতন নও, কিন্তু ওই যে নয় মাসের সংগ্রাম- মাতার অশ্রুজল, বধূর হাহাকার– সে কি তুমি কখনও ভুলতে পারবে?
তোমার কি মুহূর্তের তরে মনে হয়, অদ্বিতীয় এই পাশবিক নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করলেও চলত?
তোমার কি চিত্তদৌর্বল্য দেখা দিয়েছিল কতু, ক্ষণতরে এ দুঃসহ সংগ্রাম আর কতকাল ধরে লড়ব?
তুমি কি ভয় পেয়েছিলে?
না।
দুঃখ সহার তপস্যাতেই
হোক বাঙালির জয়।
ভয়কে যারা মানে
তারাই জাগিয়ে রাখে ভয়।
আর সর্বোত্তম অমূল্য কী শিক্ষা তুমি লাভ করলে?
তোমার দেশকে যখন সর্বসমক্ষে ক্রুশবিদ্ধ করা হল তখন বিশ্বনায়কগণ ক্লীব নপুংসকের মতো কী ঘৃণ্য আচরণ করলেন। তারা তোমার মৃত্যুযন্ত্রণা পলে পলে দেখলেন। কিন্তু তুমি যে প্রভু খ্রিস্টের মতো দুঃখ সহার তপস্যা দ্বারা নবজীবন লাভ করবে সে আশঙ্কা তারা করেননি।
কিন্তু তুমি যে একেবারে হতভাগ্য মিত্রহীন নও সে অপ্রত্যাশিত বৈভবও তুমি লাভ করলে সংগ্রামের অপরাহ্নবেলা।
এইবারে মূল সত্য, শেষ সত্য।
আবার আসবে নব দুর্যোগ। ওইসব ক্লীব নপুংসকদের শবদেহেই সঞ্চারিত হবে প্রেতাত্মা বেতাল। আবার আসবে দুঃখের তপস্যা। তাই জয়ধ্বনি কর :
দুঃখ সহার তপস্যাতেই
হোক বাঙালির জয় ॥
.
আব্রু দিয়ে, ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান দিয়ে–
পলাশির যুদ্ধের পর বাংলাদেশের জীবন-মরণ সঙ্কট আসে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ। তার পূর্বের দু মাস ফেব্রুয়ারি ও মার্চ ধরে পুব-পশ্চিম উভয় পাকিস্তান যেন গ্রিক ট্র্যাজেডির নিয়তির অলঙ্্য নির্দেশে দুর্বার গতিতে ধাবমান হল কোনও এক করাল অস্তাচলের দিকে। আবার সেই নিয়তিরই প্রসন্ন নির্দেশেই এক শুভপ্রভাতে জয়ধ্বনি উঠল,
হোক, জয় হোক
নব অরুণোদয়।
পূর্ব দিগল।
হোক জ্যোতির্ময় ॥
আর্য সভ্যতার পূর্বতম প্রান্ত, পূর্বাচল পূর্ব দিগঞ্চল বাংলাদেশ।
ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের সর্বশেষ শ্লোকেও আছে :
রাত্রি প্রভাতিল,
উদিল রবিচ্ছবি
পূর্ব-উদয়গিরি ভালে—
বাংলাদেশই পূর্ব উদয়গিরি। সে তার ভালে কী টিকা এঁকেছে সেটি রবিচ্ছবি, কবি রবির আঁকা ছবি, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত– আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
